অর্থের লোভে মাদক ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ছে গাড়ি চালক-হেলপাররা


প্রকাশিত : আগস্ট ১৪, ২০১৯ ||

সারাদেশে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরলস চেষ্টার পরও থেমে নেই মাদকের পাচার। এদিকে অর্থের লোভে মাদক ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন পরিবহনের চালক ও হেলপাররা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট কার,যাত্রীবাহী বাস অথবা পণ্যবাহী ট্রাকের একশ্রেণির চালক ও হেলপাররা সীমান্ত এলাকা থেকে রাজধানীতে নিয়ে আসছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এসব চালক ও হেলপার কেউ কেউ ধরা পড়লেও পার পেয়ে যাচ্ছে মূল পাচারকারীরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, মাদক কারবারিরা তাদের চালান সরবরাহের জন্য বাস-ট্রাকের চালক ও হেলপারদের ব্যবহার করে থাকে। মাদক সরবরাহে বিভিন্ন পরিবহনের চালক ও হেলপারদের শতাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা মাদক ব্যবসায়ীদের হয়ে সারাদেশে মাদকের চালান সরবরাহের কাজ করে। র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘পরিবহনের চালক ও হেলপাররা আসলে মূল মাদক কারবারি নয়।টাকার বিনিময়ে তারা মাদকদ্রব্য সরবরাহের কাজ করে। আমরা বিভিন্ন সময় মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত পরিবহন চালক-হেলপারদের গ্রেফতার করেছি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকের মূল চোরাকারবারিদের গ্রেফতারে চেষ্টা করছি।’

র‌্যাবের সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে র‌্যাবের অভিযানে বিভিন্ন পরিবহনের ৬১ জন চালক ও হেলপারকে মাদকদ্রব্যসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ৩৫টি পরিবহন জব্দ করা হয়।

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার ঈশ্বরপুর গ্রামের রাজু আহম্মেদ (৩২) পেশায় একজন ট্রাকচালক। এর আগে দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা-খুলনা রুটে নৈশ কোচ চালাতো। অর্থের লোভে পড়ে জনৈক রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে মাদক কারবারি চক্রের সঙ্গে জড়িত হয় সে। এরপর থেকে নৈশ কোচ চালানো বাদ দিয়ে ট্রাক চালানো শুরু করে রাজু। দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক সংগ্রহ করে মৌসুমি ফসল পরিবহনের আড়ালে তা ঢাকায় সরবরাহ করতো। এই কাজে মুন্না (২০) ও সাগর (১৯) নামে রাজুর দুই সহযোগী রয়েছে। ঢাকায় তার কাছ থেকে উবারচালক ইউসুফ মাদকের চালান সংগ্রহ করে মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে দিতো। প্রতি চালানে রাজু ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং ইউসুফ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা করে পেতো।

এ বছরের ১৭ জুলাই রাত তিনটার দিকে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে র‌্যাব-১ এর একটি দল অভিযান চালায়। এসময় তারা একটি কাঠাঁল বোঝাই ট্রাকের ভেতরে ৭১৮ বোতল ফেনসিডিলসহ ট্রাকচালক রাজু ও উবারচালক ইউসুফসহ মাদক চোরাকারবারি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে। দিনাজপুর জেলার বিরামপুর থেকে কাঁঠাল বোঝাই ট্রাকে করে মাদকের এই চালানটি ঢাকায় আনা হয়। র‌্যাব এ কাজে ব্যবহৃত ওই ট্রাকটিসহ একটি প্রাইভেটকারও জব্দ করে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করে যে,তারা এভাবে মাদকের অনেক চালান ঢাকায় নিয়ে এসেছে।

র‌্যাব-১ এর কর্মকর্তারা জানান, রাজু ও ইউসুফসহ গ্রেফতার ব্যক্তিরা বিরামপুরের মাদক চোরাকারবারি মনসুরের হয়ে কাজ করতো। এই চক্রের অন্যতম তিন সদস্য হলো— নূর ইসলাম, মফিজুল ইসলাম এবং মোস্তাফিজুর। তিন জনই জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানার রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই চক্রের সঙ্গে উবারচালক ইফসুফ জড়িত। সে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় রফিকুলের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী মাদকের চালান পৌঁছে দিতো। এছাড়া, মাদকের কারবারি রফিকুল, নূরু, মফিজুর ও মোস্তাফিজুর এই চার জন বিরামপুর থেকে রাজুর ট্রাকে চালান তুলে দেওয়ার পর আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যেতো এবং সেখানে গিয়ে চালান সংগ্রহ করতো।এরপর ঢাকায় অবস্থানরত উবারচালক ইউসুফের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের কাছে চালান পৌঁছে দিতো। গ্রেফতার আসামি ইউসুফ উবারের গাড়ি চালায়। পাশাপাশি সে ঢাকার অভ্যন্তরে বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচারের কাজ করে আসছে। শুরুতে গণি নামে এক মাদক কারবারির সঙ্গে কাজ করতো সে। এবছরের এপ্রিলে গণি মাদকসহ গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। তারপর থেকে ইউসুফ এই চক্রের সঙ্গে কাজ শুরু করে। র‌্যাবের কর্মকর্তারা আরও জানান, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছে দিতে প্রাইভেট কার,সিএনজিসহ ছোট পরিবহন ব্যবহার করতো এই চক্রের সদস্যরা।

র‌্যাব-১ এর অপারেশন অফিসার (এএসপি) সুজয় সরকার বলেন, ‘মাদক কারবারিরা কখনও ব্যক্তিগত গাড়িতে, কখনও যাত্রীবাহী বাসে, কখনও মৌসুমি শাক-সবজি বহনকারী ট্রাকে করে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদক রাজধানীতে নিয়ে আসছে। আমরা গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাদের গ্রেফতার করেছি। অভিযান চালিয়ে আমরা বেশকিছু পরিবহনের একাধিক চালক-হেলপারকে গ্রেফতার করেছি। পরিবহনে করে মাদক সরবরাহে জড়িত এই পরিবহন চালক ও হেলপাররা আলাদা আলাদা চক্রের সদস্য।’

এবছরের ১৪ জুন সকাল ১০টার দিকে মহাখালী রেলগেট এলাকায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো-ভ ১৫ ২২৯৬) তল্লাশি চালিয়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ চালক নূরে আলমকে (৪২) গ্রেফতার করে র‌্যাব-২। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গাজীপুরের মাওনায় অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও নগদ ৩৮ হাজার টাকাসহ সম্রাজ্ঞী মমতাজ ওরফে বোম্বে মমতাজসহ পাঁচ মাদক কারবারিকে আটক করা হয়। এই অভিযানে মোট ১০ হাজার পিস ইয়াবা, নগদ ৩৮ হাজার টাকা ও শ্যামলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস জব্দ করা হয়। বাসের চালক নূরে আলম ইয়াবা সেবন করতো। কক্সবাজারের রামু থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট সংগ্রহ করে তা ঢাকা-গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানের মাদক কারবারিদের কাছে সরবরাহ করে আসছিল সে।

র‌্যাব-২ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এএসপি মোহাম্মদ সাইফুল মালিক বলেন, ‘মাদক কারবারিদের চাহিদা অনুযায়ী চালক নুর আলম কক্সবাজারের রামু থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে আসতো। প্রতি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট বহনের জন্য সে ৭ থেকে ১০ টাকা করে কমিশন নিতো।’