শোকাহত জাতি এ শোক বহিবে কীভাবে?


প্রকাশিত : আগস্ট ১৪, ২০১৯ ||

অধ্যাপক রাজু আহম্মেদ
ব্যক্তি বিশেষের যেমন শোক আছে। তেমনি জাতি বিশেষের শোক আছে। শোক তাপ নেই পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তি যেমন খুঁজে পাওয়া যাবে না, তেমনি শোক তাপ নেই এমন কোন জাতি পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বক্তি বিশেষের শোক কখনো কখনো জাতি বিশেষের শোকে পরিণত হয়। সে শোকের ক্ষত কতটা গভীর হলে, কতটা প্রকট হলে, কতটা বেদনার হলে তবে জাতি বিশেষের শোকে পরিণত হয় এটা বুঝতে বিবেকবান মানুষের মোটেই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
একটা পরিবারের ১৭জন সদস্যকে একই সময়ে হত্যা করা কতটা নির্মমতার কাজ, কতটা ঘৃণার কাজ খুনিরা কতটা নির্মম হলে, কতটা নরপিশাচ হলে পরে এ জগণ্য কাজ করতে পারে এটা চিন্তা করা যায়? আমি যদি অপরাধি হই তাহলে অপরাধী হিসেবে শাস্তি আমার প্রাপ্য। আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা কি অপরাধ করলো যে তাদের শাস্তি দিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অপরাধ তো একটা সেটা হলো বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেয়া। পরাধিনতার জিঞ্জির থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য নেতৃত্ব দেয়াই তার অপরাধ। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের একখন্ড ভ‚মি এনে দেয়া। বিশ্বের মানচিত্রে একটা চিরস্থায়ী জায়গা করে দেয়া। কতটা অকৃতজ্ঞ হলে পরে এমন জঘন্য কাজ করার যায় চিন্তা করা যায়?
স্বাধীনতার সময় কালে বা স্বাধীনতার পরবর্তী কালে আমাদের যাদের জন্ম আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ৭ই মার্চ যে ভাষণ, ‘তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেবো। এদেশকে স্বাধীন করে ছাড়বো-ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। জনসভায় তাঁর তেজদীপ্ত ভাষণ শুনলে এখনো গা শিওরে ওঠে। সেই সময় জনসভায় লক্ষ জনতার ঢল নামলো কিভাবে? যখন যাতায়াত ব্যবস্থা এখনকার মতো এতো উন্নত ছিল না, ছিলা না এতো জনসংখ্যা কোথা থেকে আসলো এ দামাল লোকগুলো। হোসেন শহীদ সরোয়ার্দীর রের্সকোর্স ময়দান কানায় কানায় পরিপূর্ণ। মুহুর মুহুল ¯েøাগান। ¯েøাগানে মুখরিত পুরা ময়দান। সবাই যেন দীপ্ত শপথ গ্রহনের জন্য তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে।
আবাল বৃদ্ধ বনিতা, জাতি বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে সকলে জীবন বাজী রেখে ঝাপিয়ে পড়লো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের উপরে। মা, মাটি, মানুষকে মুক্ত করার জন্য। শহীদ হলো ৩ লক্ষ মানুষ। ২ লক্ষ মা বোন তাদের সম্ভ্রম হারালো। বাঙালি জাতি পেলো স্বাধীনতা। মুক্ত আলো, মুক্ত বাতাস, পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিয়ে স্বাধীন সর্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো।
যদি প্রশ্ন করা হয় কার নেতৃত্বে এ যুদ্ধ? কার নেতৃত্বে এ জীবন দেয়া? কার নেতৃত্বে উজ্জীবিত হয়ে রক্ত দেয়া? কার নেতৃত্বে এ দেশ স্বাধীন? কার নেতৃত্বের বদৌলতে বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের জায়গা হলো? এ সকল প্রশ্নের কি একটাই উত্তর আসবে না? তা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর এ কারণেই তিনি অবিসংবাদিত নেতা। যার জন্ম না হলে কে নেতৃত্ব দিত এ জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিতে?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে নির্মমতা ঘটানো হলো। এটা কেন? শোকাহত জাতি আজ জানতে চায়। এ সকল খলনায়কদের কাছে?
স্বাভাবিক মৃত্যু এক রকম, আর অস্বাভাবিক মৃত্যু আরেক রকম। স্বাভাবিক মৃত্যুর বেদনা বা শোক অস্বাভাবিক মৃত্যুর বেদনা বা শোক কখনো এ রকম হতে পারে না। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বড়ো ভাইয়ের মৃত্যু, আবার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ শুনে স্ত্রীর মৃত্যু এ সকল খবর আমরা পড়ে থাকি পত্রিকার পাতায়। একজনের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকে আর একজন মৃত্যু হওয়্ াএই শোকের গভীরতা কি অনুমান করা যায়। আর এটাতো স্বাভাবিক মৃত্যুর শোক। আর অস্বাভাবিক মৃত্যুর শোক সেটার আঘাতের গভীরতা কেমন হবে।
প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে মারা, পিটিয়ে মারা, গুলি করে মারা, এসিড নিক্ষেপ করে মারা, এগুলো তো প্রকৃতির নিয়মে মৃত্যু নয়। জন্মালে মরিতে হইবে, এ মৃত্যু সে মৃত্যু নয়। প্রকৃতির নিয়মের বাহিরের মৃত্যু কতটা ভয়াবহ, কতটা কষ্টের, কতটা বেদনার, কতটা শোকের, কতটা আর্তনাদের, কতটা বিষাদের আমরা তো সবাই দেখছি টিভিতে, ইন্টারনেটে। এ সকল পরিবারগুলো কি আহাজারি করছে, কি আছাড় খাওয়া, কি পাগল প্রায় হওয়া, তাদের নির্বাক হওয়া।
বঙ্গ বন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা একই সাথে হারিয়েছেন পরিবারের ১৭ জন সদস্যকে যে মুত্যু, যে হারানো ছিল অস্বাভাবিক। এই স্বজন হারানো বেদনায়, এই ক্ষত, এই শোক তিনি যে কিভাবে বয়ে চলেছেন, কেমন করে বয়ে চলেছেন, এ কথা ভাইবেই তো হতবিহম্বল হয়ে যেত হয়।
ব্যক্তিতে, ব্যক্তিতে, দলের সাথে দলের, গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর মত পার্থক্য থাকতে পারে। রাজনীতিতে আদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে জন্মকে তো অস্বীকার করা যায় না, জন্মদাতাকে তো অস্বীকার করা যায় না।
আগস্ট মাসের শোক কোন দলের নয়, আগস্ট মাসের শোক কোন ব্যক্তির নয়, আগস্ট মাসের শোক কোন গোষ্ঠীর নয়, আগস্ট মাসের শোখ কোন বিশেষ অনুসারীদের নয়। এ শোক পুরা বাঙালি জাতির। এ শোক পুরা বাংলাদেশীদের শোক। ব্যক্তি স্বার্থে, দলের স্বার্থে, রাজনীতির স্বার্থে, গোষ্ঠীর স্বার্থে যদি কেউ এটা অস্বীকার করে তাহলে তার আর নৈতিক অধিকার থাকে না এ ভ‚খন্ডে থাকার।
১৭ জনকে হারিয়েছেন যিনি। সেখানে আছেন গর্ভধারিণী মা, আছেন যার ঔরসে পৃথিবীর মুখ দেখেছেন সেই পিতা, আছেন সহোদর তিন ভাই, তাদের মধ্যে আদরের ছোট ভাই শেখ রাসেল, ভাবী, চাচা, মামা-মামীসহ পুরা পরিবার। এটা কি ইতিহাসের নির্মম হত্যাকান্ড নয়? এই শোক কতটা গভীর, এই শোক কতটা ক্ষতের, এই শোক কতটা আঘাতের, এই শোক কতটা বেদনার, এই শোক তিনি কিভাবে বয়ে চলেছেন। এ শোক ব্যক্তি শেখ হাসিনার নয়, এ শোক পুরো জাতির। শোকাহত এ জাতি এ শোক কিভাবে বইবে?



error: Content is protected !!