খোলা কলাম: প্রসঙ্গ: ১৫ ও ২১ আগস্ট হত্যাকান্ড


প্রকাশিত : আগস্ট ২১, ২০১৯ ||

অধ্যাপক রাজু আহমেদ:
হত্যার রাজনীতি কখনো কোনো দিন ভালো কিছু বয়ে আনে না। রাষ্ট্র ক্ষমতার সাধ পাওয়ার জন্য হত্যার রাজনীতি চালু হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আমাদের এ দেশে। বিপথগামীরাই এই হত্যাকন্ডের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে লোভ লালসায় পড়ে। কিন্তু এ কাজের পরিণাম যে সুখকর হয় না, ঘটনা ঘটানোর সময় সে বোধদ্বয় তাদের ঘটে না।
পৃথিবী তথা মানব মন্ডলীর যিনি মহান ¯্রষ্টা তিনি নিজেই হত্যাকান্ড যে একটা জঘন্যতম অপরাধ সে ব্যাপারে সাথে সাথে তার শাস্তির সতর্কতা করে দিয়ে বলেছেন, ‘যদি কেউ বিনা কারণে একজন মানুষকে হত্যা করে তাহলে সে যেন সকল মানব মন্ডলীকে হত্যা করল এবং তার পরিণাম হবে জাহান্নাম।’ জীবন দান করেছেন যিনি জীবন নেয়ার মালিকও তিনি। যেহেতু মানুষ মানুষকে জীবন দান করতে পারে না। সেহেতু মানুষ মানুষকে হত্যাও করতে পারে না। অর্থাৎ জীবন নিতেও পারে না।
৩টি বিষয় যদি মানুষ মনে রাখতো তাহলে তার দ্বারা কখনো হত্যা, খুন, গুম তো দূরের কথা কোন প্রকার অপরাধ তার দ্বারা সম্ভব হতো না। বিষয় তিনটি হলো: (এক) মহান স্রষ্টা আমাকে সব সময় দেখছেন অর্থাৎ আমি তার দৃষ্টির বাইরে নই। (দুই) ন্যায় অন্যায় যে কাজ আমার দ্বারা সংঘঠিত হোক না কেন ন্যায়ের জন্য সওয়াব বা পুরস্কার আর অন্যায়ের জন্য গোনাহ বা শাস্তি লেখা হচ্ছে। আর (তিন) মৃত্যু সব সময় আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমি কখনই মৃত্যু দূতের আওতার বাইরে নই। যে কোন সময় আমার জীবন তার হাতের মুঠোয় চলে যেতে পারে।
আমি আমার লেখার শুরুতেই বলেছি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াবহ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়। বাংলাদেশের স্থপতি যার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশ চুম্বী, মুক্তিকামী মানুষের নেতা, লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন তার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সেই অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের ১৭ জন সদস্যকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। হত্যাকারীরা কতটা পাষন্ড যে শিশু রাসেলকেও তারা ছাড়েনি। শিশু রাসেল সেদিন বলেছিল, আমার মা কোথায়। আমি মায়ের কাছে যাবো। তারা বলেছিল, আয় তোকে তোর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেই এবং সেই ছোট্ট শিশু রাসেলকেও গুলি করে হত্যা করে। তারা এ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মনে করেছিল বঙ্গবন্ধু পরিবার শেষ। আর কেউ নেই। রাষ্ট্র ক্ষমতা আমরা পরিচালিত করবো। এই হত্যাকন্ডের ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতাকেও তারা হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভাগ্যক্রমে সেখানে ছিলেন না বলেই তারা দুজন প্রাণে বেঁচে যান। তা না হলে হত্যাকারীরা তাদের দুজনকেও নির্মমভাবে হত্যা করতো তাদের সাথে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাদের এই নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্যেও যেন অপূর্ণতা ছিল। এ কারণে তারা আবার বেছে নেয় ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। তারা মাস হিসেবে আগস্টকেই বেছে নেয়। এ কারণে ২১ আগস্ট তারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড ছোড়ে। আল্পের জন্য তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর একটি চোখ ও একটি কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হয়। আর ৩০০ জনের মতো আহত হয়। প্রাণে বাঁচলেও অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা নিঃসন্দেহে এটি ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। স্বাধীনতার মাত্র ৩ বছরের মাথায় এ হত্যাকান্ড ঘটানো কখনোই সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক এ দেশের কিছু মানুষ যেমন চায়নি, তেমনি কিছু দেশও তারা চায়নি। এ কারণে তাদের অন্তর জ্বালা ছিল। এই অন্তর জ্বালা মিটাবার জন্য তারা সম্মিলিতভাবে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টকে বেছে নেয় এবং এ নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায়।
ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সেদিন যদি বিদেশ না থাকতেন তাহলে তাদের হাত থেকে তারা রেহাই পেত না।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ২৯ বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে অনেক বাঁধা পেরিয়ে যখন প্রথমবার শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসিন হলো, এই ক্ষমতায় আসাটা তারা মেনে নিতেই পারেনি। তারা ধরেই নিয়েছিল যে আওয়ামী লীগ আর কখনো এদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাদের ধারনা ভুলে পরিণত হলো। এ কারণে তারা পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট আর একবার হত্যাকান্ডর মতো জগণ্যতম ঘটনা ঘটালো। এবারো ভাগ্যের জোরে শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেন।
বাংলাদেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বারংবার জীবন নাশের ঝুঁকিতে পড়েছেন। কিন্তু কখনো ভীত হননি। কখনো দমে যাননি। বঙ্গবন্ধু যেমন পাহাড়সহ নেতা তাঁর নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা যেমন তেমিন তার যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও তার পিতার মতোই। নেতৃত্বের গুণাবলী তার ধমনীতে বহমান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথচলা, কেননা তার জন্য এদেশের রাজনীতি কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ছিল কন্টকাকির্ণ, রক্ত পিচ্ছিল। নিঃশেষ হয়ে যাওয়া দলকে তিনি বলিষ্ট নেতৃত্বে এগিয়ে নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন। নেতৃত্বের বলিষ্টতার কতটা প্রবল হলে পরে এটা সম্ভব তা চিন্তার বিষয় নয় কি? শোককে শক্তিতে পরিণত করে, ভয়কে জয় করেই প্রতিনিয়ত পথ চলতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
প্রকাশ্যে জনসভায় এতো বড়ো গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে নি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটা কখনো সম্ভবও নয়। এটা ইতিহাস। এই ইতিহাস নির্মমতার ইতিহাস। এখনো আমরা বর্তমান প্রজন্ম সেই নির্মম ইতিহাসের দৃশ্য দেখি টিবির পর্দায়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে রাজপথে অস্থায়ী মঞ্চে শেখ হাসিনাসহ নেতৃবৃন্দ। জনসভা শেষ হওয়ার প্রাক্কালেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। এ হামলায় ঝড়ে পড়ল ২৪টি প্রাণ, রক্তে রঞ্চিত হলো রাজপথ। সর্বত্র হাহাকার ! বাঁচাও! বাঁচাও আত্মনাদ। আকাশ-বাতাস ভারী হলো আর্তনাদে। জীবনে বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করলো শত শত নেতাকর্মী। সাজানো হলো জজ মিয়া নাটক। বিচারের নামে প্রহসন জাতি দেখেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের ১৭ জন সদস্যের নির্মম হত্যা কান্ডের যেমন বিচার হয়েছে। ৪০/৪২ বছর পরে এসে যখন জাতি বিচার পেয়েছে। জতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলো আজ জাতি বিচার দেখতে চায়। জাতি এই কলঙ্কও মুক্ত হতে চায়। কেননা ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট যে হত্যাকান্ড ২০০৪ এর ২১ আগস্ট এর হত্যাকান্ড একই সূত্রে গাঁথা এই দুই হত্যাকান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট দুই অপশক্তি নিঃসন্দেহে একই। লেখক: অধ্যাপক, সখিপুর, দেবহাটা