জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার


প্রকাশিত : August 14, 2019 ||

মোঃ আবদুর রহমান:
কেঁদেছিল আকাশ, ফুঁপিয়ে ছিল বাতাস। বৃষ্টিতে নয়, ঝড়ে নয় – এ অনুভূতি ছিল পিতা হারানো শোকের। প্রকৃতি কেঁদেছিল; কারণ মানুষ কাঁদতে পারেনি। ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন তাদের কাঁদতে দেয় নি। তবে ভয়ার্ত বাংলার প্রতিটি ঘর থেকে এসেছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস, কি নিষ্ঠুর, কি ভয়াল, কি ভয়ঙ্কর- সেই রাত।
আজ রক্তঝরা অশ্র“ভেজা ১৫ আগষ্ট, জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির শোকের দিন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ। জাতির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন এটি। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল বিপদগামী একদল সেনা সদস্য। বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে জুড়ে দেয় কৃষ্ণ দাগ। মানচিত্রের কাঁধে চাপিয়ে দেয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী লাশের বোঝা। পেছনে ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে ঐতিহাসিক বাড়িটিতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তাঁর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও দশ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। তবে দেশের বাইরে থাকায় সেদিন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই কালরাতে আরো প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনিসহ বেশ কয়েকজন নিটকাত্মীয়। বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে গিয়ে ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন তার সামরিক সচিব জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। জাতীয় শোক দিবসে আমরা মহান আল¬াহতায়ালার দরবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগষ্টের সকল শহিদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া। হত্যাকারীদের প্রতি ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে। ভারতীয় বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্ন দ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে। দ্যা টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উলে¬খ করা হয় ‘সবকিছু সত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই।’ একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিউবার প্রখ্যাত নেতা ফিদেল ক্যাস্টো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ নিউজ উইক বঙ্গবন্ধুকে উলে¬খ করেছিল ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’ নামে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা মন্তব্য করেছিল ‘মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কখনই জন্ম নিত না।’
বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা ও দায়বোধ তাকে মহীরূপে পরিণত করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলের বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, গণতন্ত্রের অতন্দ্র সৈনিক এবং স্বাধীনতার রূপকার। কৈশোর থেকেই তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন সোচ্চার। প্রতিটি আন্দোলনেরই অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে তিনি ছিলেন সর্বদা বজ্রকণ্ঠ।
কিশোর বয়স থেকেই তিনি প্রতিবাদী ছিলেন। সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনও দূরে সরে যান নি। ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। সমগ্র বাঙালি জাতির মুকুটহীন সম্রাট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্যাতিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখান। শুধু স্বপ্ন নয় সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য পথ নির্দেশনাও দেন রাজনীতির এই কবি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সেই রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে শোনান তার বাণী – ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ওই ভাষণ একটি জাতিকে জাগ্রত করেছে, একবিন্দুতে মিলিত করেছে। এমন ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ওই জ্বালাময়ী ভাষণ নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে উজ্জীবিত করে। অস্ত্রহাতে তুলে নেয় বাঙালি এবং তারই নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। বাঙালি জাতি পায় হাজার বছরের কাঙ্খিত প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন মানচিত্র। বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই শব্দগুচ্ছে- ‘যতদিন রবে পদ্মা- যমুনা গৌরী – মেঘনা বহমান / ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
একটি স্বাধীন ভূমির জন্য বঙ্গবন্ধু অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বছরের পর বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি এটা পেরেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, চরম বিপদের মুখে সেখানেও তিনি দেশের মাটির কথা নির্ভীক চিত্তে উচ্চারণ করেন। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। স্বাধীনতার পর বহির্বিশ্বের চাপে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে জাতির জনক ফিরে আসেন তার প্রিয় দেশ বাসীর কাছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করেন।
হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেন। তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি। রাজনীতিকে তিনি সৃষ্টিশীল চেতনা দিয়ে নিজের হাতে আকার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আজীবন স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। যুদ্ধের ধ্বংস্তুপ থেকে দেশকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি তাকে হত্যা করে জাতির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো। ঘাতকচক্র সাময়িকভাবে সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও অগ্রগতির মহাসড়কে ধাবমান। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, পেয়েছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার স্বীকৃতি। আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ‘রোল মডেল’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তার জীবন ও রাজনীতি, বাঙালির ঐতিহাসিক বিবর্তন ধারায়, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সবই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মিশে আছেন আমাদের চিন্তা-চেতনা-আলোচনায়। তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র। রাজনীতি, রাষ্ট্র ও প্রাত্যহিক জীবনে তিনি আছেন পাথেয় হয়ে।
ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করলেও তাঁর নীতি ও আদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। তাই আসুন, আমরা জাতির পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করি। তাঁর ত্যাগ এবং তিতিক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামী জবনাদর্শ ধারণ করে সবাই মিলে একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। প্রতিষ্ঠা করি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। জাতীয় শোক দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। পরিশেষে বলি – ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা