পশুবর্জ্য নিষ্কাশন বনাম পশুস্বার্থ সংরক্ষণ পশুর সামনে পশু জবাই অমানবীয়


প্রকাশিত : আগস্ট ৭, ২০১৯ ||

কামারুজ্জামান
ইসলাম আমাদেরকে পশু-কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু জবেহর আগে অবলা প্রাণীটিকে ‘ছুরি-রক্ত-জবাই’ আতঙ্কে যার-পর-নাই আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে প্রাকশাস্তি দেওয়ার অধিকার দেয়নি। উচিত, পশুটি কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অত্যল্প সময়ে যথাসম্ভব কম কষ্ট দিয়ে আসানীর সাথে জবেহ করে ফেলা। যখন এক ময়দানে সব পশুকে হাজির করে একের পর এক জবাই করা হয়, একটু পরেই অন্যটির পালা, যেন পালে বাঘ পড়েছে, এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক পশুগুলো যে কতটা ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তা চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই অনুধাবন করতে পারে। কোন কোন পশু এতটাই প্রতিক্রিয়া দেখায় যে, হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কেঁদে যায়; পাষাণ-হৃদয়ও বিগলিত, বিচলিত, ভারাক্রান্ত ও বেদনাহত না হয়ে পারে না। এটা অমানবীয় এবং পশুর প্রতি চরম অবিচার ছাড়া কিছুই নয়। অথচ রসূলে কারীম (স.) কুরবানী বা জবেহর জন্য নির্ধারিত পশুকে ছুরি দেখাতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। তার সামনে ছুরি ধার দেওয়া বা জবেহ সংক্রান্ত কোনরূপ আলোচনা করাও নিষেধ। কারণ নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম সকল সৃষ্টি ও সৃষ্টজীবের মধ্যে কমবেশি বোধশক্তি আছে। তারাও কিছু না কিছু বোঝে এবং কখনো কখনো কাঁদে। এ বিষয়ে হাদীস শরীফে পশুর সামনে পশু জবেহ না করার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। প্রমাণÑমুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, খ- নংÑ৪, পৃষ্ঠা নংÑ৪৯৪, হাদীস নংÑ৮৬১। ইলাউস সুনান, খ- নংÑ১৭, পৃষ্ঠা নংÑ১৩৮। মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল মুলহিম, খ- নংÑ৩, পৃষ্ঠা নংÑ৫৪০।
প্রসঙ্গত (১) কোন হত্যাই আনন্দদায়ক হতে পারে না। অতএব জবেহর ভিডিও-দৃশ্য সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা বন্ধ হওয়া উচিত। কারো পৈশাচিক উপভোগ অন্যের জন্য মানসিকভাবে আহত হওয়ার কারণ হতে পারে। অনুরূপভাবে ‘আনন্দ-সংবাদ, মজাদার সংবাদ! আগামী কাল অমুক বাজারে বিশাÑল একটি গোঁড়া মহিষ জবাই করা হবে’Ñএমন ব্যবসায়িক মাইকিংও বন্ধ হওয়া উচিত। কোন জীবহত্যাই কখনো মজাদার হতে পারে না।
(২) পরিচ্ছন্ন নগরায়ণের ফলে পরিবেশ থেকে কুকুর-বিড়াল-শিয়ালদের খাদ্য সংগ্রহ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে কুকুর-বিড়ালকে খেতে দেয়Ñএমন লোকের সংখ্যা আমাদের সমাজে অতিনগণ্য, নেই বললেই চলে। ফলে ক্ষুধার তাড়নায় দেশে এখন আর শিয়াল নয়, বরং কুকুরই ছাগল ও হাঁস-মুরগী ধরে খাচ্ছে। অত:পর মানুষ তাদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। এ অবস্থায় কুরবানীর সম্পূর্ণ পশুবর্জ্য দ্রুত অপসরণ কাম্য বটে, তবে এর মধ্যে যে সামান্য কিছু ওদের খাদ্যোপযোগী অংশ থাকে, শুধুমাত্র সেটুকুই পরিবেশ রক্ষার নামে মাটিতে পুঁতে বা অন্য কোনভাবে ধ্বংস করে না ফেলে, ওদের জন্য যথাস্থানে রেখে দেওয়া কর্তব্য জ্ঞান করি, যা মানবীয় দায়িত্বরূপে বিবেচিত হতে পারে। এতে পরিবেশ রক্ষার কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। কারণ এগুলো ওরা ভক্ষণ করে ফেলবে। অন্যদিকে দেশের ছাগল ও হাঁস-মুরগীগুলোও রক্ষা পাবে। উল্লেখ্য, জবেহকৃত প্রাণিদেহের মধ্যে কুকুর-বিড়ালেরও হক রয়েছে। গোশ্ত বা পশুসার আমাদের আর হাড়গোড়, উচ্ছিষ্টাংশ ও বিশেষ কিছু পশুবর্জ্য ওদের।
(৩) কুরবানীর পশুর সংখ্যা বেশি, কিন্তু জবেহকারীর সংখ্যা কম হলে, সময়-স্বল্পতায় তাড়াহুড়ার মধ্যে পশুর প্রতি যথেষ্ট যতœবান হওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আঠার বছরের কম বয়সী, অথচ জবেহকার্যে পারঙ্গমÑএমন কিশোর-যুবকদেরকে পশুদের স্বার্থেই জবেহর অনুমতি দেওয়া উচিত। পশু জবেহ করলে পরে জঙ্গী হয়ে যাওয়ার ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক ও কল্পনিক। এমনটি হলে বিশ্বের পেশাদার কশাইরা বড় বড় জঙ্গীরূপে আত্মপ্রকাশ করত। স্মর্তব্য, টিন-এজার, তবে বালেগÑএমন কিশোরও কখনো কুরবানী-দাতা হলে, নিজের পশু নিজে কুরবানী করা, অন্যথায় অন্তত সামনে উপস্থিত থাকার শরয়ী বিধান তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যদিও তা জরুরী নয়। তাছাড়া পশুর স্বার্থে কিশোর-যুবক বলে কথা নয়, প্রয়োজন দক্ষ হাত। অদক্ষ হাতে পশুর কষ্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।
এ অবস্থায় এক ময়দানে অনেক পশু জবেহ করার মত উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারা পর্যন্ত শুধুমাত্র নিজেদের ‘স্বার্থে’ পশুবর্জ্য নিষ্কাশনের সুবিধার্থে এক ময়দানে একত্রিত করে পশুর সামনে পশু জবাই করা, পশুদের প্রতি এত বড় অবিচার ও জুলুম না করাই কি কুরবানীর শিক্ষা নয়, যখন কুরবানী মানে উৎসর্গ তথা আত্মোৎসর্গ বা স্বার্থত্যাগ?
পশুর সামনে পশু
কেবা করে হত!
সে আরেক নরপশু,
ধিক তারে শত!
লেখক: কামারুজ্জামান, দেবহাটা, সাতক্ষীরা