কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কার হোক বৃক্ষের চারা


প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০১৯ ||

মোঃ আবদুর রহমান:
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৃক্ষ মানুষের নিত্য সঙ্গী। এদের ছাড়া মানব জীবন অচল। বৃক্ষ বা গাছ প্রতিনিয়ত মানব কল্যান বয়ে আনছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, আসবাবপত্র, কৃষি যন্ত্রপাতি, ওষুধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ছায়া, জ্বালানি কাঠ প্রভৃতির যোগান দিতে গাছপালার জুড়ি নেই। বন্যা, খরা, ঝড়, ঝঞ্ছা থেকে রক্ষা করা, ভুমি ক্ষয়রোধ, মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়াতে গাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অন্যান্য জীবজন্তু বিশেষ করে পশু পাখিরও আশ্রয় স্থল হচ্ছে গাছপালা। কাঠ ও ছায়াদান ছাড়াও সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর ফল পেতে ফল গাছের গুরুত্ব অপরিসীম।
গাছ আমাদের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখতে সাহায্য করে থাকে। বস্তুত ঃ জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সুস্থ ও নির্মল রাখতে বৃক্ষের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এককথায়, খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্মল পরিবেশ তথা দেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধি করে তুলতে বৃক্ষের কোন বিকল্প নেই। তাই আজকের শ্লোগান হচ্ছে ঃ ‘বন বিজন পাখির কুজন/ সবুজ সুন্দর দেশ/ খাদ্যের সম্ভার স্বাস্থ্যের বাহার / নির্মল পরিবেশ।’
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কোন দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার মোট ভূÑখণ্ডের অন্ততঃ শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ শতকরা ৯.০ ভাগ মাত্র। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ব্যাপকহারে গাছপালা কাটা হচ্ছে। কিন্তু সে হারে বৃক্ষরোপণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। ফলে গাছপালার ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গাছপালা জাতীয় দ্রব্যের অভাব ঘটছে, অপরদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বৃক্ষরাজির অভাবে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বন্যা, খরা, উপকূলীয় অঞ্চলে সিডর, আইলা ও মহাসেনের মতো মারাত্মক সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, লবনাক্ততা, ভূমিক্ষয়, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস, আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধিসহ উত্তরাঞ্চলের মরু বিস্তারের আশংকা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতির মোকাবেলায় সত্যিকারের দেশপ্রেমের মনোভাব নিয়ে প্রতিটি নাগরিককে অধিক বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বভার হাতে নিতে হবে।
আশার কথা, বৃক্ষ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে জাতীয়ভাবে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কাজেই নিজের প্রয়োজন ও জাতীয়স্বার্থে এবং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় সকলকেই বেশি করে বৃক্ষরোপণ ও তা সংরক্ষণের কাজে ব্রতী হতে হবে। বর্ষাকাল বৃক্ষের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। এ সময় বসতবাড়ির আশেপাশে, পতিত জায়গায়, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পাশে, খাল/নদীর ধারে, রেললাইন ও বাঁধের পাশে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস আদালত, কল-কারখানা, মসজিদ, মন্দির এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণে যেখানেই খালি জায়গা রয়েছে সেখানেই বিভিন্ন প্রকার বনজ, ফলদ এবং ওষুধি গাছের চারা রোপণ করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা আমার ও আপনার জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।
প্রসংগত উল্লেখ্য, আমাদের দেশে প্রতি বছর এস,এস,সি ও এইচ, এস,সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কৃতি বিশেষ করে এ প্লাস প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কার প্রদান করে উৎসাহিত করা হয়। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রচলিত পুরস্কারের সাথে ফলদ, বনজ বা ওষুধি কিংবা ফুলের চারা সংযোজন করলে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে একটি বাস্তবমুখী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ সূচিত হয়। একজন সম্মানিত ব্যক্তির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত বৃক্ষের চারা ছাত্র-ছাত্রীকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করবে। এতে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মনে বৃক্ষের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হবে এবং তারা বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা সহকারে এসব শিশু বৃক্ষকে যতœ ও পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তুলতে পারবে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশে বৃক্ষ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, অপরদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে এসব গাছপালা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। অধিকন্তু, ফলদ গাছ থেকে উৎপাদিত ফল ছাত্র-ছাত্রীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। রোপিত বৃক্ষ বসতবাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া বহু বছর ধরে এসব বৃক্ষ ছাত্র-ছাত্রীদের অতীত শিক্ষা জীবনের প্রতি সাফল্যের মধুর স্মৃতি বহন করবে। তাই জাতীয় স্বার্থে ও দেশের কল্যাণে কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কার হিসেবে ফলদ, বনজ বা ওষুধি কিংবা ফুলের চারা/কলম বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা।