কাশিমাড়ী তহশীল অফিসে ঘুষের হাট!


প্রকাশিত : আগস্ট ১, ২০১৯ ||

পত্রদূত রিপোর্ট: শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভুমি কর্মকর্তা খন্দকার আশরাফ এবং পিয়ন আইয়ুব আলী কাশিমাড়ী ভূমি অফিসকে ঘুষের হাট বসিয়েছে। ঘুষের লেনদেনে এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। শুধু জমিজমাদির সমস্যা না করে এমন কথা চিন্তা করে এলাকার কেউ এদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনা এমনকি সাংবাদিকদেরও তথ্য দেওয়া তাদের নিষেধ। ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে এমন কোন অভিযোগ নেই যা এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নেই।
জয়নগর গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, তার পৈত্রিক সম্পত্তির খাজনার দুটি চেক কাটা বাবদ যথাক্রমে ১২৫ টাকা ও ২৮০ টাকা মোট ৪০৫ টাকার বিপরীতে তহশীল অফিসের পিয়ন আইয়ুব আলী তার কাছে ৫০০০ টাকা দাবী করলে শেষ পর্যায়ে ৩০০০ টাকায় দফারফা হয়। পিয়ন আইয়ুব আলী তাকে আরও বলে যে, এই কথা অন্যকে বললে পুনরায় ঐ জমির চেক কাটা লাগবে।
গোবিন্দপুর নতুন হাটের পূর্বপাশে ইটভাটার সরদার সাইফুল ইসলামের পৈত্রিক ভিটার সীমানায় পাকাঘর নির্মাণ করতে গেলে সেখানে উপস্থিত হন তহশিলদার আশরাফ হোসেন। ত্রিশ হাজার টাকা ঘুষের দাবীতে নির্মাণ কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান নায়েব আশরাফ হোসেন। টাকার অঙ্ক একটু কমিয়ে আনলে শেষমেশ দফারফা হয়ে পূনরায় নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
দেওল গ্রামের মৃত ললিত ম-লের ছেলে প্রাক্তন শিক্ষক অজয় ম-লের নিকট থেকে জমির খাজনা নিয়ে শুরু করে তালবাহনা। জমির কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও তহশীলদার খন্দকার আশরাফ ভুক্তভোগীকে তার জমির কাগজপত্রে ব্যাপক সমস্যা আছে উল্লেখ করে তার নিকট ৬০০০ টাকা দাবী করে। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তি এত বেশি টাকা দিয়ে খাজনার চেক না কেটে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
দেওল গ্রামের বাকের আলী গাজীর ছেলে মোকসেদের নিকট হতে ভুঁয়া দাখিলা বাবদ নিয়েছে ৪০০০ টাকা।

কাশিমাড়ী গ্রামের ভুলু কবিরাজের ছেলে ঘোষ্টের নিকট থেকে জমির খাজনার চেক কর্তন বাবদ মাত্র দেড়শত টাকার বিপরীতে একহাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করে তহশিলদার খন্দকার আশরাফ হোসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও একাধিক ব্যক্তি এমন তথ্য জানিয়েছে এই প্রতিবেদককে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, জমির মিউটিশন (নামপত্তন) বাবদ তার নিকট থেকে পর্যায়ক্রমে পিয়ন আইয়ুব আলী ৮৫০০ টাকা ও তহশীলদার ৪০০০ টাকা নিয়েছে। এতগুলো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উভয় কর্মরত ব্যক্তিদ্বয় বলে জমির কাগজপত্রে সমস্যা আছে। টাকা না দিলে কাজ হবেনা।
এদিকে কাশিমাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন সরকারি রাস্তার ধারে ব্যক্তি মালিকানায় লাগানো বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কর্তনেও তহশিলদার খন্দকার আশরাফ হোসেন ও পিয়ন আইয়ুব আলী স্ব-শরীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মোটা অংকের ঘুষ দাবী করেন। ব্যক্তি সীমানার মধ্যে লাগানো ব্যক্তি মালিকানার গাছ কর্তনে আবার কিসের টাকা লাগবে? কিন্তু একাধিক জায়গায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করেছে ঐ দুই কর্মরত ব্যক্তি। নিজের ব্যক্তি মালিকানায় ব্যক্তি সীমানার মধ্যে লাগানো গাছ কর্তনে বাঁধা দিয়ে ঘুষের টাকা নিয়েছে তহশিলদার। কাশিমাড়ী গ্রামের হযরত গাজীর ছেলে আব্দুল গফুর গাজীর নিকট হতে ২০০০ টাকা, গোবিন্দপুর গ্রামের আবুল কালামের নিকট হতে ৫০০০ টাকা, একই এলাকার আলাউদ্দিন বিশ্বাসের নিকট হতে ৩০০০ টাকা নিয়েছে তহশিলদার খন্দকার আশরাফ হোসেন। সিদ্দিক গাজীর নিকট হতে গাছ কাটার দরুণ ৪০০০ টাকা নিয়েছে।
শ্যামনগর-কাশিমাড়ী সড়কের পাশে জেলা পরিষদের জায়গায় (ডিসিয়ার কাটা) কোন পাকাভবন নির্মাণ করা যায় না। কিন্তু খন্দকার আশরাফ হোসেন জেলা পরিষদের ডিসিয়ার কাটা সেই জায়গায় দোতলা পাকাভবন নির্মাণেরও অনুমতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। আসলে ক্ষমতা কেমন জিনিস তা কেবলমাত্র কাশিমাড়ী তহশীল অফিসে গেলেই বুঝা যায়।
জানা গেছে, গত ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর তারিখে সোনাভান নামে ৬৫৯ টাকার চেক কাটার নামে ২০০০ টাকা গ্রহণ করেন তিনি। যার দাখিলা নং ৬০৭৭৯২।
দক্ষিণ কাশিমাড়ীর জমাত সানা প্রায় দেড় মাস একটি রিপোর্টের জন্য তহশীল অফিসে হাটছেন। কিন্তু টাকার অভাবে সেই রিপোর্ট আজও নেওয়া হয়নি তাকে।
কাশিমাড়ী মৃত ইউসুফ আলী মোল্যার ছেলে আবুল বাসারের নিকট থেকে ১৬৪ নং খতিয়ান ৩০ টাকা ও ৯৭০ নং খতিয়ান ২৫০ টাকাসহ মোট ২৮০ টাকার চেক কাটা বাবদ ১৫০০টাকা ঘুষ নিয়েছেন নায়েব আশরাফ হোসেন।
সম্প্রতি সময়ে কাশিমাড়ী ইউনিয়নের অন্যতম সরকারি খাস খাল বালিয়াখালী খাল নিয়ে তহশিলদার আশরাফ হোসেন শুরু করে তার জীবনের দুর্নীতি সেরা অধ্যায়। সরকারি খাস খাল ইজারায় না তুলে একাধিক মহলের নিকট হতে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেন। কোন মহল কত টাকা দিয়ে তহশিলদারকে ম্যানেজ করতে পারবে? এমন প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী জলাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষে সরকারি বালিয়াখালী খাল অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে গত ২৭ জুলাই শনিবার ‘জাল যার জলা তার’ সেøাগানে ঝাপিয়ে পড়ে উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু এই ঘটনার পরও তহশিলদার মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ওই খাল নিয়ে নানান তালবাহানা করেন। শেষ পর্যন্ত খালটি স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি রাজস্বের বিনিময়ে মাছ চাষের অনুমতি পেয়েছেন বলে জানা যায়।
এলাকাবাসী কাশিমাড়ী ভূমি অফিসের এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শ্যামনগর উপজেলা নবাগত ভূমি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের নিকট অনুরোধ জানিয়েছেন।
কাশিমাড়ী তহশিলদার খন্দকার আশরাফ হোসেনের সাথে বুধবার একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন থেকে বলা হয়, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছেনা’।