খবরদারি


প্রকাশিত : আগস্ট ১১, ২০১৯ ||

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী:
সৎ বলতে লোকে যা বোঝে, লোটারাম তেমনই সৎ।
ইদানিং চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় করিম সাহেব লোটারামকে নিরাপত্তার দায়িত্বে চাকরি দিলেন। সাথে দুজন অধস্তন; নসিব আর রকিব।
চৌকি-পাহারার কাজে লোটারামের অভিজ্ঞতা ত্রিশ বছরেরও বেশি।
বড় পদ। লোটারাম গম্ভীর। কথাবার্তা কম বলে।
লোটারামের শোবার জন্য একটি ঘর। ঘরে ছোট একটা জানলা। নিশুতি রাতে জানলা দিয়ে বারে বারে আওয়াজ আসে-‘ঠিক আছে তো? আমি কিন্তু ঘুমাইনি।’
নসিব আর রকিব বাইরের মেঝেতে শুয়ে উত্তর দেয়, ‘ঠিক আছে স্যার!’
জানলা দিয়ে আওয়াজ আসে, ‘আমি কিন্তু জেগে আছি।’
উত্তর যায়, ‘সব ঠিক আছে স্যার।’
সারারাত এভাবে ঘন ঘন আওয়াজ আসে। উত্তর যায়। প্রতিরাতে।
সকালে উঠে মাঝে-মধ্যে লোটারাম শুধু বলে,‘দায়িত্বপালন কাকে বলে শেখো, অভিজ্ঞতা তো কম না, সাধে কী আর এতবড় চাকরি দিয়েছে! সারারাত জাগি-তবু শরীরটা কেমন তাগড়া দেখেছো! একেবারে কাঁচা ঢ্যাড়স!’
নসিব আর রকিব ঢুলুঢুলু চোখে হাঁ-হয়ে লোটারামের কথা গেলে। ঘুম এসেও আসতে পারেনা। ভয়ে শ্রদ্ধায় লোটারামের পায়ে লুটোতে ইচ্ছা করে। তবে আয়নায় নিজের রাতজাগা চেহারা দেখে নসিব বলে, ‘ইস! একেবারে শুকনো নাকেস্টিম হয়ে গেছি রে! অথচ স্যার কেমন! আসলে ওসব এক জাত!’
এক রাতে নসিব রকিব দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। একেতো মাস তিনেক ধরে রাত জাগা, তার ওপরে জৈষ্ঠের গরম সরিয়ে কালবৈশাখির ঠান্ডা। ঘুম ভেঙে দেখল আলো ফুটেছে, পাখি ডাকছে। লোটারাম কট করে দরজা খুলে বাইরে এল। নকিব ও রকিব চাকরি হারানোর ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু লোটারামের মুখে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। লোটারাম দাঁতে ব্রাশ ঘষা বন্ধ করে মোটা মোটা চোখে বলল, ‘অ্যাই ! কাল রাতে যেমন জোরে জোরে সাড়া দিয়েছিলি, এবার থেকে ওরকম জোরে জোরে সাড়া দিবি!’ তারপর চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ নইলে কিন্তু চাকরি খাব!’
সেদিন নসিব ও রকিব শুধু এর-ওর দিকে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করেই দিন কাটালো। রাত ঠিক একটায় টুল নিয়ে লোটারামের জানালায় দাঁড়াল রকিব। আওয়াজ বের হচ্ছে, ‘ঠিক আছে তো? আমি কিন্তু ঘুমাইনি।’ লোটারাম হাঁ-হয়ে ঘুমুচ্ছে। প্রগাঢ় ছন্দে ঘরঘর করে নাক ডাকছে তার।
রকিব টুল থেকে নামল। অন্ধকারে সরে গিয়ে বলল, ‘লোকটা গুলবাজ, শালা বেঘোরে ঘুমুচ্ছে! ত্রিশ বছরধরে ঘুমের মধ্যে শুধু দুটো কথা বলা রপ্ত করেছেÑ এক-‘ঠিক আছে তো,’ দুই-‘আমি কিন্তু ঘুমাইনি,’ শালা ঘুমের মধ্যেও খবরদারি করে, চল! আজ আমরা ঘুমাই গে!’
তিন মাস ধরে ওৎ পেতে থাকা চোরটা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। হাঁড়ির খবর তারও জানা। তাই প্রথমে আটচল্লিশ ইঞ্চি টেলিভিশনটায় হাত দিলে যখন জানলা দিয়ে ভেসে এল-‘ঠিক আছে তো?’ তখন চোর উত্তর দিল, ‘সব ঠিক আছে স্যার।’
চোর একটা করে জিনিস সরায় আর উত্তর দেয়, ‘সব ঠিক আছে স্যার।’ এভাবে ঘর খালি হয়ে গেল।
সকালে হুলস্থুল কান্ড। এত লোক রেখেও চুরি! করিম সাহেব কাঠগড়ায় তুললেন লোটারামকে। লোটারামের কপাল কুঁচকে আছে। মিনমিন করে বলল,‘ রক্ষী যদি চুরি করে তাহলে তো কিছু বলার নাই, আমি সারারাত জেগে থাকি, ওরাছাড়া কেউ ঘরে ঢোকেনি, আপনি ওদের চার্জ করুন।’
কথা ঠিক। রাত দুটো-তিনটে-চারটে, দৈবক্রমে করিম সাহেব যখনই এদিকটায় আসেন, লোটারামের গলার আওয়াজ পান। এমন দয়িত্ববান ও বিশ্বস্ত চাকুরের কথা তো আর প্রথমেই ফেলে দেয়া যায় না! করিম সাহেব হুঙ্কার দিয়ে নসিব আর রকিবকে বললেন, ‘চুরি করেছিস? চুরি করেছিস?’
রকিবের মুখে অতোটা হুঙ্কার ছিল না। কিন্তু বুকে তার চেয়েও বেশি হুঙ্কার ছিল লোটারামের উপর। রকিব হঠাৎ বাতাসে ফরফর করে ওঠা আলোক শিখার মতো মরিয়া হয়ে বলল, ‘না স্যার! ওই লোকটা মিথ্যে বলছে, সে দায়িত্ব বোঝে না, শুধু ঘুমের মধ্যে খবরদারি করে, একবারও বাইরে আসে না, সে যদি প্রতিরাতে ঘুমিয়ে বলে জেগে আছি, তবে একটি রাতের জন্য আমরা কেন ঘুমাব না?’
অধস্তনের মুখে এমন কথা লোটারাম কখনোও শোনেনি। মানা তো দূরের কথা। তাই ক্ষেপে গিয়ে মালিকের উপস্থিতিও ভুলে গেল। লোটারাম স্বভাববশত গলা ফাটিয়ে ‘চুপ শালা’ বলে তেড়ে মারতে এল। তখনই আরো বেশি বেগে করিম সাহেব লোটারামের জামার কলার টেনে ধরলেন। আর ফড়ফড় করে জামা ছিঁড়ে টঙ করে একটা যন্ত্র পাকা মেঝেতে পড়ল। এবং সুইচ অন হয়ে গিয়ে সেই যন্ত্রে লোটারামের রেকর্ড করা কন্ঠ বেজে উঠল-‘ঠিক আছে তো, আমি কিন্তু ঘুমাইনি।’