টাউন শ্রীপুর মিউনিসিপ্যালিটি বিল্ডিং ও কাজী নজরুল ইসলাম


প্রকাশিত : আগস্ট ২৪, ২০১৯ ||

মো. জাহিদুর রহমান:
এক.
বাংলাদেশের বহি:প্রকৃতি ও অন্ত:প্রকৃতি যেসব কালোত্তর কবি-সাহিত্যিকের লেখায় সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে, কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) তাঁদের অন্যতম। কবির জন্ম ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গলপ্রেসিডেন্সির বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার (জামুরিয়া থানা) চুরুলিয়া গ্রামে। আর জীবনাবসান ব্রিটিশ ও পাঞ্জাব থেকে মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। ১৯১৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪২ সালে অসুস্থ অবস্থার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর ২৩ বছরের সক্রিয় সাধনায় সমৃদ্ধ বাংলাভাষার সাহিত্য ভান্ডার।
কবির জন্মস্থান প্রাচীন রাঢ় জনপদের অন্তর্গত বর্ধমান যেটা লালমাটি আর কাঁকরের দেশ, যেখানে সবুজ-শ্যামলিমার দূরন্ত আহবান নেই, ¯েœহ নেই, উদ্দামতা নেই, সৃজনীর ধারা নেই। আছে ধূসর রুক্ষ প্রকৃতি, বন্ধ্যা প্রান্তর। তাইতো সচল, সজল, অপরূপা বাংলাদেশ কবিকে আর্কষিত করেছে বারবার। কবির ভাষায়Ñ‘বাংলাদেশের মাটির, নদীর, বনানীর শ্যামলিমা মমতা-মাখা। অন্য কোনো দেশ এতো মায়াময় লাগে না আমার কাছে।’ বাংলার পলিমাটি যা কবিকে আকর্ষণ করেছে, যেখানে আছে আবেগ, উচ্ছ্বাস, সংগ্রামী জীবন। মোহময় প্রকৃতি ও প্রকৃতির রুদ্ররোষ আছে, আছে ক্লেশ আর ভালোবাসার নদী। বাংলার মাটি, মানুষ আর ভালোবাসার আহবান কবিকে এখানে, এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে টেনে এনেছে বারবার।
ময়মনসিংহের দরিরামপুরে আগমনের মধ্য দিয়ে কিশোর নজরুলের সেই প্রথম বাংলাদেশ দেখা। তারপর স্বভাব-ভবঘুরে এই কবি ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার বিভিন্ন প্রান্তর। ১৯১৪ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ বার তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন, ঘুরেছেন বিভিন্ন জায়গায়। এসেছেন আমন্ত্রণে কিংবা আমন্ত্রণ ছাড়াই। মিশেছেন, মিলেছেন বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে। সংগত কারণেই তাঁর বিচিত্র ও বর্ণিল জীবনপ্রবাহে একটি অনিবার্য অধ্যায় হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। নিরন্তর ভালোলাগা ও ভালোবাসার এই বাংলাদেশ কাজী নজরুল ইসলামকে উপস্থাপন করেছে নবতর উত্তরণে। তিনি অভিষিক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি অভিধায়।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদের কোথায় কতবার এসেছেন, কতদিন থেকেছেন তার কোনো অনুপুঙ্খ হিসেব নেই। তবে কবির স্মৃতিধন্য বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও দরিরামপুর, কুমিল্লার কান্দিরপাড় ও দৌলতপুর, রংপুরের হারাগাছ, কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর, মাদারিপুর, রাজবাড়ির পাংশা, ফেনী, বাগেরহাট, খুলনার দৌলতপুর, সিলেট, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামের রাউজান ও সন্দ্বীপ, কুষ্টিয়ার কুমারখালি, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, বরিশাল, চাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা আর সাতক্ষীরার টাউনশ্রীপুর উল্লেখযোগ্য।
দুই.
সাবেক ২৪ পরগণা জেলার অংশ বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ভূ-খন্ডটি ঔপনিবেশিক বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে অনেক কাছেই অবস্থিত। নানা প্রয়োজনে, পেশায় ও কর্মে এখানকার মানুষ কলকাতায় অবস্থান করতেন। এমন অনেক কৃতি মানুষ, যাদের সাথে কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। তন্মধ্যে সওগাত সাহিত্য আসরের প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মখদূমী লাইব্রেরি অ্যান্ড এম্পায়ার বুক হাউজ’-এর স্বত্ত্বাধিকারী খান বাহাদুর মোবারক আলী, রাজনীতিক- ডেপুটি স্পিকার সৈয়দ জালালউদ্দীন হাশেমী, গীতিকার ও সুরকার শেখ লুতফর রহমান, গ্রামোফোন কোম্পানিতে সহকর্মী রথীন সরকার এবং নবযুগ পত্রিকার ২য় পর্যায়ে তাঁর সম্পাদনা সহযোগী সিকান্দার আবু জাফরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বন্ধুত্বের সুবাদে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছেন সাতক্ষীরার মাটিতে। বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের টাকী সংলগ্ন ইছামতি নদীর পূর্ব পারে নজরুল স্মৃতিধন্য সাতক্ষীরার সেই জনপদটির নাম ‘টাউনশ্রীপুর’। ঐতিহাসিক এই জনপদটির পরিচয় উল্লেখ করে বলা যায়, ব্রিটিশ শাসিত বাংলার খুলনা সাব-ডিভিশনে ১৮৬৭ সালে ‘মিউনিসিপ্যালিটি’ বা পৌরসভা হিসেবে টাউনশ্রীপুরের গোড়াপত্তন হয়। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায়, কলকাতার সাবেক মেয়র প্রীতি কুমার রায় চৌধুরী, ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান শংকর রায় চৌধুরী, বিখ্যাত মিনার্ভা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্র নাথ সরকার, লক্ষীবিলাস তেলের আবিষ্কারক দত্ত বাবু, কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী শরচ্চন্দ্র বাবুসহ অনেক গুণিজনের পৈত্রিক নিবাস এই টাউনশ্রীপুর। ভারত বিভক্তির পর হিন্দু প্রধান এ অঞ্চলের অসংখ্য লোকজন ও জমিদারগণ দেশত্যাগ করেন। অত:পর ১৯৫২ সালে এই পৌরসভার বিলুপ্তি ঘটে।
১৯২৯ সালের শুরুর দিকে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানি ‘এইচ এম ভি’র সাথে যুক্ত হন। তিনি কোম্পানির ‘হেড কম্পোজার’ পদে নিযুক্ত ছিলেন। ওস্তাদ জমীরুদ্দীন খাঁ ছিলেন তখন কোম্পানির ‘হেড ট্রেইনার’। কলকাতার বিডন স্কয়ারের কাছে চিৎপুর রোড সংলগ্ন ‘বিষ্ণুভবন’ ছিলো গ্রামোফোন ক্লাবের আড্ডাস্থল। এখানে চলতো আড্ডার মজলিশ, দাবা খেলার আসর আর গানের জলসা। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এ আড্ডার মধ্যমণি। আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন আঙুর বালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, কমলা ঝরিয়া, ধীরেন দাস, আশ্চর্যময়ী, অণিমা, বীণাপাণি,কমল দাশগুপ্ত, মৃণালকান্তি ঘোষ, কে. মল্লিক, হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, যুথিকা রায়, জ্ঞান গোঁসাই, রণজিৎ রায়, বীণা চৌধুরী, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীগণ। এই গ্রামোফোন কোম্পানিতে চাকুরি করতেন সাতক্ষীরার টাউন শ্রীপুর নিবাসী বাবু রথীন সরকার। রথীন সরকারের প্রচেষ্টাতে স্থানীয় একটি সংঘের আয়োজনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে টাউনশ্রীপুরে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। ২দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের ১ম দিনের আয়োজনে ছিলো বিখ্যাত অভিনেতা শ্রী অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত একটি নাটক এবং ২য় দিনে গানের জলসা। কাজী নজরুল ইসলামের সফরসঙ্গী শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন কে. মল্লিক (মহম্মদ কাসেম), বরদা গুপ্ত ও সারদা গুপ্ত। টাউনশ্রীপুর ভ্রমণের স্মৃতি রোমন্থন করে শিল্পী সারদা গুপ্ত লিখেছেনÑ
‘কাজীদা আর কে.মল্লিক সাহেবের গান প্রথম দিকেই গাওয়া হয়ে গেল। ওঁরা গান গেয়ে চলে গেলেন। আমাদের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া ঘরে গিয়ে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লেন দু’জনে। আমরা যখন গান গেয়ে ফিরলাম তখন গভীর রাত। ঘরে ঢুকে দেখি মল্লিক সাহেব তাঁর নিজের মশারির মধ্যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আছেন। আর কাজীদা তাঁর মশারির মধ্যে চুপচাপ বসে আছেন। ঘরে আলো জ্বলছে।
আমাকে দেখেই কাজীদা বলে উঠলেন,‘ কিরে সারদা, গান গাওয়া হয়ে গেল’?
