ইন্টারনেটের অপব্যবহার শিশুদেরকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে


প্রকাশিত : জুলাই ৯, ২০১৯ ||

আসাদুজ্জামান সরদার মধু

আদিম যুগের বর্বরতা ও অসভ্যতাকে উপেক্ষা করে মানুষ ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই সভ্যতার একমাত্র বাহন হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের প্রসারতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে আমরা ততই সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বিজ্ঞান আমাদের জন্য যেমন আশীর্বাদ তেমনি অন্য দিকে এর অপব্যবহারই আমাদের জন্য অভিশাপ।
বর্তমানে আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিচরণ করছি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুবাদে আজ পুরো বিশ্বের মানুষ খুব সহজেই একে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারছে। নানা তথ্য, ধ্যান-ধারণার আদান-প্রদান করছে। বাংলাদেশ সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ের সাথে সংগতি রেখে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সব বয়সের, সব শ্রেণীর মানুষের কাছে ইন্টারনেট সহজগম্যতা পেয়েছে। বিটিআরসি’র পরিসংখ্যান (২০১৫) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৬০ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ১৩০ মিলিয়ন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। আগস্ট, ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ৬২ মিলিয়ন জনগণ বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, এ সংখ্যা প্রায় ৫৮ মিলিয়ন। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হচ্ছে শিশু। এসব শিশুদের মধ্যে কত শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তার প্রকৃত পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা যায় যে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ উল্লেখ সংখ্যক শিশুরা রয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। আর এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য ও যোগাযোগ পযুক্তি নামে একটি স্বতন্ত্র বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুক, ওয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইনস্টাগ্রামসহ নানা চ্যাট সাইটগুলো প্রধানত ফেসবুক এবং বিভিন্ন চ্যাটিং অ্যাপসগুলো আমাদের এখানে খুব জনপ্রিয়। প্রতিমুহূর্তে কোথায় কি ঘটছে তার সচিত্র তথ্য শেয়ার হয়ে যাচ্ছে ফেসবুকে, পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। এসব মাধ্যম ব্যবহারের ফলে পরিচিত, অপরিচিত বন্ধু থেকে শুরু করে আত্মীয় পরিজনের গ-ি পেরিয়ে সবাই একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে পুরো বিশ্ব আজ একই সূতায় গেঁথে আছে, কোথায় কি ঘটছে তা মুহূর্তের মধ্যে সবার হাতের মুঠোই পৌঁছে যাচ্ছে, তা সে বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন।

ইন্টারনেট আমাদের জন্য খুলে দিচ্ছে নানা সম্ভাবনার দুয়ার। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্য যে ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের বেশ কিছু কুফলও ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে যা আমাদের শিশু কিশোর-কিশোরীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইন্টারনেটের মায়াবী জগত নানা প্রলোভন ও হয়রানির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। যা শিশুদের অনেকসময় বিপদগ্রস্থ করে। আবার এর নানামুখী অপব্যবহার প্রায়শ বিপদজনক পরিণতি বয়ে আনে যা তাদের ব্যক্তিত্বে দীর্ঘ মেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমন অপব্যবহারের মধ্যে একটি হচ্ছে অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন।
সাম্প্রতিক সময়ে অন-লাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও তা আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারণে সেভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। মোবাইল ফোন বা অনলাইনে অনেক ধরনের হাতছানি আমাদের দেশের এই নিষ্পাপ শিশুদেরকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা আমাদের জন্য বিপদজনক। ইন্টারনেট অপব্যবহার করে অনেকে আবার প্রতিশোধ স্পৃহা বা অন্যের ক্ষতি করার লক্ষ্যে অনেক ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও চিত্র ধারণ করে এবং তা এমএমএস করে শিশুদেরকে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমাদের দেশে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু সামাজিক ভীতি সাধারণ মানুষকে এতটাই জিম্মি করে রেখেছে যে তারা ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশুর সাথে কোনো ব্যক্তি খারাপ উক্তি করলে, অশালীন কোনো আচরন করলে, শাস্তি স্বরূপ ১০ বছরের কারাদ- এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকা সত্বেও কোনোরকম উদ্যোগ নিতে সাহস পায় না।
শিশুদের বিকাশে অনলাইনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এর অপব্যবহারের দিকটি বিবেচনা করে এ সম্ভাবনার দুয়ার শিশুদের জন্য বন্ধ করে না দিয়ে বরং অনলাইনে শোষণমূলক বিষয় এবং উপকরণ হতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অনলাইন প্লাটফর্মকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত করে তুলতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে সকলের কাজ করা প্রয়োজন। সমাজের সকল স্তরের শিশুরা নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিজেকে বিপদ মুক্ত রাখবে পাশাপাশি সমবয়সী অন্যদেরকেও সঠিক ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্যোগী করতে সচেষ্ট হবে।
অনলাইনে যৌন হয়রানি বা নির্যাতন বলতে ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো শিশুর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তাকে অশালীন বার্তা, ছবি কিংবা ভিডিও প্রদান করা, আবেগীয় সম্পর্ক স্থাপন করে নানা যৌনকর্মে নিয়োজিত করা, শিশুর বিবিধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিংবা অর্থ বা কোনো উপহার প্রদানের মাধ্যমে তাকে নানা যৌনতামূলক অঙ্গভঙ্গি কিংবা আচরণে প্ররোচিত করা ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো শিশুকে অশালীন কথা, ছবি, কিংবা ভিডিও প্রদান করাই হচ্ছে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন। আবার অনেক সময় দেখা যায় যৌন শোষণকারী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কিছু স্থিরচিত্র কিংবা ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়। একইভাবে এসকল ধারণকৃত ভিডিও সংরক্ষণ করে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে পুনরায় তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য করে। একেই যৌন শোষণ বলে।
সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুকিপূর্ণ ইন্টারনেট ব্যবহার শিশুদের জন্য নির্যাতন ও হয়রানির একমাত্র কারণ। বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ এর মাধ্যমে শিশুরা ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছে কিন্ত ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে ভাল-মন্দ বিষয়ে তাদের কতটুকু শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেটা এখন সময়ের বিবেচনায় দেখার বিষয়। মূলত: প্রত্যেক শিক্ষার্থী শিশুদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহার করার পূর্বে ইন্টানেটের খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া যেমন দরকার। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদেরকে পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যবহারকারী শিশুরা যত বেশি ইন্টারনেটের ভাল-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত থাকবে তত বেশি তারা ইন্টারনেটের সুফল ভোগ করতে পারবে ও এগিয়ে যাবে ।
ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে যৌন হয়রানী ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে অগ্রগতি সংস্থা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সবুর বিশ্বাস বলেন, ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু যৌন নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। অনেক শিশু না বুঝে অনেক অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রণীত নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ক নির্দেশিকা বইটি সাতক্ষীরার শিশু সুরক্ষা ফোরামের এ্যাডভোকেসীর মাধ্যমে জেলা শিক্ষা অফিসারের অনুমোদনক্রমে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সহযোগিতায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সবকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিতরণ করা হয়েছে। যা ইন্টারনেট অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ প্রকল্প কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে ইন্টারনেট ব্যবহার বিধি সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রী তথা শিশুদেরকে সচেতন করা শুরু হয়েছে।
সর্বোপরি ইন্টারনেটের অপব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে শিশুদের সুরক্ষায় সচেতন সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ক নির্দেশিকা পাঠ্যসূচিতে সংযুক্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ,পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করন, মা-বাবা তথা অভিভাবকের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিদ্যালয়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করনই পারে-ইন্টারনেটের খারাপ হাতছানি থেকে আমাদের শিশুদের কাঙ্খিত সেই আলোর পথে নিয়ে যেতে। লেখক: সাংবাদিক