‘শূন্যেরে করিব পূর্ণ’- রবীন্দ্রনাথ


প্রকাশিত : August 5, 2019 ||

অরবিন্দ মৃধা:
বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এঁর মহাপ্রয়াণের ৭৮তম বছর পরেও মানবজাতির কাছে তাঁর সৃষ্ট শিল্পসাহিত্যকর্ম আলোক রশ্মিসম বিষ্ময়কর। দেশ এবং বিশ্বের নানা দেশের রবীন্দ্র সাহিত্য বিশ্লেষক, গবেষক, চর্চাকারীগণের নিকট থেকে বেরিয়ে আসছে তাঁর প্রদর্শিত মানব কল্যাণের নতুন নতুন ধারণা। কিন্তু জন্মের ১৫৮টি বছর চলে যাওয়ার পরও বিচিত্র পথের রবীন্দ্রসাহিত্য বাঙালির ঘরে সর্বত্রগামী হতে পেরেছে কি? যে গান, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটকসহ সকল সৃষ্টি উৎসমুখী এবং অফুরন্ত প্রাণশক্তির আঁধার, সে সম্পদ কবে যে ধনী দরিদ্র মধ্যবিত্তসহ সকলের ঘরে উঠবে কে জানে। তাঁকে তো দেশের সীমানার গ-িতে বেঁধে রাখা যায় না। কারণ রবীন্দ্রনাথ উত্তরকালের কাছে যে শিক্ষা রেখে গেছেন সে তো মানবতাবাদের শিক্ষা, জন-জাতির আত্মচৈতন্যবোধের শিক্ষা, সম্মুখপানে ফিরে দাঁড়ানোর শিক্ষা, সমাজ-সংস্কৃতি বিকাশের শিক্ষা একজন খাঁটি মানুষ হওয়ার শিক্ষা। সংকীর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোধ করি রবীন্দ্রদর্শন অধরাই রয়ে যাবে। কারণ রবীন্দ্রসাহিত্য দেশকাল পাত্রের সীমানার গ-িতে আবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের রবি যেমন বিনাশর্তে জগৎ জুড়ে আলো ছড়াচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি সম্ভারও তেমনি বিশ্বজুড়ে মানুষের সুষ্ঠু ধারায় চিন্তাশক্তি, আত্মশক্তি বিকাশে অনুপ্রাণিত করছে। বাঙালির সম্পন্ন জীবনের ঠিকানা রবীন্দ্রনাথ, তাইতো তিনি বিশ্বকবি, বিশ্ববাঙালি।
রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর সৃষ্টকর্মের মধ্যে অন্যতম। গীতাঞ্জলির কি বিস্ময়কর প্রাণশক্তি সেতো কমবেশি সবার জানা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বাঙালি জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি, স্বাধীন সত্ত্বা প্রতিষ্ঠায়, চেতনায় আঘাত হানায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির পথে আমাদের অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ। ভেদবুদ্ধিহীন সত্য ও সুন্দরকে খুঁজতে হলে বার বার রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’ বাস্তবে তার প্রতিফলন আমরা দেখেছি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে। ৪৭-এ ভারত ভাগের পর পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর ইশারায় পূর্ব বাংলায় প্রচার মাধ্যমে রবীন্দ্র সংগীত বাধাগ্রস্থ হয়। পাক সামরিক শাসক আইয়ুব খানের নির্দেশে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষে বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। সব বাধা উপেক্ষা করে ১৯৬১ তেই সারা বাংলায় দশ-পনের দিন ধরে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন হলো, আর এ কাজের অন্যতম পুরোধা ছিলেন সন্্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকসহ সমমনা কিছ দিপ্তিমান বাঙালি রবীন্দ্রপ্রেমী। ‘রবীন্দ্রগীতির মুক্তি’ প্রবন্ধে ওয়াহিদুল হক বলেছেন, ‘সেনা শাসনের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে। চ্যালেঞ্জ করে ঢাকায় উদ্যাপিত হয় জয়ন্তী শতবার্ষিক, এগারো দিন জুড়ে তিন’শ গান, চারটি নৃত্যনাট্য; চারটি নাটক; ও নানাবিধ প্রদর্শনীর সমন্বয়ে… সন্্জীদা ও আমি সে উপলক্ষ্যে সম্ভবত এগারো শহরে অনুষ্ঠানে যোগ দিই।’ বাধাকে উপেক্ষা করে সেদিনের নিরাসক্ত রবীন্দ্র প্রেমীগণ সম্মিলিত হয়ে সত্য এবং সুন্দরকে বরণ করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মিলনের যে শক্তি, প্রেমের যে প্রবল সত্যতা তাহার পরিচয় আমরা পদে পদে পাইয়াছি। পৃথিবীতে ভয়কে যদি কেহ সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে পারে, বিপদকে তুচ্ছ করতে পারে, তবে তাহা প্রেম।’ ওই দ্রোহ থেকে জন্ম নেয় ‘ছায়ানট’ কবি বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন যার প্রথম সভাপতি। বাধা পেয়ে জেগে উঠলো মুক্তচিন্তার বাঙালি। স্বাধীনতার পথ বেগবান হলো। কালে কালে এই সংগঠনই বাংলাদেশে বর্ষবরণসহ বারো মাসে তেরো পার্বণ এবং রবীন্দ্র চেতনা জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারপরও কি রবীন্দ্রনাথ কিছু মধ্যবিত্ত অনুরাগী আর বুদ্ধিবৃত্তি চর্চাকারীর কাছে ছাড়া সর্বত্রগামী হয়েছেন? তবে আশার কথা এই, আমাদের দেশে পূর্বের তুলনায় আরও কিছু রবীন্দ্র সংগঠন ও গণমাধ্যমগুলির কল্যাণে রবীন্দ্র সংগীতের গায়ক ও শ্রোতা সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, সে রবীন্দ্রনাথকে বুঝে হোক আর না বুঝে হোক। রবীন্দ্রগ্রন্থ অনেকের বইয়ের তাকে শোভা বর্ধন করছে, কিন্তু পঠন-পাঠন, মননে, জ্ঞান অর্জন হয়েছে কতটুকু? অধ্যয়ন অধ্যপনার ভার নিয়ে যাঁরা সমাজে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরাই বা কতটুকু রবীন্দ্রচর্চা করছেন। পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্র জীবনই কি সব? আত্মকেন্দ্রিক বৃত্তিলোলুপতা এবং অসুস্থ দর্শন যেন আপাতত দৃষ্টিতে মানুষকে তাড়িত করছে।
সংকটকালে আত্মচৈতন্যবোধ জাগরণে রবীন্দ্রনাথ কান্ডারী। রবীন্দ্রনাথের সভ্যতার সংকট, কালান্তর, বিশ্বমানবতার অবক্ষয় ও ভয়াবহতার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সুষ্ঠু সংস্কৃতির জীবন চর্চায়, মননশীল সাহিত্য চর্চায় রবীন্দ্র দর্শন শক্তিশালী ধারা। জীবন সংস্কৃতির ধারা কালক্রমে পরিবর্তন হয়। খারাপটা মানুষ সহজে গ্রহণ করতে পারে, সেক্ষেত্রে ব্যক্তি, সমাজ, দাম্পত্য জীবনে রবীন্দ্র দর্শন মঙ্গলের পথে চালিত করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে তাঁর কাব্য-সাহিত্যের সাথে তাঁর গান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভূবন খানি, তখন তাকে চিনি আমি তখন তাকে জানি’। তার ২২২২টি গানের মধ্যে ফুটে উঠেছে সুর ও বাণীর বৈচিত্রতা, তিনি গানের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকায় বেশি আশাবাদী।
সংকটে, সংঘাতে সম্ভবে, মানবপ্রেমে রবীন্দ্র সাহিত্যসংস্কৃতি আমাদের আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথের শিল্প সাহিত্য কর্মে বাংলাদেশের পল্লী প্রকৃতির চালচিত্র, সাধারণ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে, অথচ সেই সাধারণ পল্লী মানুষের কাছে তাঁর দর্শন আদর্শ পৌঁছেছে কতটুকু। তাঁর কিশোর বয়সে রচিত ‘সন্ধ্যা সংগীত’ (১৮৮২) ‘প্রভাত সংগীত’ (১৮৮৩) ‘ছবি ও গান’ (১৯৮৪) ‘কড়ি ও কোমল’ (১৮৮৬) কাব্যগ্রন্থের বহু স্থানে সাধারণ মানুষের জীবনাচার, দুঃখ, কষ্ট বেদনার কথা ফুটে উঠেছে। ‘পুর্নমিলন’ কবিতায় রাখাল, মাঝি পথিকের কথা ধ্বনিত হয়েছে। ‘কোথাও রাখালের বাঁশি, কোথাও বা দাঁড় বেয়ে, মাঝি গেল গান গেয়ে, কোথাও বা তীরে বসে পথিক ধরিল তান’। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এক সময় মাসের পর মাস আমি পল্লী জীবনের গল্প রচনা করে এসেছি। আমার বিশ্বাস এর পূর্বে বাংলা সাহিত্যে পল্লী জীবনের চিত্র এমন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয়নি’। (১০ আষাঢ় ১৩৪৮ নন্দগোপাল সেন গুপ্তকে লেখা রবীন্দনাথের চিঠির অংশ)। পুণশ্চঃ রবীন্দ্রনাথের গানগুলি খুটে খুটে দেখলে বুঝা যায় অধিকাংশ গানেই তাঁর অধরা জীবন দেবতার সাথে অনন্ত প্রেমের সংলাপ। এর পাশাপাশি স্বদেশ, প্রকৃতি, প্রেমসহ অন্যান্য পর্যায়ের গানের বাণী মানব চেতনা জাগরণী ও কল্যাণমুখী। সেই কৈশোর কাল থেকে ৮০ বছরের জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টকর্ম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বমানবের জীবনমুখী। বিভিন্ন দেশের জীবনধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে পারষ্পারিক ঐক্যসূত্র ও অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ নির্ণয়ের লক্ষ্যে তিনি বিশ্বভারতী সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছেন যা বিশ্ব মানব শিক্ষায় অতুলনীয় সম্পদ। এখানেও তাঁর ভাবনা গান নিয়ে, ১৯৩৯ এ শান্তিনিকেতনের ‘সংগীত ভবনের’ অধ্যক্ষের ভার শ্রী শৈলজারঞ্জনকে দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘… সংগীত ভবনই আমার ভাবনা। আমার গান আমার নাটক থাকবে সেখানে। কার হাতে রেখে যাব আমার গান, আমার নাটক? তুমি ভার নাও আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি। আমি জানি তুমি পারবে’। জীবনের সকল সৃষ্টি তিনি মানুষের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর জীবনের (শেষ জন্মদিনে) ‘শেষ লেখায়’ উল্লেখ করেছেন, ‘আমার এ জন্মদিন মাঝে আমি হারা … শূন্য ঝুলি আজিকে আমার; দিয়েছি উজাড় করি, যাহা কিছু আছিল দিবার…’। (উদয়ন শান্তি নিকেতন, ৬ই মে ১৯৪১)
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে আত্মপ্রত্যয়ী। তিনি ‘শেষের কবিতা’য় উল্লেখ করেছেন, ‘মোর লাগি করিওনা শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই- শূন্যেরে করিব পূর্ণ এইব্রত বহিব সদাই’। লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক