বিদ্রোহ ও প্রেরণার প্রতীক ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি


প্রকাশিত : আগস্ট ৭, ২০১৯ ||

আরিফুল ইসলাম রোহিত:
‘বিশ^বাসীর কাছে আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বাংলার শাসন ক্ষমতা এখন আর সামরিক কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে নাই। বরং সাত কোটি মানুষের ভালোবাসার শক্তিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এখন বাংলার শাসন ক্ষমতার একমাত্র উৎস হইয়া পড়িয়াছে।’ ১৯৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় এমন লেখনীর মাধ্যমে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি মানুষের নিরপাদ আশ্রয়স্থল আর আশা-আকাঙ্খার বাড়িতে পরিণত হয়েছিল বলেই প্রতীয়মান হয়।
আনমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি। হোয়াইট হাউজ, বাকিংহাম প্যালেস বা ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের মতো সরকারি মর্যাদা সম্পন্ন বাড়ির মতো এটি নয়। তবে বাড়িটির ইতিহাস আছে। বলা যায় ইতিহাসের সমুদ্র। সেই ইতিহাস বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস। ভালোবাসার ইতিহাস। বলতে গেলে অন্যরকম এক ইতিহাস। যা পৃথিবীর অন্য কোন বাড়ির ক্ষেত্রে নেই। বাড়িটির ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে আমরা অনেক প্রেরণার কথা জানতে পারি। জানা যায় বিদ্রোহ আর সাহসের কথা।
১৯৬১ সালের অক্টোবরে বাড়িটি তৈরী করা হয়। এরপর থেকে ৬২’র আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফার আন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র শুরুতে অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব দিকনির্দেশনা এই বাড়ি থেকেই ঘোষণা করা হত। এছাড়া যুদ্ধপরবর্তী ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনার সকল পরিকল্পনা ও নির্দেশনা এখান থেকেই ঠিক করা হতো। দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরাও এখানেই ভীড় করতেন। আদতে এই বাড়ি থেকেই দেশের মানুষের যে নির্দেশনা দেওয়া হতো সে অনুসারেই চলতো সবকিছু।
হয়তো এতক্ষণে অনুমিত হয়েছে কে ছিলেন এই বাড়িতে। কেউ কেউ হয়তো ধরেই ফেলেছেন। হ্যাঁ, ঠিক তাই। এতসময় ধরে যেই বাড়িটির কথা তুলে ধরা হয়েছে সেই বাড়িটি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ১৯৬২ সালে আইয়ুর খানের সামরিক শাসন শুরু হলে বাঙালির মনে অসন্তোষের দানা বাঁধতে শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমান আরও বেশি গণমানুষের নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আর তারই বাসভবন হিসেবে ৬৭৭ নং এই বাড়িটি আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর বাসভবন দিনের পর দিন অঘোষিত সরকারি দপ্তরে পরিণত হয়েছিল। যে কারণে সর্বদাই পাকিস্তানিদের চোখের শূল ছিল বাড়িটি। যে কোন সংবাদ প্রাপ্তি বা বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাত লাভের জন্য মানুষ এখানেই ছুটে আসতো। বাড়িটিকে বর্তমানে স্মৃতিময় জাদুঘরে রুপান্তরিত করা হয়েছে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের স্বাক্ষী এই বাড়িটিকেই বাংলাদেশ জন্মের সূতিকাগারও বলা চলে। যে কেউ একবার বাড়িটি দেখলে ‘এক খন্ড বাংলাদেশ’ না বললে বোধ হয় ভুল বলা হবে। অনেকেই তাই বলে থাকেন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যাচ্ছেন তার মানে আপনি বঙ্গবন্ধুর কাছে যাচ্ছেন। আর বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। সেই ৬০’র দশক থেকে আজ অবধি বাড়িটি যেন সাহস, বিদ্রোহ, দৃঢ়তা ও প্রেরণার তীর্থস্থান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বিদ্রোহ আর প্রেরণার বাতিঘর শেখ মুজিবের বাড়িতে ৭০’র নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ দলীয় সভা অনুষ্ঠিত হতো। ৭১ সালের ২৩ মার্চ এই বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকাও উত্তোলন করা হয়। ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রস্তুতিও বঙ্গবন্ধু এখান থেকেই নিয়েছিলেন। ভারতের কংগ্রেসের রাজনৈতিক সভাও নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু এরকম ইতিহাস সম্মৃদ্ধ বাড়ি হতে পারেনি। কারণ এই বাড়ির সাথেই যে বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস মিশে আছে।
বাড়িটির ইতিহাস থেকে জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল খোকা। মধুমতি নদের তীরে বেড়ে ওঠা এই খোকা ছিলেন একটু লম্বা প্রকৃতির। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি মাপের মানুষটির জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে স্বপরিবারে সেগুনবাগিচার ১১৫ নং বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর ওই বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক কর্তৃপক্ষ তিনদিনের মধ্যে বাড়িটি ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব উপায়ান্তর না দেখে সিদ্ধেশ^রী এলাকায় ২০০ টাকায় মাসিক ভাড়ায় বয়েজ স্কুলের মাঠের পাশে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি ভাড়া নেন। সরকারি এজেন্সির হুমকিতে সেই বাড়িটিও ছেড়ে দিতে হয়। পরে বেগম সুফিয়া কামালের প্রচেষ্টায় সেগুনবাগিচার ৭৬ নম্বর বাড়িটি মাসিক ৩০০ টাকায় ভাড়া নেন তিনি। এর আগে ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালীন একান্ত সচিব নুরুজ্জামান বেগম মুজিবের অনুরোধে ধানমন্ডি এলাকায় জমির জন্য গণপূর্ত বিভাগে আবেদন জমা দেন। ১৯৫৭ সালে ধানমন্ডিতে ছয় হাজার টাকায় একবিঘা জমি বরাদ্দ পান বঙ্গবন্ধু। ১৯৬০ সালে শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে ছাড়া পেলে বেগম মুজিবের সাথে পরামর্শ করে ওই জায়গায় বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু পরিবার পরিজন নিয়ে নির্মাণাধীন ওই বাড়িতে ওঠেন। তখন একতলা বাড়িটিতে মাত্র দুটি শোবার ঘর ছিল। যার একটিতে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব থাকতেন। ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিচ তলার এই কক্ষেই বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন। দ্বিতীয় তলায় বসবাস শুরু হলে এই কক্ষটি তিনি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। উত্তর পাশের লাগোয়া কক্ষে থাকতেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এই কক্ষেরই একপাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। বাড়িতে ঢুকতেই ছিল ছোট একটি কক্ষ। যা ড্রয়িংরুম হিসেবে ব্যবহার হতো। কবুতর পোষার শখ ছিল বঙ্গবন্ধুর। বাড়ির উত্তর কোণের কবুতরের বাসাটি আজও বিদ্যমান। আছে শ’খানেক কবুতর। বর্তমানে বাড়িটিকে আরও অনেক বেশি সুসজ্জিত করা হয়েছে। কিন্তু তবুও এটাই সত্যি যে বেগম মুজিবের হাতের আলতো ছোয়ায় যে সজ্জা ছিল এই বাড়ির তা আর নেই।
এছাড়া ঐতিহাসিক এ ভবনের সবচেয়ে গুরুত্বের সময় ১৯৭১ সাল। সেই সময়ের অসহযোগ আন্দোলন এই বাড়ি থেকেই পরিচালিত করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে সব সময় এ বাড়ির সামনে নেতা-কর্মীরা উপস্থিত থাকতেন। কখন দোতলার বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন সেই প্রতীক্ষা। ২৩ মার্চ এই বাড়িতে পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫ মার্চ এখান থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। তার পরপরই তাকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেপ্তার করে এই বাড়ি থেকেই। বেগম মুজিব অন্যত্র চলে যান। কিন্তু পাকিস্তানী বাহিনী তাকেও ধরে নিয়ে ধানম-ির ১৮ নম্বর বাসায় বন্দী করে রাখেন। ১৭ ডিসেম্বর তাকে ওই বাসা থেকে মুক্ত করা হয়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। এর পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। ধানমন্ডির এই বাসাতেই আবার বসবাস শুরু করেন তিনি। দেশ গঠন ও পরিচালনার সকল সভা এই ভবনেই বেশিরভাগ সময় অনুষ্ঠিত হতো। দোতলার বারান্দা থেকে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। শ্রাবণ মাসের ২৯ তারিখ। ফজরের আজান শুরু হয়েছে মাত্র। এমন সময় বাড়ির সামনে সামরিক জীপ ও ভারী ট্যাংক এসে উপস্থিত হলো। দুমদাম শব্দে শুরু হলো গুলি। বাড়ির সদস্যরা হতবাক হয়ে গেল। শুরু হলো ইতিহাসের স্মরণীয় ওই বাড়িতে নির্মম হত্যাকান্ড। একে একে গুলি করে হত্যা করা হলো বাড়ির নয়জন সদস্যকে। তারা হলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও সহকারী সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান। এছাড়া ওই দিন সর্বমোট ৩৩ জনকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তী ১৯৮১ সালের ১০ জুন পর্যন্ত সামরিক কর্তৃপক্ষ এই বাড়ি দখল করে রাখেন। পরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বাড়িটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালের ১১ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠনের পর বাড়িটিকে ট্রাস্টের অধীনে দেওয়া হয়। পরে ট্রোস্ট এই বাড়িটিকে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে রুপান্তরিত করেন।
যখন থেকেই বাড়িটি সম্পর্কে জেনেছি তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল একটা বারের জন্যে হলেও বাড়িতে একটু পা ফেলবো। যেখানে দিন রাত কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কখনো বাড়ি থেকে পালিয়ে যাননি। কখনো তার ওই বাড়ি থেকে নিরাপত্তাহীনতার কথা মনে হয়নি। কতটা ভালোবাসা আর ত্যাগের মূর্তপ্রতীক হলে এমনটা হয় তা সত্যিই অনুভবের বিষয়।
কিছুদিন আগে যখন বাড়িটিতে গিয়েছিলাম দেখলাম বাড়িটির মূল কাঠামোর পরিবর্তন না করেই গড়ে তোলা হয়েছে এই স্মৃতি জাদুঘর। প্রতিটি ঘরে প্রত্যেক সদস্যের ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন সময়ের পারিবারিক ছবি। ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে সবই ঠিক আছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু নেই। ছায়া সুনিবিড় গাছ-গাছালিতে ঘেরা তিনতলা ভবনের এই বাড়িতে ঢুকতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর বিশাল প্রতিকৃতি। নিচতলার কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সাথে বিশ^নেতাদের তোলা বিভিন্ন ছবি রাখা হয়েছে। রয়েছে অন্যান্য সদস্যদের ছবিও। দোতলায় শেখ হাসিনার শোবার ঘরটি তালাবদ্ধ করা আছে। তার পাশেই রয়েছে বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘর। সেই রাতে গুলির শব্দ শুনে এই ঘরের সামনের সিঁড়ি দিয়েই নামতে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। সিঁড়িতে আজও রক্তের সেই ছোপ ছোপ দাগ লেগে রয়েছে। কাঁচ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে সেসব। সিঁড়িটিতে চলাচল বন্ধ। সিঁড়ির পাশে ও দেয়ালে মোট নয়টি গুলির চিহ্ন দেখা মিললো। বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে বিছানার পাশে ছোট একটা টেবিলে পাইপ, তামাকের কৌটা, টেলিফোন সেট, রেডিও রাখা আছে। বঙ্গবন্ধুর ঘরের একেবারে সামনেই খাবার খাওয়ার জায়গা। সেখানে একপাশে রাখা আছে শেখ রাসেলের ব্যবহৃত সাইকেল। বেগম মুজিবের হাতে তৈরী আচারও এখানে দেখতে পাওয়া যাবে। পাশের একটি কক্ষে সুলতানা কামালের বেনারসি শাড়ি, শেখ জামালের সামরিক পোশাক, বিয়ের জুতা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া শেখ রেহানার ঘরে বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, ডায়েরী, চশমা রাখা আছে। পুরো বাড়িতে যেসব স্থানে গুলি লাগার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে সেগুলো কাচের প্লেট দিয়ে চিহ্নিত করা আছে। বঙ্গবন্ধুর ঘরের মেঝেতে চাপ চাপ রক্তের দাগ লেগে আছে। সেগুলো দেখে চোখের পানি ধরে রাখা অসম্ভব যে কোন দর্শণার্থীর জন্যে। ছাদের দিকে তাকাতেই দেখা মিলবে আরও নির্মমতার চিহ্ন। কারও মাথার খুলির কিছু অংশ আর কিছু চুল সেখানে বিঁধে আছে। কি বিভৎস সেসব দৃশ্য। কতটা অমানবিকতার পরিচয় সেখানে পাওয়া যায়। বার বার শরীরের লোমগুলো শিউরে উঠবে। তিনতলায় রয়েছে শেখ কামালের ঘর ও বঙ্গবন্ধুর সভা কক্ষ। শেখ কামালের ঘরে রাখা আছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, সোফা ও পরিপাটি বিছানা। উল্টোদিকের সিঁড়ির পাশেই রয়েছে রান্নাঘর। রান্নাঘরে পরিচ্ছন্ন করে সাঁজিয়ে রাখা আছে হাড়ি-পাতিল আর বাসন-কোসন। বেগম মুজিবের হাতের ছোঁয়া সেগুলো যেন তারই অস্তিত্ব বহন করছে।
তিনতলা বাড়ির পেছনের অংশে নতুনভাবে তৈরী করা হয়েছে ছয়তলা সম্প্রসারিত ভবন। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট এই অংশটি সবার জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। ছয়তলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে সেমনিার হলরুম। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় ২৬টি পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীর সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে ১৯৭০ এর নির্বাচন পর্যন্ত ঘটনাবলি চতুর্থ তলায় তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় তলায় ১৯৭১ এর যুদ্ধ থেকে ১৯৭৩ এর দেশ পুনর্গঠন পর্যন্ত তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় পারিবারিক জীবন থেকে জীবনাবসান পর্যন্ত ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে। দর্শণার্থীরা প্রথমে চতুর্থ তলা থেকে ধাপে ধাপে দ্বিতীয় তলায় নামতে পারবেন। তার জন্য ভেতর পথে সিড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পঞ্চম তলায় রয়েছে পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র। সবমিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে জানতে হলে একবারের জন্যে হলেও ৬৭৭ নং বাড়িতে আসতেই হবে। শেখ হাসিনা বা শেখ রেহানা পৈতৃক এ বাড়িটিকে নিজে বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাউকে ভেঅগদখল করতে দেননি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িকে আরও বেশি সম্প্রসারিণ করে মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই বাড়িটি এখন আর সাধারণ কোন বাড়ি নয়। এটি এখন ইতিহাসের বাড়ি। বাঙালির ইতিহাস এখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে। দিনে দিনে সেই বাড়িটি হয়ে উঠছে বিদ্রোহ, সাহস আর প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন শতশত দর্শণার্থীর আগমণ ঘটে এখানে।
দর্শনের সময়কাল ও নিয়ম:
প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই স্মৃতি জাদুঘরটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। পাঁচ টাকার নামমাত্র প্রবেশমূল্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বুধবার সরকারি ছুটির দিন। এছাড়া বিজয়া দশমী, শবে বরাত, শবে কদর, ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন এই জাদুঘর বন্ধ থাকে।
লেখক: আরিফুল ইসলাম রোহিত, বিতার্কিক, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ ও ফিচার প্রতিবেদক, দৈনিক যুগান্তর