একটি মুখ ও মিছিল


প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০১৯ ||

শিল্পী গঙ্গোপাধ্যায়

“একটু শোন, আমার কথাটা একটু শোন, আমার স্বামী অসুস্থ বোধ করছেন …বাবা তোমাদের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছি মাইকের ভল্যুমটা একটু কমিয়ে দাও”…
বৃদ্ধার আকুল মিনতি স্তব্দ হয়ে গেল বাঁকবাহী জলযাত্রীদের “হর হর মহাদেব” জয়ধ্বনি আর পুণ্য অভিলাষী মানুষদের নির্মিত জলছত্রে বসানো বক্স থেকে ভেসে আসা গানের উল্লাসে।

শ্রাবণ মাস জুড়ে সারা দিনরাত চলতে থাকে এই উদ্দীপনা। উপলক্ষ্য শ্রাবণী মেলা, তারকেশ্বর মন্দিরে শিবের মাথায় জলদান।পদযাত্রীদের দীর্ঘ পথের শ্রান্তি কমাতে তাদের সেবার জন্য নির্মিত হয় সুসজ্জিত প্যান্ডেল,বাঁক রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বাঁক নামিয়ে রেখে বিশ্রাম নেবার কথা। কিন্তু এদের উন্মাদনায় প্রাণ জেরবার হয়ে ওঠে স্থানীয় মানুষদের।

অসহায় মল্লিকা ফিরে গেল ঘরে,অসুস্থ স্বামী একলা রয়েছে যে। ঘরে পা রাখতেই একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পেল, নাইট বাল্বের হাল্কা আলোয় ঠিক বুঝতে পারলো না শব্দটা কোথা থেকে আসছে। বন্ধ জানলা ভেদ করে ভেসে আসছে ঝিনচাক গানের তীব্র আওয়াজ। কাঁপাকাঁপা হাতে লাইটের সুইচ অন করেই আর্তনাদ করে উঠলো মল্লিকা, মৃনাল মাটিতে পড়ে,রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝের সাদা রাজস্থানী
মার্বেল …

দিশেহারা মল্লিকা চিৎকার করতে থাকে, কে আছ বাঁচাও ..বাঁচাও। তার আর্তনাদ ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘরের বাতাস ভাড়ি করে তোলে। অস্টিওপোরোসিসে প্রায় পঙ্গু মল্লিকা তো মাটিতে বসতেই পারেনা, বোতলের মুখ খুলে স্বামীর মুখে জল ছেটায়,যদি সম্বিৎ ফিরে আসে মৃনালের। না, চেষ্টা বৃথা।

কেমন একটা জেদ চেপে বসে মাথায়। ওয়াকারটা নিয়ে আবার বাইরে বেরিয়ে আসে। চারদিকে নজর করে দেখে নেয় গানের উৎস।বাঁক রাখার নির্দিষ্ট মাচায় বাঁক নামিয়ে রেখে কেউ কেউ ধোঁয়া টানছে কিছু আবার গায়ের জামা কোমড়ে জড়িয়ে গানের সাথে নানান ভঙ্গিমায় নাচছে, বাবার ভক্তেরা প্রায় সবাই অল্প বয়সের ছেলে ।
মল্লিকা এগিয়ে গিয়ে প্রথমে মিউজিক বক্সের সুইচ অফ করে চিৎকার করে বলতে থাকে ,”কখন থেকে তোমাদের থামতে বলছি আমার স্বামী অসুস্থ, এসো দেখে যাও রক্তে ভেসে যাচ্ছে মানুষটা “, গলা বুজে আসে, হাপাতে থাকে মল্লিকা । ঘটনার আকস্মিকতায় সাময়িক ঘাবড়ে গেলেও খানিক পরেই ছেলের দল রে রে করে ওঠে,”আমরা কি করব, যান ঘরে যান,সকালে ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন। এখানে ঝামেলা করছেন কেন ?”

বিষ্মিত , ব্যথিত মল্লিকার পা সরে না,এরা কারা ! প্রথমে ভেবেছিল ওরা শুনতে পায়নি তাই বুঝি ওর মিনতি রাখেনি,রক্তে ভেসে যাচ্ছে শুনেও, ছিঃ…

বিষন্ন,অসহায় মল্লিকা ধীরে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। কি করবে সে এখন ,মানুষ টা তবে এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? কিচ্ছু করতে পারবে না মল্লিকা! গলার কাছে জমে থাকা আশঙ্কা, অসহায়তা অশ্রু হয়ে নেমে আসে । চোখের অবাধ্য জল মুছে নিয়ে, মনে মনে বিড়বিড় করে, যা হোক একটা কিছু তাকেই করতে হবে,শরীরের সবটুকু শক্তি একসাথে করে ঘরের দিকে পা বাড়ায় মল্লিকা।

“আমি যাচ্ছি চলুন,দাদু কোথায়?” ..ভুল শুনছে মল্লিকা? নাকি মনের ভুল!
পিছনে ফিরে দেখে একটি ছেলে এগিয়ে আসছে মল্লিকার পিছু পিছু । মল্লিকা অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে,
“আমি কৌশিক, বেহালা থেকে এসেছি ..আর দাঁড়িয়ে থেকো না দিদা,চলো” ..নিবিড় মমতায় হাত ধরে মল্লিকার । যেন পরম আত্মীয়,কত কালের চেনা।

ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগে মল্লিকার,মনে মনে হয়ত কোন হিসেব মেলায় মল্লিকার মন…

পাঁজাকোলা করে কৌশিক একাই বাইরে নিয়ে আসে মৃনাল কে,পেছনে মল্লিকা। গান,বাবার নামে জয়ধ্বনি, হুঙ্কার ,উল্লাস থেমে সজ্জিত জায়গা জুড়ে এখন রাত্রির নিরবতা । কৌশিক কে ওভাবে আসতে দেখে একে একে এগিয়ে আসে অনেক মুখ…

এমার্জেন্সি প্রয়োজনে ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় রাখা এম্বুলেন্সে তোলা হল মৃনাল কে..

একটি নতুন দল তীব্র জয়ধ্বনি , বড়-বড় ঘুঙুরের শব্দ তুলে এগিয়ে আসছিল থামাল এই ছেলেগুলোই ,যাদের ব্যবহারে খানিক আগেই আহত হয়েছিল মল্লিকা।

মৃনাল কে নিয়ে এম্বুলেন্স এগিয়ে চলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিকে। পেছনে হাঁটতে থাকে বহু ছেলে । রবিবারের রাত, সোমবার বাবার মাথায় জলঢালার বিশেষ দিন, রাত এখনও আধারে ডুবে আছে কিন্তু রাস্তায় পূণ্যার্থীর ঢল। তাদেরও সামলাচ্ছে মল্লিকাদের সাথে আসা ছেলেরদল।তা না হলে এগোনো মুসকিল হয়ে যেত ।

কখন যেন মৃনাল কে নিয়ে মল্লিকার ভয়, আশঙ্কা মিলিয়ে গেছে। মনের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছে স্বস্তি। কৌশিক সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে সেই থেকে,”তুমি কোন চিন্তা করো না দিদা, দাদুভাই এর কিচ্ছু হবে না,এই দ্যাখো রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে ..দ্যাখো।
আরও কত কথা যে বলে চলেছে কৌশিক, মল্লিকার কানে পৌঁছোয় না সেসব।মল্লিকা তখন ভাবনার গভীরে, ওরা যখন মল্লিকাকে ফিরিয়ে দিল, মল্লিকা আহত হয়েছিল,মনে হয়েছিল,এরাই তো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ,তবে কাদের উপরে দিয়ে যাব আমরা আগামী পৃথিবীর দায়িত্ব! এখন মনে হচ্ছে, সব আছে শুধু সঠিক দিশা নেই। প্রতিনিধিত্ব করার মত একজন নির্ভিক, দামালছেলে চাই যে সঠিক দিশা দেখাতে পারে …

পুব দিগন্তে একটু একটু করে সূর্য উঠছে,তার লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে ভুবনময়, মল্লিকাদের যাত্রাপথেও…
মল্লিকাদের অ্যাম্বুলেন্সের সামনে-পেছনে ওদের সাথে চলছে যারা তাদের মুখগুলো একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, নিবিড় ভাবে চোখ বোলায় মল্লিকা,মনে মনে ভাবে ,
একটা সাহসী মুখ কত সহজেই একটা মিছিল তৈরি করে নিতে পারে…