বললাম, হ্যাঁ কাজীদা। কিন্তু আপনি মশারির মধ্যে বসে কেন; ঘুমাননি ?
‘ঘুমোবো কি, বসে বসে মশার জলসা শুনছি!’
মশারির মধ্যে মশা কি করে ঢুকলো কাজীদা ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
কাজীদা বললেন,‘জানিস না বুঝি? শোন তাহলে বলিÑ এই বলে কাজীদা বেশ মজা করে বলতে শুরু করলেন, ‘দ্যাখ মশারির এই যে ছোট ছোট ছেঁদাগুলো দেখছিস না, এই ছেঁদার মধ্য দিয়েই এক একটি করে মশাকে তার দলের অন্য মশারা ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। হাত-পা টানটান করে একটি মশা ছেঁদার মুখে আসছে, আর তার অন্য বন্ধুরা পেছন থেকে হেঁইয়ো হো করে ঠ্যালা দিয়ে তাঁকে মশারির ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই করে একটার পর একটা দলকে দল ওরা ভেতরে ঢুকে পড়ছে। আর শুধু কি ভেতরে ঢুকে কামড়াচ্ছে কেবল ? কানের কাছে এমন গান জুড়ে দিয়েছে যে, চুপচাপ চোখ বুজে ঘুমোয় কার সাধ্য! আমাদের কলকাতাতেও মশা আছে, কিন্তু সে এ্যারিস্টোক্রাট মশা, শহুরে মশা। আর রথীনের দেশের এই মশাগুলোর কোন লাজলজ্জা বলতে নেইÑ কামড়াচ্ছে আবার নির্লজ্জের মতো গান গাইছে’।’
সারদা গুপ্তের বর্ণনার অংশবিশেষ থেকে প্রতীয়মান হয় কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গীদের টাউনশ্রীপুর ভ্রমণ ছিলো আনন্দমূখর। তাঁর এই আগমনের মধ্য দিয়ে টাউন শ্রীপুর হয়ে উঠলো বাংলাদেশের একটি অন্যতম নজরুল তীর্থ স্থান। কাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরার টাউনশ্রীপুরে এসেছেন, ধন্য সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষ। তাঁর আগমন সাতক্ষীরার সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মীদের জন্যেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের খবর বৈকি।
তথ্যসূত্র:
১). নজরুল ও বাংলাদেশ, আলী হোসেন চৌধুরী, অক্টোবর-২০০০, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।
২). সাতক্ষীরা জেলার ইতিহাস, মোঃ আবুল হোসেন, এপ্রিল-২০০১, কাকলী প্রেস, খুলনা।
৩). শতকথায় নজরুল, সম্পাদনা- কল্যাণী কাজী, ১৪০৫, সাহিত্যম, কলকাতা।
৪). কোরক (বইমেলা সংখ্যা), সম্পাদক-তাপস ভৌমিক, এপ্রিল-১৯৯৯, বাগুইআটি-কলকাতা।
৫). মালঞ্চ (ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় শতবর্ষপূর্তি স্মারক), ২০০৪, ঠাকুরগাঁও।
লেখক : মো. জাহিদুর রহমান, পরিচালক, শ্যামনগর সাহিত্য কেন্দ্র, সাতক্ষীরা