বৃষ্টিভেজা নকশী চাদর


প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০১৯ ||

মিদহাদ আহমদ

আব্বা,ঝড় বাদলের দিন।গতরাইতেও ঘরে টপাটপ পানি পড়ছে।টিনের চাল বদলাইবা না?মাটিতে পানি পইড়া মাটিও তো ভিইজা নষ্ট হইয়া যায়।ও আব্বা,কথা কও না ক্যান?আব্বা।
মেয়ের ডাকে বোধ শক্তি ফিরে এলো আব্বাস মিয়ার।যথেষ্ট বয়স হয়েছে ওনার।বয়স কত তা জানা নেই।সংগ্রামের সময় বিয়ে করেছিলেন এইটা মনে আছে।এখন বয়সের ভারে কাজেও যেতে পারেন না।ছেলেমেয়ে বলতে কেউ ই নেই।এক মেয়ে আছে।মেয়ে বলতে ওনার না।ওনার ছোট বোনের মেয়ে।মেয়েকে জন্ম দিয়েই আব্বাস মিয়ার ছোট বোন মারা যান।সে থেকেই সে আব্বাস মিয়ার মেয়ে হিসেবেই ওনার সাথে আছে।আব্বাস মিয়ার স্ত্রী ও মারা গেছেন।এখন কেবল মেয়ে রুমানা আর আব্বাস মিয়া এই দুইজনের সংসার।
কখনো কখনো আব্বাস মিয়া কাজে যান।মাটি কাটেন।যখন ভালো লাগেনা তখন মাটি কাটতে যান না।নিজেকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই আব্বাস মিয়ার।শুধু মেয়ে রুমানাকে নিয়েই যত চিন্তা।রুমানা ঘরে বসে হাতপাখা,ঝাড়ু,ঝুলি,ব্যাগ,মাদুর বানায়।সপ্তাহ শেষে এগুলো নিয়ে বাজারে যান আব্বাস মিয়া।বিক্রি করেন। কখনো কখনো লোকে নেয়,আবার অনেক সময় সবই থেকে যায়।এগুলা বিক্রি করে যা পান তা দিয়েই সপ্তাহ চলে দুজনের।
এখন বৃষ্টির দিন।মাথার উপরে যে ছাদ আছে,গতবছরের ঝড়ে তার নাই নাই অবস্থা।এতোদিন কোনোমতে চলছিলো।কিন্তু এখন ভরা বৃষ্টির দিনে টপটপ পানি পড়ে।ঠিক করার মতো টাকা নেই আব্বাস মিয়ার।
রুমানা এসে বললো,
আব্বা,এই নকশী বিছানারচাদর খানা বাজারে নিয়া যাও।আমি তিন মাসে বানাইছি।দেখো বিক্রি কইরা টাকা পাও কি না?
আব্বাস মিয়া বললেন,
মারে,তোর এতো কষ্টের জিনিস বেইচ্যা বেইচ্যা এই বুইড়া বাপে খাইতাছি,আমার যে ভারী কষ্ট হয়।
রুমানা বললো,
আব্বা,আমার আর তোমার জিনিস কী?যাও কইছি বাজারে। দেহো ব্যাচবার পারো কী না
আব্বাস মিয়া নকশী বিছানারচাদর নিয়ে বাজারে গেলেন।দিনশেষে আবার এইটা নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন।শূন্য হাতে এলেন।রুমানা বললো,
আজকে হইছে না তো কী হইলো?কাইল বেচবা।আউ আব্বা,ভাত খাইয়া লই।
আব্বাস মিয়া কিচ্ছু বললেন না।শুধু মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন।একসাথে খাবার খেলেন।শূন্য দৃষ্টিতে মেয়ের জীবন নিয়ে সঙ্কায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।হাসি মুখে পাশে বসেই খাবার খাচ্ছে রুমানা।

পরদিন আবার সেই নকশী চাদর নিয়ে বাজারে গেলেন আব্বাস মিয়া।ফেরার পথে রিক্সা করে বেশ কয়েকটা নতুন টিন,আর বেশ বাজার নিয়ে আসলেন আব্বাস মিয়া।রুমানা জিজ্ঞেস করলো,
আব্ব কই পাইলা এসব?
আব্বাস মিয়া বললেন,
মারে একজন শহরের গাড়িওয়ালা ম্যাডাম তোর নকশী চাদর দেইখ্যা পাঁচ হাজার টাকায় কিইনা নিছে।আমার ফোন নাম্বারও নিছে।বলছে,আরও লাগবো ওনার।
রুমানার মুখে হাসি।আব্বাস মিয়ারও।দুই হাসিতে বৃষ্টি নেমে এলো।আব্বাস মিয়া রুমানাকে বললেন,
মা ঘরে চল।বৃষ্টি চইলা আইলো যে।
রুমানা বললো,
আব্বা ভিইজা লই,এরপর থেকে তো ঘরে নতুন চাল লাগবো।তখন ভিজবার পারুম না।

আব্বাস মিয়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন,অজানার দিগন্তে চোখ রেখে একটাই আবদার ওনার,রুমানাকে এখন ভালো একটা পাত্রের হাতে তুলে দিতে হবে।অভাগা বাবার,চোখ জোড়ে স্বপ্ন,সংকীর্ণ হাত আর আরেকটা হাসিময় দিনের পানে চেয়ে দিনের সূর্য অস্ত গেলো।