ইসলামে ‘ঈদগাহ’ বলে কিছু নেই


প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০১৯ ||

কামারুজ্জামান, ০১৯১২ ৬৬০৪৫৫, দেবহাটা, সাতক্ষীরা।
ইসলামে ঈদ আছে, কিন্তু ঈদগাহ নেই। ইসলামে ময়দান আছে, কিন্তু ঈদগাহ নেই। ‘ঈদ’ আরবী শব্দ আর ‘গাহ্’ ফারসী শব্দ। ‘গাহ্’ অর্থ স্থান। এই হিসাবে ‘ঈদগাহ’ মানে ঈদের স্থান বা ঈদের নামাজ আদায় করার স্থান। সমগ্র কুরআন-হাদীসে কোথাও ‘ঈদগাহ’ শব্দ নেই, খুঁজে পাওয়া যাবে না। আরবীতে এর কোন প্রতিশব্দও নেই। রসূলে কারীম (সঃ) আমাদেরকে খোলা ময়দানে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে বলেছেন, যে কোন উপযুক্ত ময়দান, যেখানে বছরের অন্যান্য সময় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক-জীবনের বহুবিধ স্বাভাবিক কার্যক্রম চলতে পারে। এমন নয় যে, ঈদের নামাজ শেষ, অতঃপর স্থানটি সারা বছর জনবিচ্ছিন্ন বিরান ভূমিরূপে পড়ে থাকবে। শুধুমাত্র ঈদের জন্য ‘ঈদগাহ’ ঘোষণা দিয়ে প্রশস্ত জায়গা সারা বছর ঈদগাহের নামে বেকার ফেলে রেখে ভূমির অপব্যয় করা ইসলামে স্বীকৃত নয়, বরং ধিক্কৃত। “নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” ঘন জনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ভূমির সংকট প্রকট। তথাপি এখানে দেখা যায়, দিকে দিকে বিভিন্ন জনপদে বহু বহু সরকারী-বেসরকারী জমি ঈদগাহের নামে পাঁচিল ঘিরে ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ ‘ওয়াজ-সিজনে’ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ওয়াজ-মাহফিল দেওয়া হচ্ছে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার সামনের মাঠে বা সাধারণ খেলাধুলার মাঠে। এখানে মাহফিল দেওয়া গেলে, ঈদের নামাজ কেন নয়? ঈদের নামাজের জন্য আলাদা জায়গা কেন? যুক্তি দেখানো হচ্ছে, এসব খোলা জায়গায় ছাগল-গরু, শিয়াল-কুকুর বিচরণ করে, এদের মল-মূত্রসহ বিভিন্ন ধরনের নাপাকি থাকতে পারে। তাই শুধুমাত্র ঈদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা স্থান তথা ঈদগাহ! খাসা যুক্তি! তবে অসার। এর উত্তর Ñ (১) ঈদের সপ্তাহ খানেক আগে জায়গাটা পরিষ্কার করে নিন। প্রকাশ্য নাপাকি না থাকলে জমীন পাক, মাটি পাক। উল্লেখ্য, পবিত্রতা হাসিলের জন্য মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করা হয়। (২) নবী (সঃ) যে ময়দানে ঈদের সলাত আদায় করেছেন, সেখানে সারা বছর উট, ভেড়া, দুম্বা, ছাগল ইত্যাদি চরেছে এবং মল-মূত্র ত্যাগ করেছে। (৩) আরাফাতের ময়দান আমাদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। এই ময়দানে হুজুর (সঃ) বিদায়-হজ্জের ভাষণ (ইনিয়ে-বিনিয়ে সুর করে ওয়াজ নয়) দিয়েছেন তাঁর সফরের বাহন ‘কাসওয়া’ নামক উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে। দীর্ঘ সময়ের সফরে উটনীটি কি সেখানে মল-মূত্র ত্যাগ করেনি? তাছাড়া সেখানে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এরও নিজ নিজ বাহন ছিল। স্মর্তব্য, মক্কা-মদীনায় প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে অনেক দর্শনীয় মসজিদ আছে। কিন্তু এমন কোন ঈদগাহ খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ ইসলামে ঈদগাহ নেই; আছে ময়দান, সাধারণ ময়দান, যেখানে ঈদসহ সারা বছর সব ধরনের বৈধ ও স্বাভাবিক নাগরিক-কার্যক্রম চলতে পারে, তাতে বাধা থাকবে না। ইসলামে ‘ঈদগাহ’ বলে যে কিছু নেই, তার সবচে’ বড় প্রমাণ এই, মদীনায় ‘মসজিদে নব্বী’ আছে, কিন্তু ‘ঈদগাহে নব্বী’ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, নবী (সঃ) সারাজীবন ঈদ পড়লেন কোথায়? খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্য Ñ মুসলমানদের হৃদ্যতা, ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও একতার বন্ধনকে জনসমক্ষে তুলে ধরা। সেমতে পাড়ায় পাড়ায় সম্প্রদায়ভিত্তিক ছোট ছোট ‘সাম্প্রদায়িক ঈদগাহ’ নির্মাণ না করে, এলাকার সবচে’ বড় উন্মুক্ত ময়দান, যেখানে বার্ষিক মাহফিল দেওয়া হয় বা জনসভা করা হয়, সেই জায়গাটিকে ঈদের নামাজ আদায়ের উপযুক্ত করে গড়ে তুলে বা প্রস্তুত করে সবাই মিলে একসাথে বড় জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করা উচিত। এটাই তো ঈদ-সম্মিলনের প্রকৃত ও আসল দাবী। সম্প্রদায়-বিশেষের মধ্যে নিতান্ত বনিবনা না হলে বা ময়দানের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে কিংবা সবাই একই সময়ে হাজির হতে না পারলে, একই ময়দানে আগ-পিছ জামাতও করা যায়। এক্ষেত্রে পূর্বের ঈদগাহ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। কারণ তা জরুরী নয় এবং মসজিদ সংরক্ষণ বিষয়ক মাসয়ালা প্রচলিত ঈদগাহের জন্য প্রযোজ্য নয়। ঈদগাহ একটা সাধারণ ময়দান ছাড়া আর কিছুই নয়, না অতি পবিত্র স্থান। আজ যেখানে ঈদগাহ আছে, কাল সেখানে নাও থাকতে পারে। সেখানে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, কলকারখানা, বাজার, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বহু কিছু গড়ে উঠতে পারে।
ঈদগাহ পাকা করা ঃ বৃক্ষরোপণ নিছক একটি সামাজিক কাজ নয়, তারচে’ বেশি ইসলামী কর্তব্য-বিশেষ। মানবদরদী পরিবেশবাদী নবী (সঃ) বলেন, ‘যদি তুমি নিশ্চিত হও যে, আগামী কাল কিয়ামত, তবুও তুমি একটা গাছ লাগাও।’ এছাড়া কেউ কোন গাছ লাগালে, এর ফল-ছায়া দ্বারা মানুষ বা পশুপাখি উপকৃত হলে কিংবা ফল ইত্যাদি চোরে চুরি করে নিয়ে গেলেও, এ সমুদয় আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার সমতুল্য সওয়াব তার আমলনামায় লিখে দেওয়া হয়। এ ধারা যতদিন অব্যাহত থাকে, ততদিন, এমন কি মৃত্যুর পরও সে সদকায়ে জারীয়ার সওয়াব পেতে থাকে। এসব হাদীস একত্রিত করলে বোঝা যায়, ইসলাম আমাদেরকে বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে বিশ্বের বৃক্ষায়নে উৎসাহিত করেছে। উদ্দেশ্য Ñ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে বাসযোগ্য পৃথিবী নির্মাণ। পরন্তু একটা কথা হরহামেশা আমাদের মুখে মুখে ফেরে, খুব আওড়াই। তা হচ্ছে Ñ ‘বিনা কারণে গাছের একটা পাতা ছেঁড়াও নিষেধ।’ খুব ভাল কথা! এবার দেখা যাক আমাদের লেকচার ও কর্মের মধ্যে কতটা মিল পাওয়া যায়। (ক) বৃষ্টি-বাদল হলে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করার শরয়ী সুযোগ থাকা, (খ) ময়দানে প্রকাশ্য নাপাকি না থাকলে জমীন পাক, মাটি পাক, কাদাও পাক Ñ ঘোষিত হওয়া, (গ) মাটি যে কোন ধরনের নাপাকি দ্রুত গ্রাস করে ফেলে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তা পাক হয়ে যায়; অপরপক্ষে পাকা জায়গায় নাপাকি পড়লে, তা পাক করা ও হওয়া অনেক বেশি সময় ও শ্রমসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় Ñ অভিজ্ঞতার আলোকে এটা জানা থাকা, (ঘ) আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলে ঘাসের বিছানায় তাদের নামাজ আদায় হওয়া এবং বর্তমানে পলিথিন-জাতীয় উন্নত ও মজবুত বিবিধ প্রকার সফ, যা বিছিয়ে নামাজ পড়লে নীচের কাদা উপরে ওঠার কোন সম্ভাবনাই নেই, বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া যাওয়া সত্ত্বেও, (ঙ) বছরে মাত্র দুই দিন (চ) কয়েক মিনিটের জন্য (ছ) দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ, যা একেবারে ফরজ করে দেওয়া হয়নি, আদায় করার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, ইট-পাথর-সিমেন্টের জমাট আস্তরণ বিছিয়ে ঈদের ময়দান পাকা করে কোটি কোটি ঘাস, কেঁচো, পোকামাকড় ও অনুজীবের কবর রচনা করি। এটাই কি ইসলামের বিধান? বছরে মাত্র দুই দিন আপনার জীবনের কয়েক মিনিটের বিলাসিতার মূল্য কি এতগুলো নিরাপরাধ জীবন? যা উপেক্ষা করা যায়, না হলেও চলে, তাতে এমন কিছু এসে যায় না Ñ এমন অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনে ঘাস বিছানো সবুজ-শ্যামল জীবন্ত মাঠকে খেয়ালে ধ্বংস করে মৃত পাথরের জমীনে পরিণত করতে যখন আমরা কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করি না, তখন কিয়ামত আসন্ন জেনেও গাছ লাগানোর হাদীস তথা নবীর (সঃ) নির্দেশের কতটুকু কিবা মূল্য আছে আমাদের কাছে? আফসোস!
বদ্ধ ঘরের মধ্যে আমার ফুরায় অম্লজান;
মৃত্যু দাঁড়ায় সন্নিকটে, ওষ্ঠাগত প্রাণ!
মুচকি হেসে বাইরে ডাকে দূরের কুঞ্জবন।
মাটির কোলে এসে দেখি অনেক ঘাসের জীবন;
অযুত কেঁচো বলল আমায়, ‘তোমায় স্বাগতম!
শান্তি পাবে মাটির কাছে মোরা বন্ধু উত্তম।’
তাদের পরে ইট বিছিয়ে কে রচিল কবর?
সবুজ-ঢাকা ধরিত্রি চাই, পরিমিত নগর;
নবপ্রাণের স্পন্দন চাই, পেয় পানির নহর;
হতে পারে জীবনবান্ধব প্রজন্মের শহর।
নাইবা দিলে ফিরিয়ে অরণ্য, করলে জমা পাথর;
রাজী তারই মাঝে যদি বসে প্রাণের আসর।