৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ৩৩ দিন বাড়িতে ফিরলো তিন জেলে


প্রকাশিত : জুলাই ১০, ২০১৯ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি: বনদস্যু জোনাব বাহিনীকে মুক্তিপণ বাবদ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেও পালিয়ে বাড়িতে ফিরেছে শ্যামনগরের তিন জেলে। ৩৩ দিন আগে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ইলশেমারী ও দাড়গাং খাল থেকে জোনাব বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে জিম্মি করে।
ফিরে আসা জেলেরা যথাক্রমে পাতাখালী চন্ডিপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আব্দুল মান্নান, কালিঞ্চি গ্রামের দৈব মন্ডলের ছেলে সুজন মুন্ডা এবং জয়াখালী গ্রামের জাহিদ হোসেন।
ফিরে আসা জেলেরা জানিয়েছে পরিবার এর পক্ষ থেকে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের পরও বনদস্যুরা জিম্মিদশা থেকে তাদের মুক্তি দেয়নি। আগামী কোরবানী ঈদ পর্যন্ত তাদেরকে আটকে রেখে নৌকা চালানোর কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। এক পর্যায়ে ৬ জুলাই বৃষ্টির সময় পালিয়ে তিন দিন ঘোরাঘুরির পর তারা গত রোববার রাত আটটার দিকে বাড়িতে ফিরেছে। দস্যুদের অবর্ণনীয় নির্যাতনে তারা এখন শাররীকভাবে মারাত্মক অসুস্থতার কারণে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও জানান। গত ৩ জুন থেকে ৮ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে এসব জেলেদের মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করা হয়।
জিম্মিদশা থেকে ফিরে আসা সুজন মুন্ডা জানিয়েছে গত ৩ জুন দাড়গাং এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করে বাহিনী প্রধান জোনাবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বনদস্যু দলটি। এক পর্যায়ে পরবর্তী পাঁচদিন সুন্দরবনের অপরাপর অংশ থেকে মান্না ও জাহিদসহ আরও কয়েক জনকে অপহরন করে নেয় বনদস্যুরা।
তিনি বলেন, আমার পরিবার মুক্তিপন বাবদ টাকা দিতে না পারায় তাকে আগামী কোরবানীর ঈদ পর্যন্ত আটকে রেখে নৌকা চালানোর কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে তারা। এছাড়া মান্নানের মুক্তির জন্য তার পরিবার ও নৌকা মালিক দু’দফায় দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং জাহিদের পরিবার ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করে নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে। তবে মান্নান ও জাহিদের জন্য যথাক্রমে পাঁচ লাখ ও এক লাখ বিশ হাজার টাকার দাবি থাকায় তাদেরকে মুক্তি দেয়নি বনদস্যুরা।
সুজন আরও জানিয়েছে এসময়ের মধ্যে জোনাব বাহিনী আরও অসংখ্যা জেলেকে উঠিয়ে নিয়ে এবং কয়েক ঘন্টা করে জিম্মি রেখে বিকাশে মুক্তিপনের টাকা আদায় করে। তাদের মত আরও এক জেলে ভারতীয় সুন্দরবনে অবস্থানের সময় চা আনার সুযোগে পালিয়ে যায় বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
অপর জিম্মি জেলে মান্না ও জাহিদ জানায় জিম্মি করার পর থেকে ১৪/১৫ দিন বনদস্যুরা ভারতীয় সুন্দরবনের মধ্যে অবস্থান করে। পরবর্তীতে পুষ্পকাটি, মান্দারবাড়িয়া হয়ে মামুন্দো নদীর মুখেও প্রায় ১০/১২ দিন অবস্থান করে তারা। এসময় তাদেরকে দিনে একবার খাাবার দেয়া হলেও সারা রাত নৌকা চালানোর কাজে লাগানো হতো।
তারা জানায় জিম্মি কয়েক জনকে গাছে তুলে মুটোফোনের নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে পরিবারের সাথে কথা বলার সুযোগ দিয়ে মুক্তিপন পেয়ে ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাদের তিনজনের জিম্মি হওয়ার বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের কারণে তাদেরকে মুক্তি দিচ্ছিল না। বরং তাদের মুক্তিপণ বাবদ পরবর্তীতে আরও বড় অংকের টাকা দাবি করে বনদস্যু গ্রুপটি।
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জোনাব বাহিনীর হাতে জিম্মি এসব জেলেরা জানায় একটি পিস্তল, একটি এক নলা ও দুটি দু’নলা বন্দুক রয়েছে জোনাব ও তার অপর চার সহযোগীর কাছে। তারা আগামী কোরবানীর ঈদের সময় লোকালয়ে ফিরবে বলেও শহর এলাকা থেকে মুটোফোনে যোগাযোগরত সহযোগিদের সাথে আলাপ করতো।
জিম্মি অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ফিরে আসা তিন জেলে জানায় গত ৬ জুলাই তুমুল বৃষ্টির সময় বনের মধ্যে নৌকা তুলে দিতে বলে বনদস্যুরা। এক পর্যায়ে তাদেরকে গাছের পাতা ও পলিথিন দিয়ে ছাউনি করে দিতে বলে তারা। এসময় বনদস্যুদের তিন সহযোগী টাওয়ারের সাহায্য নিতে নৌকা থেকে দুরে চলে যাওয়ার সুযোগে তারা তিন জন পুর্ব পরিকল্পনা মত এক প্যাকেট বিস্কুট ও এক বোতল পানিসহ পালিয়ে যায়। সাথে থাকা এক প্যাকেট বিস্কুট ও ঐ এক বোতল পানি খেয়ে তারা তিনজন তিন দিন ঘোরাঘুরির পর বাড়িতে ফিরেছে বলেও জানায় তারা।
এসব জেলেরা আরও জানিয়েছে জোনাব নিজে ছোট আকৃতির হাতে চালানো ঐ নৌকায় অবস্থান করলেও সহযোগীসহ অপরাপর জেলেদের কাছে রবিউল নামে পরিচয় দিত। শহরা এলাকার ভারি ভারি মানুষের সাথে বনদস্যুদের কথোপকথন তারা গাছের নিচে বসে শুনতেন বলেও জানান এসব জেলেরা।
সুন্দরবনে কাঁকড়া ও মাছ শিকার নির্বিঘœ করতে অপরাপর জেলেদের মত এসব জেলেরা জোনাব বাহিনীর ব্যবহৃত মুটোফোন নম্বরসমুহ সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।