গাছ লাগালেই জীবন বাঁচবে


প্রকাশিত : July 13, 2019 ||

মো. আবদুর রহমান:

বৃক্ষ প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এদের ছাড়া মানব জীবন অচল। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুস্থ ও নির্মল রাখতে বৃক্ষের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছে। গাছ বা বৃক্ষ সে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বিনিময়ে অক্সিজেন ত্যাগ করে পৃথিবীর বায়ুম-লের ভারসাম্য রক্ষা করছে। একটি গাছ বছরে ১৩ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশকে নির্মল করে। আর সোয়া ৬ কেজি বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ছাড়ে। যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরী।

শুধু তাই নয়, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, আসবাবপত্র, যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, ওষুধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ছায়া, জ্বালানি কাঠ প্রভৃতির যোগান দিতে বৃক্ষের জুড়ি নেই। কাঠ ও ছায়াদান ছাড়াও সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর ফল পেতে ফল গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ ভূমি ক্ষয়রোধ করে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায় এবং বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ভূমি ও বায়ুমন্ডলের আর্দ্রতা বাড়ায়। তাছাড়া ঝড়-ঝাঞ্ছাও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের তান্ডবতা হতে দেশের লোকজন ও পশু পাখি রক্ষা করে। বৃক্ষ, বন্যা ও খরা রোধে সহায়ক। সুতরাং গাছ আমাদের পরম বন্ধু।

আধুনিক সভ্যতায় জনপদ ও নগরীতে বিভিন্ন প্রকার মিল কারখানা গড়ে উঠেছে। মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, বাস, ট্রাক, ষ্টীমার ইত্যাদি যানবাহন চলাচল করছে। এরা সর্বদাই বাতাসে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস ছাড়ছে। গাছপালা এ সমস্ত গ্যাস গ্রহণ করে আবহাওয়ার ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধ করছে। যদি গাছপালা না থাকতো তাহলে মিল কারখানা ও যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাসে মানুষ ও জীবজন্তুর বাঁচার কোন সম্ভাবনা থাকতো না। গাছপালা দ্বারা একটি দেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। বৃষ্টিপাতের সহায়তা করতেও গাছ অপরিহার্য। স্পঞ্জ যেভাবে পানি ধরে রাখে গাছও সেভাবে মাটির ভিতরের পানিতে ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পূর্ণ বয়স্ক আম বা কাঁঠাল গাছ গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে ১০০ গ্যালনের মতো পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতাসে ছেড়ে দেয়। এর ফলে চারপাশের তাপমাত্রা কমে আসে যা এয়ারকুলারে ৪-৫টি ঘরের শীতলকরণের সমান। ঝড় তুফান, বন্যা-খরা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের তা-বতা হতে দেশের লোকজন, পশুপাখি ও ঘর-বাড়ী রক্ষা করতে বৃক্ষরাজির অবদান সর্বজন স্বীকৃত। একটি পূর্ণ বয়স্ক আম, জাম বা কাঁঠাল গাছ তার চারপাশে ৭৫ ভাগ বাতাসের বেগ কমতে সাহায্য করে। আর সে গাছের উচ্চতার ২০ গুণ দূরে ২০ ভাগ গতি কমাতে পারে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কোন দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার মোট ভূ-খন্ডের অন্ততঃ শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ শতকরা ১৩ ভাগ মাত্র। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে যে হারে গাছপালা কাটা হচ্ছে সে হারে বৃক্ষসম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। যার ফলে একদিকে যেমন আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গাছপালাজাত দ্রব্যের অভাব ঘটছে, অপরদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। গাছপালা কর্তন ও বনাঞ্চল হ্রাসের কারণে পৃথিবী হতে ২০% গ্রীন হাউস গ্যাস নি:সরিত হয়ে সারা বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে জলবায়ু পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক  উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাবে দেশে অকাল বন্যা, খরা, উপকূলীয় অঞ্চলে সিডর ও আইলার মত মারাত্মক সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস, ভূমিক্ষয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উত্তরাঞ্চলে মরু বিস্তারের আশংকা ইত্যাদি বিরূপ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ পরিস্থিতির মোকাবেলায় গাছ লাগাতে হবে অন্তত এক লাখ কোটি। খুব তড়িঘড়ি। তবেই আমার, আপনার শ্বাসের বাতাসের বিষ কমবে। আমাদের বায়ুম-ল হয়ে উঠবে ১০০ বছর আগেকার মতো। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ইটিএইচ জুরিখ) হালের একটি গবেষণা এ তথ্য জানিয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান- জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র গাছ লাগালেই জীবন বাঁচবে। তা না হলে যে হারে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে ফুলে-ফেঁপে ওঠা সমুদ্রের জলেই তলিয়ে যেতে হবে আমাদের। কারণ উষ্ণায়নের জেরে বরফ গলছে অস্বাভাবিক দ্রুত হারে। আর বিশ্বজোড়া শিল্পায়নের দৌলতে বাতাস ভয়ঙ্করভাবে বিষিয়ে উঠছে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ নানা ধরণের গ্রিন হাউস গ্যাসে। যা তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর।

এক লাখ কোটি গাছ লাগাতে জমির অভাব হবে না বলে জানানো হয়েছে গবেষণায়। গবেষণা হিসাব কষে দেখানো হয়েছে, যদি আমার আপনার সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকে দ্রুত এক লাখ কোটি গাছ বসিয়ে ফেলার, তাহলে অন্তত জায়গার অভাবে সেসব গাছের বেড়ে উঠতে ও বেঁচে থাকতে কোনো অসুবিধা হবে না। পৃথিবীর স্থলভাগের যতটা নিয়েছে শহর আর গ্রাম, চাষাবাদের জন্য সেই জমিতে যতটা ভাগ বসানো হয়েছে, তাকে হিসাবের বাইরে রেখেও গবেষকরা দেখিয়েছেন, গাছ লাগানোর জন্য ৩৫ লাখ বর্গমাইল বা ৯০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা পড়ে রয়েছে পৃথিবীতে। জায়গাটা মোটেই কম নয় কিন্তু।

গবেষণা এও জানিয়েছে, প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বায়ুম-লে যে পরিমাণে কার্বন জমা হয়েছে, এক লাখ কোটি গাছ খুব তড়িঘড়ি রোপণ করা সম্ভব হলে তার ২৫ শতাংশই বায়ুম-ল থেকে সরে যাবে। বায়ুম-ল হয়ে যাবে ১০০ বছর আগেকার মতো।

গাছ তার সালোক সংশেষণের জন্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে দু’টি জিনিসকে। এক, সূর্যালোক। আর দুই, কার্বন ডাই-অক্সাইড। ফলে, যত বেশি গাছ লাগানো সম্ভব হবে, তাদের সালোক সংশেষণের জন্য প্রয়োজনে গাছ তত বেশি করে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নেবে বায়ুম-ল থেকে। তাতে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ কমবে উলেখযোগ্যভাবে। যে কার্বনটা জমা থাকবে গাছের পাতা, কা- ও শাখা-প্রশাখায়। গাছের বেড়ে ওঠার প্রয়োজনে তা কাজে লাগাবে। সেটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। গবেষণা জানিয়েছে, শিল্পবিপবের পর থেকে এখনো পর্যন্ত বায়ুম-লে জমা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টন বা ৩০ ্হাজার কোটি মেট্রিক টন কার্বন। আর এক লাখ কোটি গাছ প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠলে, তা বায়ুম-ল থেকে টেনে নেবে ২০ হাজার ৫০০ কোটি মেট্রিক টন বা ২২ হাজার ৫০০ কোটি টন কার্বন। ফলে, শিল্পবিপবের পর থেকে এখনো পর্যন্ত বায়ুম-লে যতটা পরিমাণে কার্বন জমা হয়েছে, একলাখ কোটি গাছ প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে ওঠার পর তার দুই-তৃতীয়াংশ কার্বনই টেনে নেবে নিজেদের শরীরে। তাই বাতাসে বিষ কমবে নিশ্চিতভাবেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই এক লাখ কোটি গাছ লাগানোর ফলে, পৃথিবীর বনাঞ্চল বেড়ে যাবে তিনগুণ। তবে তা শহরের এলাকায় ভাগ বসাবে না। কেড়ে নেবে না চাষাবাদের জমিও। ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্চ (আইপিসিসি)- এর রিপোর্টও জানাচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা যাতে আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ২.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি না বেড়ে যায়, তার জন্য আরো ৩৮ লাখ বর্গ মাইল বা ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার জমিতে বনাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলা প্রয়োজন যে, বৃক্ষ রোপণ করার ন্যায় রোপিত চারার যতœ ও সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোপিত চারার সুষ্ঠু পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পৃথিবীতে প্রতিবছর অনেক চারা নষ্ট হয়ে যায়। তাই রোপিত বৃক্ষের চারা যতœ, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চারা গাছকে বড় গাছে পরিণত করতে হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা