প্রবন্ধ/বঙ্গবন্ধু বিশ্বের চোখে বঙ্গবন্ধু


প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০১৯ ||

শিহাব শাহরিয়ার

‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…’ এই উচ্চারণ করেছেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। কবিতায় হাজার বছর হাঁটলেও তিনি বেঁচে ছিলেন পঞ্চান্ন বছর। বাংলাদেশ নামক কাব্যের অমর কবি বঙ্গবন্ধুও বেঁচে ছিলেন মাত্র পঞ্চান্ন বছর। অথচ এই বয়সেই তিনি হিমালয়ের সমান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেখতেও ছিলেন বিশাল, মানুষও ছিলেন আরো বিশাল। জীবিতকালেই তিনি খ্যাতির তুঙ্গে উঠেছিলেন। আর ঘাতকদের নির্মম বুলেটের আঘাতে মৃত্যুর পর পৃথিবীময় তাঁর কীর্তি হয়ে উঠেছে মহামানবের। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় যেমন বলেছেন, ‘ঐ মহামানব আসে…’ বঙ্গবন্ধুই হলেন সেই বাঙালিদের মহামানব যিনি এনে দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সোনার মত করে। কিন্তু নরপশু ঘাতকরা তাঁকে সেটি করতে দেয়নি। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘাতকদের ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব হাজার হাজার গুণে উজ্জ্বল হয়েছেন। তার প্রমাণ আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, তথ্যচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে; পৃথিবীর আর কোনো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তা হয়নি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবি ও লেখকরা লিখলেন লক্ষ লক্ষ লেখা। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের এক অখ্যাত মুজিব ভক্তও তাঁকে নিয়ে লিখেছেন পঙক্তিমালা। পঙক্তিমালা রচনা করেছেন ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা। তারা বঙ্গবন্ধুকে এঁকেছেন তাদের নরম হাতে মনের রং-তুলিতে। কি মর্মস্পর্শী সেই উচ্চারণ, কি আনন্দঘন সেই চিত্রকলা, কি অসাধারণ শ্রুতিমধুর সংগীত- যেন মধুমতি আর বাইঘারে কলকল ধ্বনি। যেমন আমার কবিতায় আমি বলেছি, ‘ঢেউয়ের নদী প্রাণের নদী মধুমতীর বুকের ভিতর/ ফুল শিমুল আর কুহুকুহু কোকিলের স্বরের ভিতর/ আমাদের মনযুমনা ষড়ঋতুর মূর্ছিত সুরের ভিতর/ কার নাম তাঁর নাম বার বার বার বার বেজে ওঠে/ কোথায় তিনি কোথায় আকাশ কোন সে আকাশ/ তিনিই আকাশ তিনি আমার বাংলাদেশের আকাশ’। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কবিতায় উচ্চারণ করলেন, ‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি/ রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ/ গতকাল আমাকে বলেছে আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি/ আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি। শহীদ মিনার ভেঙ্গে খসে পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে/ আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি। /আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি’।

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শুধু কবিতা বা সাহিত্যেই নয়, বিশ্ব মিডিয়া এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর সমসাময়িক বিশ্ব নেতারা তাঁকে নিয়ে যে মূল্যায়ন ও মর্মবেদনার কথা বলেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে ছিলেন এক ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ। তাই অনন্য সাধারণ এ নেতাকে স্বাধীনতার প্রতীক বা রাজনীতির ছন্দকার খেতাবেও আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন তাঁর ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের।
১৯৭৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সংখ্যা লন্ডনের ‘নিউ স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় মাইকেল বার্নস তাঁর ‘চৎড়ংঢ়বপঃ ভড়ৎ ইধহমষধফবংয’ শিরোনামের দীর্ঘ প্রবন্ধে মন্তব্য করেন- ঋড়ৎ ঃযব সড়সবহঃ ইধহমষধফবংয’ং মৎবধঃবংঃ ধংংবঃ ৎবসধরহং ইধহমধনধহফযঁ যরসংবষভ. ঝযবরশয গঁলরন’ং বীঃৎধ ড়ৎফরহধৎু ফুহধসরংস ধহফ পযধৎরংসধ রং ংঃরষষ ঃযবৎব, সধু নব ংষরমযঃষু ফবহঃবফ নু ঃযব ংযববৎ রহঃৎধপঃধনরষরঃু ড়ভ ঃযব ঢ়ৎড়নষবসং, নঁঃ ংঃরষষ ঃযব ভড়ৎপব ঃযধঃ রহংঢ়রৎবং ধহফ ঁহঃরবফং যরং ঢ়বড়ঢ়ষব. ডরঃয ধ ফধহমবৎড়ঁং ধহফ ফরভভরপঁষঃ ভবি ুবধৎং ধযবধফ. ইধহমষধফবংয রং মড়রহম ঃড় নববফ গঁলরন’ং নৎধহফ ড়ভ ষবধফবৎংযরঢ় সড়ৎব ঃযধহ বাবৎ.’

বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়া বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করেন এভাবে- ‘তিনি এমন এক বিশাল ব্যক্তিত্ব, যার সামনে সহসা মাথা ন্যুয়ে আসে।’ এই উপমহাদেশের বাঙালি মনীষীদের নিয়ে পরিচালিত বিবিসি’র এক জরিপে সবাইকে ছাড়িয়ে যিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের মতে, ‘শেখ মুজিব ছিলেন এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব’। ফিনান্সিয়াল টাইমস বলেছে, ‘মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কখনই জন্ম নিতোনা।’ ভারতীয় বেতার ‘আকাশ বাণী’ ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট তাদের সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বলে, ‘যিশুমারা গেছেন। এখন লক্ষ লক্ষ লোক ক্রস ধারণ করে তাকে স্মরণ করছে। মূলত একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো।’ একই দিনে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকা-কে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ নিউজ উইকে বঙ্গবন্ধুকে আখ্যা দেয়া হয়, “পয়েট অফ পলিটিক্স বলে”।
১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ক্যাস্ট্রোর। বিশ শতকের জীবন্ত কিংবদন্তী কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হিমালয়কে দেখেনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি ছিলেন হিমালয়ের সমান। সুতরাং হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি’। ইরাকের সেনা-অধিপতি ও মুসলিম নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ তাই তিনি অমর’। ব্রিটিশ লর্ড ফেন্যার ব্রোকওয় বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী এবং দ্যা ভ্যালেরার থেকেও মহান নেতা”। জাপানী মুক্তি ফুকিউরা আজও বাঙালি দেখলে বলে বেড়ান, “তুমি বাংলার লোক? আমি কিন্তু তোমাদের জয় বাংলা দেখেছি। শেখ মুজিব দেখেছি। জানো-এশিয়ায় তোমাদের শেখ মুজিবের মতো সিংহ হৃদয়বান নেতার জন্ম হবে না বহুকাল।”
শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা, (যিনি জাতির জনকের মতো নিজেও নৃশংস হত্যার শিকার) উপমহাদেশের এ মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে। মুজিবুর রহমান রাজবংশের সন্তান নন, তিনি পাশ্চাত্যের বিলাসী উচ্চ শিক্ষাও গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন এক নিভৃত পল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মনেয়া সাধারণ মানুষ। শেখ মুজিব বুদ্ধিজীবী ও শ্রমজীবী উভয় শ্রেণির মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। বাংলার মানুষ তাদের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, বাগ্মী বা প্রাণবন্ত নেতার সাক্ষাৎ পেলেও তার মত সফল নেতা কেউ ছিলেন না। তিনি বাঙালি জাতির স্বপ্নপূরণ করেছেন, তাদেরকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন’।
সদ্যপ্রয়াত ভারতীয় বিজ্ঞানী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ভাষায় বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’ এবং তিনি নিজেই সে আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিত বলেন, ‘প্রথম সরকার প্রধান জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশে বাংলাদেশের পৃথক জাতিসত্তায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে ৭১ সালের মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সংকট গভীর হওয়ায় মুজিব উপলব্ধি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ওপরই কেবল তার সংগ্রামের সাফল্য নির্ভরশীল নয় বরং এক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক ও আনুষঙ্গিক সমর্থন প্রয়োজন’। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে শেখ মুজিব এ উপমহাদেশে স্বতন্ত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন’।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করলেও ইতিহাসই তাঁর প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ফলে তাঁর এককালীন ঘোরতর শত্রু তাঁকে মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি (বেলুচিস্তান) অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, (পাকিস্তানে তাকে ব্যাপকভাবে এই অপবাদে চিত্রিত করা হলেও) ‘বস্তুত: মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না । নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক’। আরেকজন সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তার ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখি মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গীর্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন’। তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার হবে-পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এ ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে।’ বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর এ জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত আশংকা করেন ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এ কারণে পাকিস্তানকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়, শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি করে রাখা হলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে। ১১ জন মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।
হেলসিনকি ভিত্তিক বিশ্ব শান্তি পরিষদের (ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিল) এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রহসনের বিচার এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইয়াহিয়া খানের স্বৈর-সরকার বিশ্বদরবারে জনগণের অধিকার অবজ্ঞা ও সকল নৈতিকতা বিবর্জিত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের দলকে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী করাই ছিল তার একমাত্র অপরাধ।
বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিশ্লেষক বা গণমাধ্যমের বাইরে বঙ্গবন্ধু বিদেশি জনগণেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। আমেরিকান মিশনারী জেনিন লকারবি’ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামে ছিলেন। তার ‘অনডিউটি ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে তিনি লিখেছেন এমন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটছে, যে অনগ্রসর বাঙালি জাতিকে মুক্তির আস্বাদ দেবে, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান; আদর করে ডাকা হয় ‘মুজিব’।
ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা ফেনার ব্রকওয়ে বলেছেন, সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুমবা, ক্যাস্ট্রো ও আলেন্দের সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চারিত হবে। তিনি বলেন, তাঁকে হত্যা করা ছিল মানব হত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ। শেখ মুজিব শুধু তাঁর জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেননি। তিনি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন।
সেনেগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদু দিউফ বঙ্গবন্ধুকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৯ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এ আফ্রিকান নেতা বলেছিলেন, আপনি এমন এক মহান পরিবার থেকে এসেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা উপহার দিয়েছে। আপনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনার দেশের জনগণ যথার্থই বাংলাদেশের মুক্তিদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরকালীন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই উপমহাদেশের গণতন্ত্রের এক প্রতিমূর্তি, এক বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং ভারতের এক মহান বন্ধু ছিলেন।’
যারা আজও এই মানুষটির অবদান নিয়ে সন্দিহান এবং কুৎসা রটিয়ে বেড়ান তাদের জন্য কবি আবদুল হাকিম সপ্তদশ শতকেই লিখে গেছেন, ‘যে সব বঙ্গে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী, সেসব কাহার জন্ম নির্ণয়ে না জানি’।
সবচেয়ে বড় উচ্চারণটি করেছেন লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি বলেছেন, ‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’। আর বাঙালি মুখে থাকবে বঙ্গবন্ধুর শেষ উচ্চারণ: ‘জয় বাংলা’।