কাকার কীর্তি


প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০১৯ ||

নুরুল হুদা

[এক]

আমার ছোটকাকার নাম ভোলা।তা কাকা যে সেই নামকে এই ভাবে সার্থক প্রতিপন্ন করবেন, দাদু যদি তখন বুঝতে পারতেন তাহলে তিনি এই নামটি রাখতেন কিনা আমার খুবই সন্দেহ আছে। ভোলা কাকা ভুলে যাওয়া কে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।মানুষ কত সহজে এবং কত রকম ভাবে যে ভুলে যেতে পারে সেটা ছোট কাকার কান্ডকারখানা না দেখলে আমার কোনমতেই বিশ্বাস হত না।শুধু ভুল হলে না হয় কথা ছিল, তার সঙ্গে অন্যমনস্কতা, বিভিন্ন রকম বাতিক সব মিলিয়ে সেই ছোটবেলা থেকেই ভোলা কাকা আমার কাছে একটা মজার দৃষ্টান্ত হয়েই থেকে গিয়েছেন।

তবে মানুষটির মনে কোন ঘোরপ্যাঁচ ছিলনা।ফর্সা, একটু নাদুসনুদুস গড়নের ভোলা কাকাকে দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যেত।ঠোঁটের কোণে একটা হাসি সব সময় লেগেই থাকতো। মানুষটি খুব রসিক ও ছিলেন।নিজেই নিজের উদ্ভট কান্ডকারখানার গল্প বলে আমাদের খুব হাসাতেন। ভোলা কাকার বয়স খুব বেশি নয়।আমার বাবা আর তিন কাকার মধ্যে ভোলা কাকা সবার ছোট।বয়স বত্রিশের কাছাকাছি হবে।আমাদের বংশের ঐতিহ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যেই মাথায় টাক দেখা দিয়েছে। প্রায়ই দেখতাম ভোলা কাকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে আর একটা ছোট আয়না ধরে সেই টাকটাকে দেখার চেষ্টা করছেন।তাই দেখে আমি হি হি করে খুব হাসতাম। একদিন আমার হাসি দেখে ভোলা কাকা খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন-
তুই হাসছিস ? এদিকে দেখ আমার মাথার সব চুল উঠে একেবারে গড়ের মাঠ হয়ে গেল।এর পর যদি তোর কাকিমা আমাকে টেকো বলে ডাকে তাহলে কি রকম লজ্জার কথা হবে বল দেখি! এমনিতেই আমার ভুলে যাওয়া স্বভাব নিয়ে আমাকে আড়ালে ভুলো, ভুলাক্কাড় , ভুলভুলাইয়া এই সব বলে ডাকে।এর সঙ্গে এবার যদি টেকো নামটাও যোগ হয়ে যায় তাহলে কোথায় মুখ লুকোবো বল তো! না আমার আর বেঁচে কোন সুখ নেই রে!
এই বলে কাকা ফোঁস করে খুব বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

[দুই]

আমি তখন বেশ ছোট। ভোলা কাকার বি.এ ফাইনাল পরীক্ষা চলছে।সেই সময় ভোলা কাকার পড়া দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।ভোলা কাকা কিছুই মনে রাখতে পারতেন না।তার উপর সব কিছু ঝাড়া মুখস্থ করতেন।সারাদিন একটানা সুর করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করতেন।একই লাইন দশ বার বারো বার পড়ার পর তবেই পরের লাইনে যেতেন।শুনে শুনে বাড়ি শুদ্ধ লোকের মুখস্থ হয়ে যেত কিন্তু কাকার আর হতো না।বিশেষ বিশেষ যে প্রশ্ন গুলো পরীক্ষায় আসার সম্ভাবনা বেশি, ভোলা কাকা সেগুলোর উত্তর কাগজে লিখে আঠা দিয়ে সেঁটে সেঁটে ঘরের চারটে দেয়াল একেবারে ভরিয়ে ফেলেছিলেন।দরজা, জানালা, আলমারি এমন কি বাথরুমের দেয়ালটা ও বাকি ছিল না।যখনই ভোলা কাকার মনে হতো অমুক প্রশ্নের উত্তরটা ঠিক মনে আসছে না তখনই দেয়ালে সাঁটা উত্তরটা একবার দুবার পড়ে নিতেন।এছাড়া পড়া ঠিক মতো মুখস্থ হয়েছে কি না সেটা দেখার জন্য ভোলা কাকা খুব ভালো একটা উপায় বার করেছিলেন।পড়া মুখস্থ হয়ে যাবার পর দাদুর আমলের ঢাউস একটা টেপরেকর্ডারে ভোলা কাকা সেগুলিকে রেকর্ড করতেন। তার পর সেটা চালিয়ে বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতেন মুখস্থ ঠিক হয়েছে কি না।

ইতিহাস পরীক্ষার আগে তিন দিন গ্যাপ ছিল।ভোলা কাকা বেশ চওড়া হাসি হেসে বললেন-জানিস ইতিহাস পরীক্ষাটা যা হবে না! একেবারে ফাটিয়ে দেব।পরীক্ষার আগে পড়লে তবেই আমার ভালো করে মনে থাকে।আগে যা পড়ি সবই তো ভুল মেরে দিই।

ভোলা কাকা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার সব আবদার মেনে নিতেন।বয়সের দশবছরের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুর মতো ছিল। তা ভোলা কাকা তো খুশি মনে আদা জল খেয়ে পড়তে লেগে গেলেন।সে কি পড়ার ধুম! ভোলা কাকার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ার ধমকে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার জোগাড়! রাত নেই দিন নেই ভোলা কাকা পড়েই চলেছেন।এমন সময় পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যাবেলা ভোলা কাকার বন্ধু খোকন কাকা একটা নোট নিতে আমাদের বাড়িতে এলেন। ভোলা কাকা তখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি মুখস্থ করছিলেন।ভোলা কাকার ঘরে ঢুকে খোকন কাকা অবাক হয়ে বলল-হ্যাঁরে ভোলা কাল পলসায়েন্স পরীক্ষা, তুই ইতিহাস পড়ছিস কেন?
ভোলা কাকা কেমন ভ্যাবলা মুখ করে কিছুক্ষণ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন-
যাহ্ তুই আবার এখন আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারতে এলি! এদিকে আমার এখনো চারটে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে বাকি!!
খোকন কাকা অবাক হয়ে বললেন- তুই ইয়ার্কি ভাবছিস ভোলা! ভালো করে খাতাটা খুলে দেখ কাল কি পরীক্ষা!
ভোলা কাকা হড়বড় করে খাতা খুলে পরীক্ষার সময়সূচীটা বার করে দেখেই আঁ আঁ করে কাঁপতে কাঁপতে ফিট হয়ে পড়ে গেলেন।
তারপর ছোটাছুটি, জল আন্, পাখা আন্, ডাক্তার আন্, একেবারে হুলস্থুল কান্ড বেধে গেল।জেঠি মা, মা, কাকিমা সবাই ছুটে এলেন।বাবা, কাকারা তিন ভাই পড়িমরি করে দৌড়ে এলেন।বাচ্চারা এসে চারপাশে ভিড় করে ঘিরে ধরলো।মা ভোলা কাকার মুখে জলের ছিটে দিতে লাগলেন।খোকন কাকা দৌড়ে গিয়ে পাড়ার মুসারাফ ডাক্তারবাবুকে ধরে নিয়ে এলেন।ডাক্তার বাবু ভালো করে ভোলা কাকাকে দেখে বললেল- নার্ভাস ব্রেক ডাউন। অত্যাধিক মেন্টাল স্ট্রেসের ফলে এটা হয়েছে।ওর এখন টানা বিশ্রামের প্রয়োজন। বেশি স্ট্রেস না দেওয়াই ভালো তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
ব্যাস সে বছর ভোলা কাকার আর বাকি পরীক্ষা গুলি দেওয়াই হল না।

[তিন]

আমার বড়চাচার কাছ থেকে ভোলা কাকার ছোটবেলার একটা গল্প শুনেছিলাম।ভোলা কাকার বয়স তখন বছর তেরো হবে।একদিক ওনার মামা এসেছেন আমাদের বাড়ি।সাইকেল থেকে নেমেই উনি বাইরের দরজার সামনে ভোলা কাকাকে দেখতে পেলেন।ভোলা কাকাকে দেখে উনি খুব খুশি হয়ে বললেন-
আরে ভোলাবাবু যে, কেমন আছ?
ভোলা কাকা কিন্তু মামাকে দেখে মোটেই খুশি হলেন না।কারণ এই মামাটিকে ভোলা কাকা হাড়ে হাড়ে চিনতেন।এলে সপ্তাহ খানেক থাকবেন আর হাজার রকম ফাইফরমাশ খাটিয়ে খাটিয়ে ভোলা কাকার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুলবেন।তাই ভোলা কাকা ব্যাজার মুখে বললেন-
ভালো আছি মামা!
মামা খুশি হয়ে বললেন- বেশ বেশ! তা বলছিলাম কি ভোলাবাবু আমি আবার আসার সময় তামাকটা আনতে ভুলে গেছি।আমার তো আবার তামাক না হলে একদন্ড চলে না।আসার সময় কিনে নেব ভেবেছিলাম, তাও ভুলে গেলাম।তুমি একবার চট করে আমার সাইকেলটা নিয়ে বাজারে চলে যাও দিকিনি! বেশ ভালো দেখে দুটাকার তামাক কিনে নিয়ে এস তো তাড়াতাড়ি।দেখ বেশি দেরি কোরো না যেন? এই নাও টাকা।এই বলে দুটাকার একটা নোট ভাগ্নের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
ভোলা কাকা টাকাটা পকেটে রেখে সাইকেল নিয়ে গজগজ করতে করতে বাজারে দিকে রওনা দিলেন। কিন্তু ভোলা কাকা তো সাইকেল চালাতেই জানতো না! সাইকেলটাকে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই বাজারের দিকে যেতে ভোলা কাকার মনে পড়লো কথাটা ।নিজে যে সাইকেল চালাতে জানেন না এটা ভোলা কাকার মনেই ছিল না এতক্ষণ!
ভোলা কাকা সাইকেলটা নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন দেখে পাড়ারই এক চাচা জিজ্ঞেস করলেন-
কি হল ভোলা! তুই সাইকেল থাকতে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিস কেন?
ভোলা কাকার মেজাজ এমনিতে খিঁচড়ে ছিল।সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে তাই সাইকেল চালাতে জানেন না একথা তো আর বলা যায় না চাচার কথার জবাবে চটজলদি যেটা মাথায় এল সেটাই বলে দিলেন-চাচা সাইকেল খারাপ হয়নি। অনেকক্ষণ সাইকেল চালিয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছি, তাই সাইকেলটা নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি।
ভোলা কাকার কথা শুনে চাচার তো মুখ একেবারে হাঁ হয়ে গেল! ভুল করে তার মধ্যে দু একটা বাজারের মাছিই টুকে পড়লো কিনা কে জানে!
ভোলা কাকাকে ওই ভাবে যেতে দেখে আরও দুতিন জন যখন একই কথা জিজ্ঞেস করল তখন ভোলা কাকার বেশ রাগ ধরে গেল। ধুৎ তেরিকা বলে বিরক্ত হয়ে ভোলা কাকা রেগেমেগে চেপেই বসলেন সাইকেলে।এবং সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ভোলা কাকা অবাক হয়ে দেখলেন সাইকেলটা তিনি বেশ ভালোই চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন! তবে কবে এবং কোথায় তিনি সাইকেল চালানো শিখেছিলেন সেটা কিছুতেই মনে করতে পারলেন না!!