কবি মোহন রায়হান: কিংবদন্তি সাহসের লাল মস্তক


প্রকাশিত : আগস্ট ১১, ২০১৯ ||

সজিব মজিদ
যাঁকে বলা হয় সাহসী মানুষের কবি, তিনি আশির দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ছিলেন, সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করতেন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনটাই সবচেয়ে বড় এবং সার্থক আন্দোলন, সে রক্তাক্ত সংগ্রামে বহু তরুণ, ছাত্রনেতা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।
সামরিক বাহিনীর ট্রাক মিছিলের উপরে উঠিয়ে দিয়ে সেদিন তাজুলসহ বেশ কয়জন ছাত্রদের ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যা করা হয়। সেই মিছিলে সৌভাগ্যক্রমে তিনি মোহন রায়হান বেঁচে যান। উল্লেখ্য মোহন রায়হান ১৯৮৩ সালে সম্ভবত এগারই জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে শিক্ষা অফিস ঘেরাওয়ের মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। উত্তাল সেই ছাত্র আন্দোলনে স্বৈরাচার শাসক এরশাদের জলপাই মসনদ কেঁপে ওঠে। সেই বদৌলতে সামরিক আইন ভঙ্গের অপরাধ দেখিয়ে মোহন রায়হানকে সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। একুশ দিন তাঁকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। ইলেকট্রিক শক, পা উপরে ঝুলিয়ে নির্দয় পীড়ন করা হয়, বুট দিয়ে হাত থেতলে দেয়া হয়, নখ উঠিয়ে নেয়া হয়। যতক্ষণ জ্ঞান ততক্ষণ নির্যাতন, এভাবে চব্বিশঘণ্টা অকথ্য নিষ্ঠুরতায় লাগাতার একুশ দিন অত্যাচার শেষে সংজ্ঞাহীন মুমূর্ষু অবস্থায় মেরুদ- ভেঙে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে যায়।
কবি মোহন রায়হান সরাসরি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মুক্তির লড়াইয়ে রাজপথে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন। গণতান্ত্রিক সংগ্রামে জীবন বাজি রাখার দু:সাহস এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে গেলে যে কয়জন কবি কবিতায় জ্বালাময়ী প্রতিবাদ করেছেন নজরুল-সুকান্ত ধারায় মোহন রায়হান সে দু:সময়ের একমাত্র কবি। তিনি নি:সন্দেহে সাহসী জাতিস্বর। তার জন্মের পঞ্চাশতম বছর পূর্তিতে স্মরক গ্রন্থে দেশের বেশিরভাগ বিশিষ্ট কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা এই স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছেন।
একজন মোহন রায়হান যে কোনো জনরাষ্ট্রে শতাব্দীতে একবার জন্মায়। আমি সৌভাগ্যবান যে তাঁর মতো সাহসের কিংবদন্তির করতলে নিজেকে ভেঙে নির্মাণের সুমহান সুযোগ কুড়িয়েছি। আমি খুব কাছ থেকে তাকে উপলব্ধি করার পেয়েছি বিরল সুযোগ। তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন আপোষহীন সুদৃঢ় সাহসী।
গত শতাব্দীর অন্তিম দশক আমার সাহিত্য চর্চার বয়োসন্ধিকাল। জীবনের বাঁকের কোনো এক অজানা মোড়ে এসে ঢাকায় আমি মোহন রায়হানের সান্নিধ্য পাই। এটি আমার জীবনের এক মাইল ফলক ঘটনা, মূলধারার সাহিত্যের সূত্রপাত বললে মোহন রায়হানের প্রতিষ্ঠান বিকল্প প্রেস আমার আতুরঘর। আলো ঋণ করে নিজের নিভে যাওয়া প্রদীপ জ্বালাবার চেষ্টা করেছি। হয়তো নিজের ভেতরে জ্বালানি কী আছে তার সাক্ষাৎ নিয়েই তিনি আলো দান করেছিলেন। উনার হাত ধরেই শূন্য দশক আমার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অভিষেক। স্বদেশের প্রতি অঙ্গিকার, সত্য বলবার স্পর্ধা, মেরুদ- সোজা করে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের সাহস প্রদর্শনে মোহন রায়হানই আমার প্রথম প্রেরণা।
একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা, প্রেক্ষাপট, সেই মহান সংগ্রামের ইতিহাস, ইত্যাদি বিষয় পাঠ্য জরুরি। তবে তা মোহন রায়হান পাঠ করলেই জানা যায়। ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক মুক্তির যুগপৎ আন্দোলন আলোড়িত করবার যোগ্যতম ইতিহাস পরিকল্পিতভাবে ঢেকে দেয় পরবর্তী সরকারগুলো। ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করে রাখা পরবর্তী সরকারগুলো ভোটের রাজনীতি করে ক্ষমতার নোংরা লোভে যেমন রাজাকার পুনর্বাসন করেছিল তেমনি খুনি স্বৈরাচারকেও শাস্তি না দিয়ে পূর্ণবাসন করেছিল, হয়তো একদিন এরশাদের মরণোত্তর বিচার হবে, তার কুশপুত্তলিকায় প্রতীকি ফাঁসি হবে, স্বৈরাচারী শাসনকালও অবৈধ ঘোষিত হবে, সত্য মিথ্যার ব্যবধান মুছে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস সমুজ্জ্বল হবে।
দেশে রাজনৈতিক সচেতন কবিতার সংকট চলছে। এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে দেশ। স্বৈরাচারের হাত বদল হয়ে বারবার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ভয়াল এই অগণতান্ত্রিক বাস্তবতায় কোনো কবি-সাহিত্যিক মস্তক-মেরুদ- সোজা করে প্রতিবাদী লেখায় আসতে না পারার কারণ তাদের সাহসের পাঠ নেই।
বাস্তবতা হলো ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট সত্যের চোখে কালো কাপড় বেঁধে রেখেছে শাসক শ্রেণি। রাজাকারের পূর্ণবাসনের মতো আমরা দেখেছি স্বৈরাচারও পূর্ণবাসিত হলো, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস উল্টে চৌদ্দ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উদযাপন করে!
সেদিন একজন বলছিলেন আমাদের এখনকার কবিরা প্রায় নব্বই ভাগ কবিতাই প্রেম নির্ভর লিখে থাকেন। অথচ রাষ্ট্রের কী রকম করুণ সমস্যা! এটা ভয়াবহ সত্য যে দেশের বেশিরভাগ কবি-লেখকদের রাষ্ট্রমুখী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকা, জনতাকে আন্দোলিত করবে কী, নিজের ভেতরে দেশপ্রেম নেই, আরাম আয়েশি জীবনের সুনিপুণ স্বপ্নে বিভোর, জনতার মুক্তির আকাঙ্খা, স্বদেশের ভয়াল বাস্তবতা তাদের আক্রান্ত করে না। জাগরণের স্বপ্ন নেই! অন্যায়ের প্রতিবাদ নেই! মোহন রায়হানের কবিতার ভাষায়-ভীরুটে শিক্ষক-কবি, দালাল বুদ্ধিজীবী তোর মুখে আমি থু থু দেই! থু থু দেই!
‘ফিরিয়ে দাও সেই স্টেনগান’, ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ ‘শকুন সময়’, ‘সামরিক আদালতে অভিভাষণ’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বিশিষ্ট প্রতিবাদ যা কবি মোহন রায়হানকে আলাদা শ্রেষ্ঠত্ব দেয়।
আমার মহান দীক্ষাগুরু কবি মোহন রায়হানের তেষট্টিতম জন্মদিন গেল। সবুজ শুভেচ্ছা এবং লাল সালাম।