ভাবনায়: ‘অজেয় রবীন্দ্রনাথ’


প্রকাশিত : আগস্ট ৫, ২০১৯ ||

পঞ্চানন মল্লিক:
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে কিছু লেখার সাহস আমার কম; বরং ভয় হয়, না বুঝে আস্ফাস লিখে বিদ্রুপের কালিতে নিজের নামটা না কলঙ্কারঞ্জিত করি। রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান গরিমার কাছে আমি নিতান্ত মূর্খ, ভিতরে ঢোকার বিন্দুমাত্র সক্ষমতা আমার নেই। বলতে পারেন আমার অবস্থা, কোন এক ট্রেনিং এ অংশ নেওয়া হালকা বুদ্ধির সেই যুবকটির মত, যে প্রশিক্ষকের কাছে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশ্ন করেছিল ‘স্যার রবীন্দ্রনাথ তাঁর মাঝি কবিতায় লিখেছেন, মা যদি হও রাজি বড় হয়ে আমি হবো খেয়া ঘাটের মাঝি। পড়াশোনা শিখে যেখানে সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্ট্রার হতে চায়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ মাঝি হওয়ার কথা বলেছেন কেন ?’ এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে রাগে উত্তেজনায় ‘বেরিয়ে যাও’ বলে ধমক দিলেও পরে ঐ ছাত্রসহ সবাইকে প্রশিক্ষক সাহেব বুঝিয়ে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর মাঝি কবিতায় যে মাঝির কথা বোঝাতে চেয়েছেন সে আসলে নদীর ঘাটে খেয়া পারাপারের কোন মাঝি নয়, বরং জীবন নদীর মাঝি যে সমস্ত জাগতিক দুঃখ কষ্ট থেকে তাঁর মাকে পরিত্রান দিয়ে,দেখাবে পারলৌকিক কল্যাণের পথ, তেমন একজন সুসন্তান হতে চেয়েছেন এখানে কবি। আবার ধরেন আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন সংসারে বসবাস করি। আমাদের প্রত্যেকের সংসারেই একজন কর্তা ব্যক্তি থাকেন। তিনি সংসারের অন্যান্য সদস্যের ভরনপোষণের জন্য আয় ইনকাম করাসহ সংসারটি পরিচালনা করে থাকেন। আমাদের সংসারটিকে যদি একটি নৌকার সাথে তুলনা করা হয় তাহলে কর্তা ব্যক্তিটি হলেন তার মাঝি। তাহলে বোঝেন রবীন্দ্রনাথ মায়ের কাছে বড় হয়ে কোন্ মাঝি হওয়ার কথা বলেছেন। আসলে সে রকমই তো তিনি হতে পেরেছেন। তিনিই তো আমাদের বাংলা সাহিত্যের মাঝি বা কান্ডারী। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ভিন্ন বাংলা সাহিত্য অসম্পূর্ণ। তিনি সমগ্র বাঙালি সাহিত্যানুসারীর অগ্র পথিকৃত, পথপ্রদর্শক, অনুসরনের এক পরম আশ্রয়স্থল। বিশ্বে পাঠক মুখে তাঁর প্রবল জয়গান। মনের গোপন ভাঁজে তিনি পৌঁছে দিয়ে গেছেন অনন্য রসদ, কাব্যাক্ষরে ছড়ানো রতন। তাঁর সৃষ্টিকর্মের পাঠে চেপে আমরা অনায়াসে পাড়ি দিয়ে আসি সাহিত্য ভূবন। চেয়ে চেয়ে দেখি কবির নিজস্ব নির্মিত সদন। যে সদনে সোনালি ফসল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে তাঁর হাতের কলম। তাঁর হাতেই ঘটেছে বাংলা কাব্যের মহা বিস্ফোরণ, নব চেতনার অনুরনন। যে শুধা চন্দনে আজ মাধুর্যময় বাংলা কাব্যাঙ্গন।
ছোটবেলায় যখন পাঠ্য বইয়ে তালগাছ কবিতাটি পড়েছিলাম তখন ভাবতাম রবীন্দ্রনাথ বুঝি মাঠের কোনে জন্মানো লম্বা তাল গাছটির কথাই বলেছেন, কিন্তু আজ একটু হলেও বুঝতে পারি তাল গাছকে তিনি অহংকার ও উচ্চাভিলাসিতার প্রতীক রূপেই দেখিয়েছেন। সমাজের উচ্চাভিলাসি মানুষগুলোর দৃষ্টি শুধু উর্দ্ধমূখী, যে মাটিতে তার জন্ম সেই শিকড়ের প্রতি যেন তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই এমনই তার তাৎপর্য। তালগাছ বিষয়টি এখানে গৌণ,আসল বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত ভাববোধ। সোনার তরী কাব্যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা-কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা। এখানে ধান কাটা বলতে তিনি জাগতিক ক্রিয়াকর্মকে বুঝিয়েছেন,আর বরষা বলতে জীবনের বিপর্যয়কে ইঙ্গিত করেছেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথ বিষয় গাম্ভীর্যে স্বীয় প্রতিভায় অ-উন্মোচণীয়। কবিতার পরম পাঠে সে গাঢ় রস আহরনে তাঁর কাব্যের অন্তর্নিহিত অন্তপুরে যারা করতে পেরেছেন বিচরন কেবল তাঁরাই কিঞ্চিত পেয়েছেন সে অমূল্য ধনের সন্ধান। তাঁর চেতনা অহর্নিশি জাগ্রত ঘন্টা ধ্বনিতে অনুরোনিত করে চলেছে মন।
আমার মত ক্ষুদ্র লেখকের পক্ষে তার তল খুঁজে পাওয়া দু:স্কর। না বুঝে ভুলের বেড়াজালে জড়ানোর শংকায় তাই ইতোস্তত আমি। রবীন্দ্রনাথ যে ধরা ছোঁয়ায় সাধারণের দুরদৃষ্টির অনেক বাইরে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তার পরিচয় মেলে তাঁর লেখনির বহুমুখি প্রতিভায়। সাহিত্য-সঙ্গীত-নাটক ও অন্যান্য সৃজন কর্মে তাঁর মহিমা যে সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় স্বীকৃত তা ব্যাক্তের অপেক্ষা রাখেনা। তাঁর কাব্য সৃষ্টির সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ১৯১৩ সালে বিশ্ব প্রতিভার মানদন্ডের শ্রেষ্ঠত্বে নোবেল জয়। মোহাম্মদ আজম তাঁর বাংলা গদ্যের চারুধর্ম ও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা নিবন্ধে লিখেছেন ‘বাংলা গদ্যের শ্রেষ্ঠ চারু শিল্পী যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।’ এ উপমহাদেশের-এমনকি বহির্বিশ্বের শিল্পী-বোদ্ধারাও এখন রবীন্দ্রনাথকে ভারত শিল্পের পথিকৃৎ হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। এমন বিরল প্রতিভাবান সাহিত্য সাধকের রচনাবলীরভাবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তাই আমরা ‘ক’ জনেইবা বুঝি। কতটুকুইবা আমাদের বোঝার কথা। তবু প্রতিবছর ২২ শ্রাবণ এলে মনে বেজে ওঠে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কথা, শিলাইদহের কুটি বাড়ির চিত্র, আর পরম শ্রদ্ধেয় সেই বিশ্বজয়ী, কালজয়ী, অজেয় মানুষটির কথা। জমিদার তনয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লিখতে ইস্পিস্ করে মন। তবে যখনই কলম ধরি, যেন অসীম সীমাবদ্ধতায় এই হিমালয় সম সুউচচু প্রতিভা গিরিতলে দাঁড়িয়ে অজ্ঞানতায় খেই হারিয়ে ফেলি, গুলিয়ে ফেলি সব। লেখক: কবি ও কলামিস্ট