লবণাক্ত সহিষ্ণু জাতের আমন ধান ব্রিধান-৭৩


প্রকাশিত : জুলাই ৫, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান
আরবী শব্দ ‘আমান’ অর্থাৎ নিরাপদ শব্দ হতে আমন ধানের উৎপত্তি বলে শোনা যায়। কারণ এটিই ছিল একসময় নিশ্চিত ফসল। আমন ধান ‘আগুনি ধান’ বা ‘হৈমন্তিক’ ধান নামেও পরিচিত। রোপা আমন মৌসুমে বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল আমন ধানের চাষ হয়। এদের মধ্যে ব্রিধান-৭৩ আমন মৌসুমের উপযুক্ত লবণাক্ত সহিষ্ণু জাতের একটি রোপা আমন ধান।এজাতটির জীবনকাল কম হওয়ায় উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ধান কর্তনের পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমূখী ও লবণ সহনশীল /পরিহারকারী (বংপধঢ়রহম) সরিষা চাষ করা যায়।
ব্রিধান-৭৩ জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য:
ব্রিধান-৭৩ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২ ডিএস/মিটার (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অধিকন্তু, এজাতটি অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে (ঝধষঃ ঝবহংরঃরাব ঝঃধমব) ৮ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম। পূর্ণ বয়স্ক ধান গাছ ১২০-১২৫ সে. মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। এ জাতের ধানের ডিগ পাতা খাড়া থাকে। কোন কোন দানার (ঝঢ়রশবষবঃ) অগ্রভাগে শুঙ দেখা যায়। এর গড় জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন। লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টর প্রতি গড়ে ৩.৫- ৬.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এ ধানের চাল মাঝারি চিকন ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। এক হাজার পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২১.২ গ্রাম। এ ধানের চালে এমাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৭ ভাগ।
চাষাবাদ পদ্ধতি:
উপযোগী জমি ও মাটি: দো-আঁশ, পলি দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটির উঁচু ও মাঝারি উঁচু ধরণের জমি এ ধান চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
জমি তৈরি: মাটির প্রকার ভেদে ৪/৫ বার চাষ ও মই দিয়ে থকথকে কাদাময় করে জমি তৈরি করতে হবে। প্রথম চাষের পর অন্ততঃ এক সপ্তাহ জমি ফেলে রাখতে হবে। এতে আগাছা ও পরিত্যক্ত খড় পঁচে খাদ্য উপাদান তৈরি হয়, যা গাছের বাড়-বাড়তিতে সহায়ত করে। উত্তমরূপে কাদা করা তৈরি জমিতে চারা রোপন করতে সুবিধা হয়। এছাড়া কাদা করা জমিতে অক্সিজেনের শূন্য স্তর সৃষ্টি হওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা এবং সার ব্যবহারের কার্যকারিতা বেড়ে যায়।
রোপা আমনের জমি সমতল করে তৈরি করা খুব জরুরি। জমি সমতল হলে সব জায়গায় বৃষ্টি বা সেচের পানি দাঁড়াতে পারে, পানির অপচয় কম হয় এবং সবগাছ ঠিকমতো পানি ও সার পায়। এতে ক্ষেতের সব জায়গায় ফসল ভাল হয়। তাই শেষ চাষের পর মই দিয়ে জমি ভালভাবে সমতল করে নিতে হবে। সেই সাথে আইলও মজবুত করে তৈরি করতে হয়। এতে বৃষ্টি বা সেচের পানি ক্ষেত থেকে বেরিয়ে অপচয় হতে পারে না বলে ফসলের কাজে লাগে ও ফলন বাড়ে।
সার ব্যবহার:
ব্রিধান-৭৩ জাতের রোপা আমন ধান চাষের জন্য বিঘা প্রতি ২৪ কেজি ইউরিয়া, ১৩ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৩ কেজি জিপসাম ও ১.৫ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করতে হয়। জমি শেষ চাষের সময় সবটুকু টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং অর্ধেক এমওপি সার প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
জমি তৈরির সময় ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে সারের অপচয় হয়। তাই এ সময় ইউরিয়া সার না দিয়ে পরে কয়েক কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তাই ইউরিয়া সার সমান তিনবাবে ভাগ করে চারা রোপণের ১৫দিন পর ১ম, ৩০ দিন পর দ্বিতীয় এবং ৪৫ দিন পর ৩য় কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। আর বাকী অর্ধেক এমওপি সার শেষ কিস্তি ইউরিয়ার সাথে প্রয়োগ করতে হয়।
ইউরিয়া সার দেয়ার সময় মাটিতে প্রচুর রস থাকা দরকার। শুকনো জমিতে কিংবা ধান গাছের পাতায় পানি জমে থাকলে কখনও সার প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ক্ষেতে বেশি পানি থাকলে তা বের করে দিয়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হয় এবং হাতড়িয়ে বা নিড়ানি দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে সারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সার প্রয়োগ করে ২/৩ দিন পরে পুনরায় জমিতে পানি ঢুকিয়ে দিতে হবে। যেসব ক্ষেতের পানি নিস্কাশন বা সেচের সুবিধা নেই সেখানে ক্ষেতের পানিতে ইউরিয়া ছিটানোর ২ দিন পর সার মাটির সাথে এমনভাবে মিশানো দরকার যাতে পানি যথেষ্ট ঘোলা হয়।
চারা রোপণের সময় ও পদ্ধতি:
সময়মতো রোপা আমন ধানের চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। ব্রিধান-৭৩ জাতের আমন ধান ০১ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই অর্থাৎ আষাঢ়ের ১৭ তারিখ থেকে শ্রাবণের ১৫ তারিখের মধ্যে বীজ বপন করে বীজতলা থেকে ২৫-৩০ দিন বয়সের সুস্থ ও সবল চারা সাবধানে তুলে এনে রোপন করতে হবে।
চারা লাগানোর সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা প্রয়োজন। চারা তুলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মূল জমিতে রোপণ করা দরকার। এতে মূল জ মিতে তাড়াতাড়ি চারা লেগে যায়। উত্তর-দক্ষিণে সারিতে চারা রোপন করা উত্তম। এতে আগাছা দমন ও অন্যান্য পরিচর্যা সহজতর হয়। সারি থেকে সারি ২০-২৫ সে.মি. এবং চারা থেকে চারা ১৫-২০ সে.মি. দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। প্রতিটি গর্তে ২/৩টি সুস্থ ও সবল চারা ২.৫-৩.৫ সে.মি. গভীরে রোপন করা উচিত। প্রতি ৮-১০ লাইন বা সারির পর এক সারি অর্থাৎ ২৫-৩০ সে.মি. ফাঁকা জায়গা রেখে পুনরায় পূর্ববর্তী নিয়মানুসারেই চারা রোপন করতে হবে। চারা খুব গভীরে রোপণ করা হলে পুরানো শিকড় কাজ করতে পারে না এবং নতুন শিকড় মাটির ঠিক উপরে যে পর্ব থাকবে সেখান থেকে বের হয়। একে বলে পর্ব শিকড়। এর ফলে গাছ তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারে না। অপরদিকে খুব কম গভীরে চারা রোপণ করলে যদি জোরে বাতাস চারার উপর দিয়ে বয়ে যায় তাহলে উঠে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পরিমিত গভীরে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের ১০/১২ দিনের মধ্যে মরে যাওয়া চারার শূন্যস্থান একই জাতের চারা দিয়ে পূরণ করতে হবে। এজন্য রোপণ শেষে ক্ষেতের একপাশে একমুঠো চারা রেখে দিতে হয়।
সেচ ব্যবস্থাপনা:
সাধারণত ছিপছিপে পানি থাকা অবস্থায় চারা রোপণ করা হয়। রোপণের ৬-৮ দিনের মধ্যেই রোপণ জনিত আঘাত সহ্য করে চারা সবুজ বর্ণ ধারণ করে। তখন থেকে দানা পুষ্ট হওয়া পর্যন্ত বৃদ্ধির বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন পরিমাণ পানির চাহিদা পরিলক্ষিত হয়।
বৃদ্ধির প্রাথমিক অবস্থায় জমিতে সাধারণত ৭-১০ সে.মি. পানি রাখা দরকার। পানির গভীরতা এর থেকে বেশি হলে ধানের গোড়া প্রয়োজনীয় আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ায় কুশি উৎপাদন হার কমে যায়। অন্যদিকে পানির উচ্চতা কমিয়ে ছিপিছিপে অবস্থাতেও রাখা যায়। তবে এতে আগাছার প্রকোপ বেশি হয়। এই পরিমাণ উচ্চতার পানি অধিক কুশি উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত রাখা প্রয়োজন। কুশি উৎপাদন পর্যায় পার হওয়ার পর পরই উচ্চতা বাড়িয়ে ১২-১৫ সে.মি. করতে হবে, যাতে নতুন করে কুশি উৎপাদন নিরুৎসাহিত হয়। কারণ, এরপরে কুশি হলে তাতে কোন শিষ হয় না বরং পরোক্ষভাবে ফলন কমিয়ে দেয়। কাইচ থোড় আসার সময় থেকে শুরু করে ধানের দুধ হওয়া পর্যন্ত পানির চাহিদা অত্যন্ত বেশি থাকে। এরপর দানা শক্ত হতে শুরু করলেই জমি থেকে সমস্ত পানি বের করে দিতে হবে। পানি থাকলে ধান পাকতে অহেতুক দেরী হয়। কারণ তখন আর ধান ফসলে পানির প্রয়োজন হয় না এবং ধান পাকতেও অহেতুক দেরী হয় না।
আগাছা দমন:
আগাছা ধান গাছের একটি বড় শত্রু। এরা ধান ক্ষেতে আলো, বাতাস, পানি ও খাদ্য উপাদানের উপর ভাগ বসায়। তাছাড়া আগাছা রোগ-বালাইয়ের জীবাণু এবং পোকা-মাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে। এসব কারণে আগাছার আক্রমণে ধানের ফলন অনেক কমে যায়। কাজেই জমি আগাছামুক্ত করা অপরিহার্য। রোপা আমন ধানের জমিতে প্রায়ই পানি বিদ্যমান থাকে বলে অনেক আগাছা জন্মিতে পারে না। কিন্তু এমন কতগুলো জলজ ও আধা জলজ আগাছা রয়েছে যেগুলো যথাসময়ে দমন করতে না পারলে ফলন অনেক কমে যায়। গবেষণামূলক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আগাছার আক্রমণের ফলে রোপা আমন ধানে শতকরা ২০-৪০ ভাগ ফলন হ্রাস পায় (আরাই, ১৯৬৩)। রোপা আমন ধানে বড়চুচা, ক্ষুদে চেচড়া, শক্ত চেচড়া, জইনা, কেসুটি, শ্যামা, গোলমেথী, কানদুলি, বড়নখা, পানিকচু, পানিমরিচ, দুর্বা, আড়াইলা, কলমীশাক, শেঞ্চী, কানাইবাশী ইত্যাদি ছাড়াও হরেক রকম আগাছা জন্মিতে পারে। এদের অনেকগুলো আবারো বোরো ধানেও জন্মিতে দেখা যায়। এগুলো সঠিকভাবে দমন করতে হলে চারা রোপনের ২৫-৩০ দিন পর একবার এবং ৪৫-৫০ দিনের মধ্যে পুনরায় নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিস্কার করা দরকার। সাধারণত রোপা ধানের আগাছা হাত দিয়ে বাছাই করে দমন করা হয়। সারি করে রোপনকৃত ধান ক্ষেতে নিড়ানি যন্ত্র চালিয়ে সাথে সাথে হাত দিয়ে আগাছা পরিস্কার করেও আগাছা দমন করা যায়।
পোকা-মাকড় দমন:
ব্রিধান-৭৩ জাতের ধানে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতেরচেয়ে অনেক কম হয়। তবে এধানে পামরি পোকা, মাজরা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা, চুংগি পোকা, গলমাছি, সবুজ পাতা ফড়িং, ঘাস ফড়িং, ছাতরা পোকা, লেদা পোকা, গান্ধি পোকা ও শিষকাটা লেদা পোকার আক্রমণ হতে পারে। এসব পোকা-মাকড় দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
রোগ বালাই দমন:
রোগের মধ্যে টুংরো রোগ, পাতা পোড়া, ক্রিসেক, পাতার লালচে রেখা রোগ, খোলপোড়া রোগ, গোড়া পঁচা, কা- পঁচা, ব¬াস্ট, উফরা প্রভৃতি উলে¬খযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে ধান গাছ দুর্বল হলেই রোগ-বালাই দেখা দেয়। কাজেই ঠিকমতো পরিচর্যা করলে এবং জমিতে ঠিকমোত সার ও পানি দিলে গাছ সুস্থ ও সবল হয় এবং তার ফলে গাছের রোগ-বালাই কম হয়।
ধান কাটা:
ধান ভালভাবে পেকে গেলে ফসল কাটা উচিত। পাকা ধান বেশিদিন জমিতে রেখে দিলে কিছু ধান ঝরে যেতে পারে। এমনকি ইঁদুর, পাখি বা অন্যান্য পোকা-মাকড় দ্বারাও ক্ষতি হতে পারে। শিষের অগ্রভাগ থেকে ধান পাকা শুরু হয়। মাঠে গিয়ে ক্ষেতের ধান পরীক্ষা করতে হবে। শিষের অগ্রভাগের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ এবং শিষের নীচের অংশে শতকরা ২০ ভাগ ধানের চাল আংশিক শক্ত ও অস্বচ্ছ হলে এবং ধান সোনালি রঙ ধারণ করলে পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। এসময় ধান কাটতে হবে। ধান পাকার পর কাটতে যত দেরী হয় শতকরা ভাঙ্গা চালের পরিমান তত বেড়ে যায়। (ওয়াশারম্যান, মিলার ও গোল্ডেল, ১৯৬৫)। পরিপক্ক ধানে ২০-২৫% জলীয় পদার্থ থাকে।
ফলন:
লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টর প্রতি গড়ে ৩.৫-৬.০ টন পর্যন্ত ব্রিধান-৭৩ এর ফলন পাওয়া যায়।
লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা