মোদির আমদে কাশ্মীর খন্ডিত-ভারতের ঐতিহ্য ভূলুণ্ঠিত


প্রকাশিত : আগস্ট ১৮, ২০১৯ ||

এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু
আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমারেখা, রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা এবং সাংবিধানিক বিধানাবলী রক্ষা করা-রাষ্ট্রের নাগরিক, রাজনৈতিক সংগঠন, সেনাবাহিনী এবং সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ঐসকল প্রতিষ্ঠান সমূহ, তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব সতর্কতার সঙ্গে পালন করে থাকে। ভারতের বর্তমান সরকার সেই কাজটি করেছেন। ভারতীয় জনতাপার্টি (বিজেপি) দ্বারা গঠিত নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের জম্মু কাশ্মীর নামক প্রদেশটি দ্বি-খ-িত করে, কাশ্মীরের প্রাদেশিক শায়ত্বশাসন এবং অন্যান্য প্রদেশ সমূহের মত আঞ্চলিক সরকার ব্যবস্থা (ভারতের রাজনৈতিক প্রচলিত ভাষায় রাজ্য সরকার) না রেখে, সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীনে নিয়েছেন। বিষয়টি ভারতের আভ্যন্তরীন বিষয় হিসেবে ভারত সরকার প্রচার করছেন। ভারত সরকারের এই প্রচারটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে, ভারতের আভ্যন্তরীন বিষয় হিসেবে দেখা গেলেও, অন্ত:নিহীত একটি আন্তর্জাতিক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
হিমালয় পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই বিশাল অঞ্চলটি তিনটি রাষ্ট্রের দখলে রয়েছে। যেমন-কাশ্মীরের পূর্বাঞ্চল কাশ্মীর ভ্যালি এবং মধ্য কাশ্মীর অঞ্চল জম্মু, ভারতের আবাস ভূমির অন্তর্ভূক্ত। কাশ্মীরের বিশাল পশ্চিম অঞ্চল, যেটি আজাদ কাশ্মীর নামে খ্যাত, সেই অঞ্চলটি পাকিস্থানের আবাসভূমির অন্তর্ভূক্ত। কাশ্মীরের উত্তর অঞ্চল (পর্বত এলাকা) আকসাই চীন, চীন প্রজাতন্ত্রের আবাসভূমির অন্তর্ভূক্ত। এই বিশাল অঞ্চলটি নিয়ে, কাশ্মীর উপত্যাকা নামে খ্যাত অঞ্চলটি, বিটিশ শাসন থেকে (হিন্দুস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) ইন্ডিয়া স্বাধীনতা লাভের সূচনা লগ্ন থেকে, বিরোধের এক পর্যায়ে কাশ্মীর উপত্যাকা তিনটি দেশের ভৌগলিক সীমানার মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।
বিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে সৃষ্ট দ্বি-জাতি তত্ত্বের (হিন্দু, মুসলিম) ভিত্তিতে হিন্দু, মুসলিম সংঘাত, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দলের দাবীর প্রেক্ষিতে, বিটিশ সরকার হিন্দুস্তান, পাকিস্তান বিভাজনে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, কাশ্মীর উপত্যকা, পাঞ্জাব এবং বাংলা এলাকায় গণভোটের (রেফারেন্ডাম) মাধ্যমে ঐ অঞ্চল সমূহের নাগরিকদের দেশ বাছাইয়ের অধিকার প্রদান করেছিলেন। যে অধিকারের ভিত্তিতে কাশ্মীর উপত্যাকার পশ্চিম অঞ্চলের জনগন, পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিন্তু ভারতীয় কংগ্রেস সে সময় কংগ্রেস নেতা মাওঃ আবুল কালাম আজাদ, শেখ আব্দুল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার ওছমান সহ অসংখ্য মুসলমান বিজ্ঞজনকে বিশেষ সুযোগ সুবিধা এবং জাতিগত ভাষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মাতৃভাষা, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, শায়ত্বশাসন এবং নিজস্ব পতাকা (ঝান্ডা) ব্যবহারের অধিকার প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করার কারনে, নিরঙ্কুষ মুসলিম অধিষ্টিত কাশ্মীর ভ্যালি ও জম্মু কাশ্মীর ভারতের সাথে সম্পৃক্ত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যার কারনে, আজকের ভারত শাসিত কাশ্মীর (কাশ্মীর ভেলি ও জম্মু কাশ্মীর) ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাও. আবুল কালাম আজাদ, কাশ্মীরের অবিসংবাাদিত নেতা শেখ আব্দুল্লাহ, পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি হেদায়েত উল্লাহ, পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার ওছমানসহ মুসলমান নেতৃবৃন্দের সাথে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ (কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ) সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, স্বাধীন ভারতের সংবিধানে (৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখের পূর্ব পর্যন্ত, অদ্যাবধি যা বিদ্যমান) আলোচ্য ৩৭০ ধারা উল্লেখ করে, ভারতের সংবিধান রচয়িতা, বিশ্বখ্যাত পন্ডিত, আইনবীদ এবং মানবতাবাদী উদার মনা দেশপ্রেমী রাজনীতিক, স্বর্গীয় বি.আর অম্বেদ কর, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গীরি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরুসহ সারা ভারতের বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীগণ সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সর্ব ভারতীয় সকল রাজনৈতিক দল, সারা ভারতের সমস্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এবং সেই সকল দলের নেতৃবৃন্দ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, অঞ্চল ভেদে সকল মানুষ, মহান ভারতের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি প্রশংসা ও সমর্থন ও অনুমোদন করে, আজকের অখন্ড ভারতকে হৃদয়ে ধারন ও পালন করে আসছে। সে কারণেই বিষয়টি ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারায় সন্নিবেশিত হয়ে আছে।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার ক্ষমতাবলে, কাশ্মীরের বাইরের কোন নাগরিক, কাশ্মীরের সম্পত্তি খরিদ করিয়া মালিক হতে পারে না এবং কাশ্মীরের বাসিন্দা হতে পারে না। সারা ভারতের কোন নাগরিক, কাশ্মীরে প্রবেশের প্রাক্কালে উল্লেখিত সময় সীমার উর্দ্ধকাল কাশ্মীরে অবস্থান করতে পারে না। কাশ্মীরের প্রতিটি নাগরিকের সন্তানেরা ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি পর্যন্ত, সরকারি সহযোগিতায় লেখাপড়া করার অধিকার পায়, বরফ বিস্তৃত কাশ্মীরি নাগরিক মণ প্রতি পাঁচ টাকা দরে কয়লা প্রাপ্ত হয়। মণ প্রতি আশি টাকা দরে চাল প্রাপ্ত হয়। কাশ্মীর ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, জম্মু ও কাশ্মীর নামক প্রদেশটি, নিজস্ব (স্বতন্ত্র) পতাকা ব্যবহার করে থাকে। ভারতের ২৯টি প্রদেশের মধ্যে, ২৮টি প্রদেশ বাদে, একটি প্রদেশ, ‘জম্মু ও কাশ্মীর’ স্বায়ত্ব শাসন ভোগ করে থাকে।
জাতীয় ইস্যু অথবা আন্তর্জাতিক চক্রান্তে ইতিপূর্বে জম্মু ও কাশ্মীরের দখল গ্রহণ বা, দখলে রাখার বিষয় নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে, দীর্ঘ প্রায় বাহাত্তর বছর ধরে, নরম, গরম টানাপোড়েন বিদ্যমান। তিন তিন বার ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছে। জম্মু কাশ্মীরের জনগণ ও প্রাদেশিক সরকার প্রতিবারই ভারতের সাথেই থাকার সদ ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ঐসময়কার ভারত সরকার, নেহেরু, লালবাহাদুর শাস্ত্রী এবং ইন্দ্রগান্ধী সরকার বরাবরই ভারতের মহান সংবিধানের ৩৭০ ধারার ক্ষমতাবলে জম্মু কাশ্মীরের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন। কখনই জম্মু কাশ্মীরকে ঐ অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন নাই।
বর্তমান উগ্র হিন্দু মৌলবাদী (বি.জে.পি) ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা, নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন গঠিত সরকার, ভারতের সংবিধানের সেই ৩৭০ ধারা রদ রহিত করে, ভারতের পার্লামেন্ট, লোক সভা ও রাজ্য সভা উভয় কক্ষে (উচ্চ কক্ষ ও নি¤œ কক্ষ) আইন পাস করে, জম্মু কাশ্মীরকে দ্বি-খন্ডিত করে, প্রাদেশিক স্বায়ত্ব শাসন ও প্রাদেশিক সরকার অধিকার খর্বকরে, সকল সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত করে, কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে, জম্মু কাশ্মীরের পুরা জনগনের দ্বিগুন সেনা মোতায়েন করে, সারা পৃথিবীর থেকে, জম্মু কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করে, যে অমানবিক আচারন করছে, সেটি জগৎবাসীর দৃষ্টির অগোচরে- ‘জাতিগত’ নিধন প্রক্রিয়ার সমান কি না? বিষয়টি সমগ্র পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর বিবেচনায় আনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
লালকৃষ্ণ আদভানী, অটল বিহারী বাজপায়ী, মূরারী মনোহর যোশী, সুষমা স্বরাজসহ কিছুসংখ্যক ভারতীয় রাজনীতিক, উগ্র মৌলবাদী (কট্টর হিন্দুত্ববাদী) আদর্শ নিয়ে, ভারতে যখন, ভারতীয় জনতা পার্টি নামক রাজনৈতিক দলটি গঠন করেছিলেন, সেসময় ঐ রাজনৈতিক দলের ঘোষনাপত্রে কাশ্মীর ইস্যু ছিলো না। সে সময় তাদের ঘোষনা ছিলো, ভারতকে রামরাজ্য হিসাবে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষনা করা, ভারতের ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ভেঙে তদস্থলে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। তাতে ভারতীয় জনতা পার্টির সাথে যোগ দিয়েছিলো, বালঠেকারে এর নেতৃত্বাধীন উগ্র মৌলবাদী সংগঠন ‘শিবসেনা’ এবং ‘বজরং পার্টি’। পরবর্তীতে আঞ্চলিক কতকগুলি রাজনৈতিক দল যেমন, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা তেলেগুদেশম, দলিতমজদুর কৃষাণ পার্টি, ভারতীয় দলিতমজদুর পার্টি সমূহের নেতা, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী, বিহারের লালু প্রসাদ যাদব, তামিলনাডুর জয়ললীতা, অন্ধ্র প্রদেশের নায়ক নেতা, এবং কর্ণাটকের স্বদেশ যাদবগণ নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে, দলীয় নীতি আদর্শ উপেক্ষা করে, জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে, ভারতীয় জনতাপার্টির সাথে জোটগঠণ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করলেও, কট্টরপন্থী লাল কৃষ্ণ অ্যাডভানীকে সরকার প্রধান না করে, মধ্যপন্থী অটল বিহারী বাজপায়ীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ায়, বিজেপি কাক্সিক্ষত কর্মকান্ড সংগঠিত করতে পারে নি।
আঞ্চলিক রাজনীতিক, গুজরাটের মূখ্য মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (বর্তমান প্রধান মন্ত্রী) জাতীয় নেতৃত্ব অর্জন করে, বি.জে.পি এর প্রধান হিসাবে সরকার গঠন করে, পাঁচ বছর বিজেপি এর মূল লক্ষ্য থেকে নাটকীয়ভাবে অমনোযোগী থেকে, সারা ভারতে সর্বস্তরের জনগনের আস্থা অর্জন করে এবং ভারতের মত দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রনে নিয়ে, এবারের নির্বাচনে আশাতীত ভাবে জয়লাভ করে, দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করে, নিজের ও নিজ দলের আসল চেহারা উন্মোচন করে, ‘নরেন্দ্র মোদী আমোদে জম্মু কাশ্মীরকে করেছে খন্ডিত’, কিন্তু তিনি হয়তো বা জানেন না যে, তার এই আচারণে ‘ভারতের মহান সংবিধানে রক্ষিত নাগরিক অধিকার হয়েছে ভূলুণ্ঠিত’ এবং সারা পৃথিবীর কাছে বিষয়টি এত বেশি বেদনার, ‘যে ব্যাথা ও বেদনায় পৃথিবীর সকল জাতি ও জনগোষ্ঠি হয়েছে লজ্জিত’।
আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কাছে ধরা খেয়ে, এক সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, ‘গর্ভাসেভ’ নোবেল পুরস্কার খেয়ে, খুশিতে গদ গদ হয়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল প্রতিরক্ষা তথ্য ফাস করে, এক সময়ের বিশ্বের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নকে খন্ডে-খন্ডে বিভক্ত করে, সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীকে ধ্বংশ করে, পৃথিবীর বুকে আমেরিকা সা¤্রাজ্যবাদের একক কতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি ভাবে, নরেন্দ্র মোদি সা¤্রাজ্যবাদের মদদে জম্মু কাশ্মীরকে খন্ডিত করে, সারা পৃথিবীর কাছে ভারতের ঐতিহ্য ম্লান করে, অখন্ড ভারতের জন্য প্রতিবেশী চীন ও আমেরিকা সা¤্রাজ্যবাদের ব্যথার কারণ, বিশাল ভারতবর্ষকে খন্ডে-খন্ডে, খন্ডিত করার সূচনা করে দিলেন নাতো?।