দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী


প্রকাশিত : July 4, 2019 ||

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
আজ বৃহস্পতিবার শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকেন। রথযাত্রার ইতিহাস হয়তো অনেকের অজানা, স্কন্দ পুরানে আমরা পাই যে ইন্দ্রদ্যম্ন নামে এক রাজা ছিলেন উৎকল রাজ্যে (বর্তমানে যা উড়িষ্যা)। তিনি তিনি ছিলেন একজন পরম ভক্ত। একদিন স্বপ্নাদিষ্ট হন একটি মন্দির নির্মাণের জন্যে।
পরে দেবর্ষী নারদ এসে জানান স্বয়ং ব্রহ্মারও তাই ইচ্ছা, তিনি নিজে সেটা উদ্বোধন করবেন। এভাবে কাজ হল এবং নারদ বললেন ব্রহ্মাকে আপনি নিমন্ত্রণ করুন। পরে রাজা ব্রহ্মালোকে গেলেন এবং নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু ব্রহ্মালোকের সময় এর সাথে তো পৃথিবীর মিল নেই। পৃথীবিতে কয়েক শত বছর পার হয়ে গেছে। ফিরে এসে রাজা দেখলেন তাকে কেউ চেনে না। যা হোক তিনি আবার সব করলেন। দৈবভাবে রাজা জানতে পারলেন সমুদ্র সৈকতে একটি নিম কাঠ ভেসে আসবে, সেটা দিয়েই তৈরি হবে দেব বিগ্রহ। এদিকে মূর্তি তৈরি শুরুর কিছু দিন পর রানী কৌতুহল সংবরন করতে না পেরে মন্দিরে যান এবং দেখেন কেউ নেই ভিতরে আর আমরা যে রূপে এখন জগন্নাথ দেব কে দেখি সেই মূর্তিটি পড়ে রয়েছে। পরে ঐ ভাবেই স্থাপিত হয় মূর্তি। ইন্দ্রদ্যম্ন রাজা জগন্নাথ দেবের মূর্তিতেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ এবং জগনাথ দেব একই সত্ত্বা চিন্তা করে একই আদলে তার পাশে ভাই বলরাম এবং আদরের বোন সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করেন। আমাদের এখানে এক রথ যাত্রা হলেও পুরিতে তিনটি রথে হয়। প্রথমে বলরাম তার পর সুভদ্রা এবং শেষে জগন্নাথ। ১১৯৯ খ্রীষ্টাব্দে রাজা অনঙ্গভীম দেব তিন রথের রথ যাত্রা প্রচলন করেন। কঠোপনিষদে বলা হয়েছে না আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। রথ যাত্রার রুপক এমনই। তিনি আমাদের অন্তরে থাকেন। তার কোন রূপ নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজিত অর্থাৎ ঈশাব্যাসমিদং। বেদ বলছে আবাঙমানষগোচর, মানে মানুষের বাক্য এবং মনের অতীত। আমরা মানুষ তাই তাকে মানব ভাবে সাজাই। শ্রীমদ্ভাগবতে আছে, যে ব্যক্তি রথে চড়ে জগন্নাথদেবকে বিশ্বব্রহ্মান্ড দর্শন করাবেন অথবা শ্রী ভগবানের রূপ দর্শন করাবেন ভগবান তাদের প্রতি অশেষ কৃপা বর্ষণ করেন।
বৃহন্নারদীয় পুরাণে আছে, ভগবান নারায়ন লক্ষ্মী দেবীকে বলেছেন, পুরুষোত্তম ক্ষেত্র নামক ধামে আমার কেশব-মূর্তি বিরাজমান। মানুষ যদি কেবল সেই শ্রীবিগৃহ দর্শন করে তবে অনায়াসে আমার ধামে আমার কাছে ফিরে আসতে পারেন। এছাড়া বিষ্ণুপুরাণেও এর মহিমা ও পূণ্যফলের কথা বিধৃত হয়েছে। বৃন্দাবনে গোপীরা একদিন কৃষ্ণের লীলা ও তাঁদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা আলোচনা করছিলেন। কৃষ্ণ গোপনে সেই সকল কথা আড়ি পেতে শুনছিলেন। তখন গোপীরা কৃষ্ণের বোন সুভদ্রাকে দিয়েছিলেন যখন গোপীরা কৃষ্ণ নিয়ে আলোচনা করবেন তখন কৃষ্ণ যাতে তাঁদের কাছে আসতে না পারে। সেদিকে নজর রাখবে সুভদ্রা।
এদিকে গোপীদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা শুনতে শুনতে দেখে এতই বিমোহিত হয়ে পড়েন যে ভুলে যান তাঁর নিজ কর্তব্য। ফলে তাঁর দুই দাদা কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে এলেও তিনি খেয়াল করেননি। এদিকে গোপীদের কথা শুনতে শুনতে দুই ভাইয়ের কেশ খাড়া হয়ে উঠল, হাত গুটিয়ে আসে, চোখ দুটি বড় বড় হয়ে যায় এবং মুখে আনন্দের উচ্চ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। এই কারণেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এমন রূপ। বৈষ্ণবরা কৃষ্ণের এই বিমূর্ত রূপটিকে পূজা করে থাকেন। ফলে সেই মতো মূর্তি দেখাই তা অনেকের অসম্পূর্ণ বলে মনে করছেন। এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন। ‘উৎকলখন্ড’ও ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস রয়েছে।
এই ছিল রথযাত্রাকে ঘিরে সকল লোকবিশ্বাস বা পুরাণে বর্ণিত পবিত্র গাঁথা। পুরী ছাড়াও বিশ্বের অনেক হিন্দু এলাকাতেই রথ উৎসব পালন করা হয়। যেমন, নিউ ইয়র্ক, টরেন্টো, লাওসসহ বাংলাদেশেও রথ উদযাপন হতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশের সাভারের ধামরাইয়ে। এখানে প্রতি বছর ধুমধাম করে পালন করা হয় যশোমাধবের রথযাত্রা। এছাড়া, টাংগাইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নওগাঁ, দিনাজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, খুলনা ইত্যাদি জেলাতেও বড় করে পালিত হয় রথযাত্রা। এতে অংশ নেয় ধারে কাছের গ্রাম, উপজেলার হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এবং উপভোগ করতে আসে সকল ধর্মেও মানুষই। রথকে কেন্দ্র করে চমৎকার মেলা বসে বিভিন্ন স্থানে। রথের সাথে কলা বেচা ও লটকনের বিশেষ সম্পর্ক আছে। তাই প্রচুর কলা ও লটকন কেনাবেচা হয় রথে। শুকনা খাবার, যেমন-খই, মুড়ি-মুড়কি, চিরা ভাজা, জিলাপী, আমিত্তি ইত্যাদি মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। শুধু এগুলোই নয়, হাতে তৈরি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, কাপরের পুতুল, শিশুদের খেলনা, তৈজসপত্র, কাঠের ঠাকুরঘর আরও নানা রকম সামগ্রীও পাওয়া যায় রথের মেলাতে। সংকলক: সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী