ডেঙ্গু ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা


প্রকাশিত : August 5, 2019 ||

পাভেল পার্থ:
প্রশ্নহীনভাবে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য এক জটিল দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিস মশাবাহিত এ রোগটি দুম করে এক দুই দিনে এমন লাগামহীন হয়ে যায়নি। মোটাদাগে জনস্বাস্থ্যসেবায় সংকট এবং প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদাসীনতা ডেঙ্গু বিষয়ে সাম্প্রতিক তর্কের ময়দান দখল করে আছে। আড়াল হয়ে পড়ছে পরিবেশগত সংকট ও বাস্তুসংস্থানের বিশৃংখলার বিষয়গুলো। যতটুকু জানা গেছে বাংলাদেশে এই ডেঙ্গু ছড়িয়েছে মূলত: ঢাকা অঞ্চল থেকেই। নিদারুণ পরিবেশ-যন্ত্রণায় কাতর এই মহানগরকে আমরাই প্রতিদিন আমাদের জন্য বিপদজনক করে তুলছি। এই ছোট্ট নগর আর আমাদের দু:সহ দূষণ ভার সইতে পারছে না। আমরা নির্দয়ভাবে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ ও বালু নদীকে হত্যা করে চলেছি। ঊনিশ খালসহ সকল জলাশয় উধাও করে দিয়েছি। নতুন প্রজন্মের জন্য এক চিলতে ফাঁকা মাঠ কী ময়দান আমরা অবশিষ্ট রাখছি না। এই নগরের ক’টি উদ্যানই বা সুস্থ আছে? অল্প বর্ষাতেই এই শহর ডুবে ভেসে একাকার হয়ে যায়। লাগামহীন নগরবর্জ্যরে যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই শুরু হয় আমাদের প্রতিটি ভোর। ভ্যাপসা গরমে এই নগরে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। একের পর এক আগুনে ছাই হয়ে যায় কত সাজানো সংসার। বসতঘরের চারধারে আমরা মজুত করেছি রাসায়নিক বিস্ফোরক, আশেপাশে গড়ে তুলেছি প্লাস্টিকসহ বিনাশী কারখানা। অনেক কষ্টে ট্যানারিকে কিছুটা দূরে সরাতে পেরেছি, কিন্তু তাও আর দূরে কই! একটু প্রাণ ভরে দম নেয়ার জন্যও বিষহীন বাতাস কই এই নগরে? সবদিক দিয়েই ঢাকা আজ এক পরিবেশ-সংকটাপন্ন শহর। আর এই পরিবেশ বিপর্যস্ত অঞ্চল নানা সময়ে নানাভাবে মানুষের জন্য তৈরি করছে দু:সহ যন্ত্রণা। ডেঙ্গু কী চিকুনগুনিয়া এমনি এক পরিবেশগত তীব্র সংকটের নিদারুণ নির্দেশনা। ডেঙ্গু মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে প্রতিটি পল বিপল অনুপল। নানামুখী প্রশ্ন ও তর্ক থাকলেও বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করছে ডেঙ্গু মোকাবেলায়। মশকনিধনের নানা প্রক্রিয়া ও তৎপরতা নিয়ে বাহাস চলছে। সকলেই একমত যে, চলমান ডেঙ্গু সংকট মোকাবেলায় আমাদের দরকার এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল। পরিবেশব্যবস্থায় সুস্থতা না থাকলে ম্যালেরিয়ার পর চিকুনগুনিয়া এরপর ডেঙ্গু একের পর এক দু:সহ যন্ত্রণা প্রকট হয়ে ওঠবে। পাশাপাশি জটিল শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, বহুমূত্র, ক্যান্সারসহ জটিল রোগের বিস্তার ঘটবে। ডেঙ্গুকে কেবলমাত্র কোনো এক বছরের মৌসুমি সংকট হিসেবে না দেখে ডেঙ্গুসহ এমনসব জটিল যন্ত্রণা মোকাবেলায় এই প্রসঙ্গসমূহ রাষ্ট্রীয় মূলচিন্তা হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের প্রবল মনস্তত্ত্বে সামগ্রিক পরিবর্তন দরকার। এটি তো এমন নয়, কোনো এক মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বেশি হবে আর মানুষ আক্রান্ত হবে। তারপর আমাদের মশকনিধন ও স্বাস্থ্যসেবা তৎপরতা শুরু হবে। ডেঙ্গুসহ এমনসব নাগরিক যন্ত্রণার মর্মমূলে আমাদের ফিরে তাকানো জরুরি। কেন এবং কোন পরিবেশে মশার বিস্তার ঘটছে, আবহাওয়া ও জলবায়ু এবং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের সাথে এর নানামুখী সম্পর্ক কেমন? ভূগোল, শ্রেণি ও বর্গ বিশেষে এর বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ কেমন? কোনো বিশেষ সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দোষারোপ নয় আমাদের সকলের যার কাছে যতটুকু নথি, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা আছে তা দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমাদের রাষ্ট্রীয় ভান্ডার গড়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক প্রশ্ন হলো, ‘মশা কেন বাড়ছে?’ এই প্রশ্নের উত্তর নানাভাবে আমাদের তলিয়ে দেখা জরুরি। আর এর নানামুখী উত্তরই আমাদের সামগ্রিক ডেঙ্গু মোকাবেলার সকল সূত্র সামনে তুলে ধরতে পারে। যা মশাজরিপ থেকে শুরু করে আগাম সতর্ক বার্তা, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা, মশক নিয়ন্ত্রণ, সক্রিয় চিকিৎসাসেবাসহ সামগ্রিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২.
নগর কী গ্রাম প্রতিটি অঞ্চলেই এক এক ধরণের প্রাণব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যের ব্যাকরণ থাকে। আমরা ঢাকা শহরের প্রাণব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যের ব্যাকরণ নিয়ে তুমুল উদাসীন। গ্রাম কী শহর প্রতিটি জনপদেই কেবল মানুষ নয়, আরো নানা প্রাণপ্রজাতি থাকে। তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক প্রতিবেশসূত্র ও স্বতন্ত্র বাস্তুসংস্থান। এই বাস্তুসংস্থানে নানামুখী খাদ্যশৃংখল তৈরি হয়। যখন কোনো বাস্তুসংস্থানে কোনো একক প্রজাতি নির্বিকারভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং অন্যসকল বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে তবে সেই বাস্তুসংস্থান চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে। বহুমুখী সংকট সেখানে তৈরি হয়। মহানগর ঢাকার ক্ষেত্রে তাই ঘটে চলেছে। এখানে এককভাবে সবকিছু কেবলমাত্র মানুষের জন্য তৈরি হচ্ছে, সকলকিছু এখানে কেবল মানুষের জন্যই। এভাবে কোনো অঞ্চলের স্বকীয় প্রতিবেশসাম্য তৈরি হয় না। প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাকরণ অটুট থাকে না। ঢাকা এখন মানুষ ও এডিস মশার দখলে। এককভাবে এই দুই প্রজাতি ছাড়া অন্যান্য প্রাণপ্রজাতি এখান থেকে বিলীন হয়েছে। আর তাই মানুষ ও মশার এই সংকট আরো জটিল ও তীব্র হয়ে ওঠছে। এখানে প্রাণ-প্রজাতির প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও ভারসাম্যের গণিত ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ, চামচিকা, টিকটিকির মতো প্রাণীরা নেই। যারা মশা খেয়ে মশার সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতো। মশক নিয়ন্ত্রণে কেবলমাত্র রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের কথাই ভাবা হচ্ছে। যা সাময়িক সংকট সামাল দিলেও এর এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী সুরাহা নয়। মশক নিয়ন্ত্রণে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সমন্বয় ঘটানো জরুরি। কারণ একতরফাভাবে কীটনাশক ছিটিয়ে মশার লার্ভা কী মশা মেরে মশার সামগ্রিক বিস্তার ঠেকানো অসম্ভব। কারণ মশার ডিম যা কয়েকমাস অবধি জীবন্ত থাকে এবং আবার উপযুক্ত পরিবেশে জন্ম নেয়। এই নগরের প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃংখল ব্যবস্থা সম্পূর্ণত বদলে গেছে। দীর্ঘমেয়াদী সংকটহীন জীবন কাটাতে নগরের এই প্রাকৃতিক খাদ্যশৃংখল ব্যবস্থাকে আমলে নিতে হবে। মশার উপর নির্ভরশীল প্রাণীজগতের সুরক্ষার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গড়ের একটি অংশ ঢাকাতে। শালবনের এক অতীত স্মৃতি আছে এই ঢাকার মাটিতে। সতের শতকেও ঢাকার বনাঞ্চলে বাঘ, চিতাবাঘ দেখা গেছে। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৮০৪ সনে ঢাকায় ২৭০টি বাঘের চামড়া এবং ১৯০৭-১৯১০ পর্যন্ত ১৩টি বাঘের চামড়া শিকারীরা জমা দেয়। ১৮৩৭ সাল অবধি প্রতিবছর কমপক্ষে একজন এখানে বাঘের হামলায় নিহত হয়েছে। বনবিড়াল, বনশূকর, বুনোমহিষ, বানর, শেয়াল, গন্ধগোকূল, বেজি, ইঁদুর, সাপ, খরগোশ, সজারু, বাদুড়, চামচিকা, ভোঁদড় আর নানা জাতের পাখির বিচরণ ছিল এই মহানগরে। নিদারুণভাবে সব হারিয়ে এই নগর আজ মানুষ আর মশাকে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
৩.
চলমান ডেঙ্গু সংকট কাটাতে মশা নিয়ন্ত্রণে এখনো পর্যন্ত কেবলমাত্র রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার কথাই আলোচিত হচ্ছে। কিন্ত রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপি নানাভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। এককালে আমরা ডিডিটি ব্যবহার করেছি, এই আমরাই আবার ডিডিটি ধ্বংষ করতে এক বিশাল প্রকল্প সমকালে হাত নিয়েছি। ২০১৯ সনের ২৮ জুলাই আণবিক শক্তি কমিশনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সভায় বিশেষজ্ঞ কমিটি ম্যালাথিয়ন ৫৭% ইসি, ম্যালাথিয়ন ৫% আরএফইউ, ডেল্টামেথ্রিন + পিআরও ২% ইডব্লিউ এবং প্রিমিফোস-মিথাইল ৫০% ইসি এই চারটি রাসায়নিক কীটনাশককে মশকনিধনে সুপারিশ করে। জানা গেছে, বিপিএল লিমিটেড কোম্পানির ম্যালাথিয়ন ৫৭% ইসি কীটনাশকটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বাতিল কীটনাশক তালিকায় আছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলায় ২০০৭ সনে এর নিবন্ধন বাতিল হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের অর্থায়নে আইসিডিডিআরবির করা ২০১৭-২০১৮ সনের এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকা শহরের এডিস মশা আংশিক ডেল্টা¤্রিেথ্রন ও ম্যালাথিয়ন প্রতিরোধী হয়ে ওঠেছে। মশা নিয়ন্ত্রণের রাসায়নিক নিয়ে এখনো তর্ক চলছে। পরিবেশগত প্রশ্ন নয় বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা বাণিজ্য। কেবল রাসায়নিক দমন নয়, ডেঙ্গু নিরসনে স্টোরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) প্রসঙ্গু আলোচিত হচ্ছে। এভাবে প্রকৃতিতে কৃত্রিমভাবে বন্ধ্যা পুরুষ মশার বংশ বাড়িয়ে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হতে পারে তা এখনো পরীক্ষিত নয়। তারপরও দেশজুড়ে মানুষ চাইছে রাষ্ট্র সক্রিয় হোক, দ্রুত একটা কিছু করুক। এডিস মশার বংশ ও বিস্তার দ্রুত নির্মূল হোক। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে এখন হয়তো রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া সামনে আর কোনো সহজ কৌশল নাই। তাই যতটা সম্ভব জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশপ্রশ্নকে বিবেচনা করে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম নীতি মেনে দ্রুত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে দীর্ঘমিয়াদী মশক নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই আমাদের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় কর্মপন্থা তৈরি করা দরকার।
৪.
মশা নিয়ন্ত্রণে এবং মশাজনিত অসুখ বিশেষত ম্যালেরিয়া জ্বরের চিকিৎসায় দেশজুড়ে লোকায়ত পরিবেশবান্ধব নানা পদ্ধতি ও চিকিসার চল আছে। কুমুদ সুকুমার ও অন্যান্যরা (১৯৯১) মশক নিয়ন্ত্রণে ল্যামিয়াসি, অ্যাস্টারেসি, ক্ল্যাডোফোরেসি, ম্যালিয়াসি, ওয়সিস্টাসি এবং রুটাসি পরিবারের উদ্ভিদসমূহকে ভবিষ্যতের মশক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর সূত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০০০ সনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে যখন ঢাকা ও সিলেট বিভাগের ১৪টি আদিবাসী জাতিসত্তার ভেতর জনউদ্ভিদ সমীক্ষা চালাই তখন ৫ টি উদ্ভিদকে মশা নিবারক হিসেবে সণাক্ত করি। বিশেষত চাবাগানের মুন্ডারা ধুরপি-শাকের (খবঁপধং রহফরপধ) পুরো গাছের রস এবং ওঁরাওরা গঙ্গাতুলসি মান (ঐুঢ়ঃরং ংঁধাবড়ষবহং) গাছের পাতা মশা তাড়াতে ব্যবহার করেন। শেরপুরের কোচ জনগোষ্ঠী নিমপাতা (অুধফরৎধপযঃধ রহফরপধ) ব্যবহার করেন। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ত্রিপুরা আদিবাসীরা গর্জনের (উরঢ়ঃবৎড়পধৎঢ়ঁং পড়ংঃধঃঁং) আঠা ও চেংপিছলার (খরঃংবধ মষঁঃরহড়ংধ) ছাল দিয়ে ধোঁয়া দেন। এমনকি হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য হতে কয়েল কোম্পানিরা গাছের পর গাছকে খুন করে চেংপিছলা গাছের ছালবাকল তুলে নেয়। এভাবে কত গাছের যে মৃত্যু হয়েছে তার কোনো হদিশ নেই। অ্যানোফিলিস মশার নিয়ন্ত্রণে সাদাজিওল বা কেন্দার (ঔধঃৎড়ঢ়যধ পঁৎপধং) গাছের পাতা (তবফিহবয বঃ ধষ. ২০১১), লেবুর খোসা ও ইউক্যালিপটাস পাতা (ঝযড়ড়ংযঃধধৎর বঃ ধষ. ২০১২), ঝুমকি ও শ্বেতদ্রোণ গাছের পাতা (অৎরাড়ষর বঃ ধষ. ২০১২)), সেনা গাছের পাতা (ঞুধমর বঃ ধষ. ২০১৩) এবং কাকমাচির বীজ (ঝরহময ধহফ গরঃঃধষ (২০১৩) ব্যবহার করে বেশ ভাল ফল পেয়েছেন অনেকেই। কিউলেক্স মশার নিয়ন্ত্রণে নলখাগড়ার পাতা ও ডাঁটা (ইৎবধস বঃ ধষ. ২০০৯), নিমপাতা (গধৎধমধঃযধাধষষর বঃ ধষ.২০১২), গাঁদা ও পুটুস বা ল্যান্টানার ফুল ও পাতা (অসৎঁঃযধ বঃ ধষ. ২০১৩) ব্যবহার করেছেন অনেকে। পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেও এরকম উদ্ভিদজাত লোকায়ত পদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণার নজির আছে। বনতুলসি ও সাদা জিওলের পাতা এবং লেবুর খোসা (কধুবসনব ধহফ ঈযধরনাধ, ২০১২) এবং নিম পাতা (গধৎধমধঃযধাধষষর বঃ ধষ. ২০১২) ব্যবহার করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কিছু গবেষণা নজির আছে। আফ্রিকার তাঞ্জানিয়ায় মশক নিয়ন্ত্রণেও তুলসি, নিম, ল্যান্টানা ও ইউক্যালিপটাসের ব্যবহার দেখা গেছে (সূত্র: গধষধৎরধ ঔড়ঁৎহধষ ২০০৮, ৭:১৫২)। নীলাক্ষী গোহাইন ও অন্যান্যরা (২০১৫) এক জনউদ্ভিদ সমীক্ষায় আসামের নানা অঞ্চলে ম্যালেরিয়া রোধে ব্যবহৃত ২০টি উদ্ভিদ সণাক্ত করেন। যার ভেতর অশ্বগন্ধা, ফুলকুড়ি, চিরতা, পিপুল, ভাঁট ও চালতা বাংলাদেশেও ম্যালেরিয়া জ্বর রোধে ব্যবহৃত হয়। আব্দুল কাইয়ুম ও অন্যান্যরা (২০১৬) এক জনউদ্ভিদ সমীক্ষায় ৫২টি উদ্ভিদকে ম্যালেরিয়ারোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, বাসক, সোনালু ও চিরতা লোকায়ত পদ্ধতিতে ম্যালেরিয়ারোধে সবচে বেশি ব্যবহৃত উদ্ভিদ। রহমত উল্লাহ ও অন্যান্যরা (২০১২) বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভেতর ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত ১১টি উদ্ভিদকে সণাক্ত করেছেন। প্রত্যুষা কান্টেকি ও আলাপাটি পদ্মা (২০১৭) উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে মশক নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু লোকায়ত পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন ঐ অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ তুলসি, শিরিষের বাকল, নিশিন্দা পাতা, রঙের বীজ, বনপালংয়ের ডগা, তামাক পাতা, ল্যান্টানা পাতা, কাশ ও ছোট আকন্দ গাছগুলো মানুষ মশা তাড়াতে ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণের এমনতর অনেক পরিবেশবান্ধব লোকায়ত পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ডেঙ্গু নির্মূলের দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় পরিকল্পনায় এমন পরিবেশবান্ধব লোকায়ত পদ্ধতিগুলো যুক্ত করা জরুরি। এখানে থেকেই পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার বহু সূত্র বেরিয়ে আসবে, যা এক টেকসই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে।
৫.
বলা হয় জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে মশাজনিত রোগের বিস্তার বাড়ে। হয়তো চলমান ডেঙ্গু সংকটের সাথে জলবায়ুগত বিপর্যয়ের একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী নাগরিক সমাজ কেউ তার দায় বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাবে। এখনো মানুষ হিসেবে আমরা মশা থেকে বাঁচতে সম্ভবত হাতটাকেই বেশি ব্যবহার করি। নিজের হাতে মশা চ্যাপ্টা করেনি এমন মানুষ বিরল। মশারি টানিয়ে ঘুমানো, সকাল-সন্ধ্যা ঘর-দোরে ধূপ-ধূনো দেখানো গ্রাম-বাংলার এক মুখস্থ ছবি ছিল একসময়। বিকালের পর সন্ধ্যার আগেভাগে ঘরের দরজা-জানালা লাগানো, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি ঘরে তোলা। কেবলমাত্র মানুষ নয়, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগিকে মশা থেকে বাঁচাতেও গ্রাম-বাংলার মানুষ নিম তেল মাখায়, ঘরে ধূপ-ধূনো দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মধুপুর শালবনে একটা কথা চালু আছে প্রক্রিয়াজাতকৃত নাপ্পি ও নাখাম নামের শুঁটকি খেলে মশা কম কামড়ায়। হাওরাঞ্চলে মশা ও কীটপতঙ্গ থেকে বাঁচতে ফাল্গুন মাসে ঘাটাবান্ধা ব্রতের আয়োজন করা হয়, যেখানে সন্ধ্যার আগে মশা-মাছি পোড়াতে হয়। অনেক জায়গায় মশার কামড় ও মশাজনিত জ্বর থেকে বাঁচাতে আমগুলঞ্চ, তিতকরলা, নিশিন্দা, বাসক, চিরতা, অশ্বগন্ধা ও কালোমেঘ খাওয়ার চল আছে। গাঁদা ফুল, আতা ফল, কেন্দার, ল্যান্টানা, তুলসি, পুদিনা গাছ ঘরের চারধারে লাগালে মশার উপদ্রব কম হয়, ঘরে মশা কম ঢোকে। মশার কবল থেকে বাঁচতে অনেকে ধূপ-ধূনোর সাথে কর্পূর, কেরোসিন, দর্শনচ’র্ণ ও তুঁতে মিশিয়ে ছিটান। বাড়ির চারধার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, সকাল-বিকাল উঠান ও বাড়িঘর ঝাড়দেয়া সাফসুতরো করা গ্রাম-বাংলার এক নিত্যদিনের কাজ। চলমান ডেঙ্গু সংকট এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা যন্ত্রণাকাতর নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের এক দীর্ঘদূরত্ব তৈরি করছে। আমরা চাই রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই দূরত্ব দ্রুত ঘুচে যাবে। রাষ্ট্র সকল জনকে নিয়ে ডেঙ্গু মোকাবেলায় তৈরি করবে এক মজবুত সক্রিয় বলয়। দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নই হবে যার কেন্দ্রীয় ভিত।
গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ। ই-মেইল: ধহরসরংঃনধহমষধ@মসধরষ.পড়স