আশাশুনিতে সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬ হাজার পরিবারের জীবনযাত্রা পরিবর্তন


প্রকাশিত : আগস্ট ২৪, ২০১৯ ||

মো. জাবের হোসেন: সমৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচির নাম। যে কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সকল উপাদান আওতাভুক্ত রেখে কাজ করা হচ্ছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) র্সবপ্রথম ২০১০ দেশের সালে মাত্র ৪৩ টি ইউনিয়নের দুই লাখ ৩২২টি খানা নিয়ে কাজ শুরু করে তার সহযোগি সংস্থাসমূহের মাধ্যমে। বর্তমানে তার প্রসার বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩ টি ইউনিয়নে লাভ করেছে। শুধুমাত্র ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ না করে মানুষের জীবনামানের উন্নতি প্রসারের জন্য এমন মহতি উদ্যোগ গ্রহণ নি:সন্দেহে সুখকর।
জেলার লবণাক্ত এলাকা আশাশুনি। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এই অঞ্চলে লবণাক্ততার জন্য ধান চাষাবাদ হয়না বললে’ই চলে। আশাশুনিতে খুলনা ভিত্তিক বে-সরকারী সংস্থা ‘উন্নয়ন’ কাজ করছে ২০১২ সাল থেকে। দাতা সংস্থার সহযোগিতায় ২০১৭ সালের জুন মাস থেকে চালু হয় সমৃদ্ধি কর্মসূচি। যার লক্ষ্য আশাশুনি সদর ইউনিয়নের প্রতিটা পরিবার। কার্যক্রম শুরুর সময় ৫৫৮৫টি খানা জরিপের মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়। সেই থেকে তারা এলাকার মানুষের জীবনমান বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা,পারিবারিক জীবনমান উন্নতি নিয়ে কাজ শুরু করলেও র্বতমানে বিভিন্ন প্রকার ভাতাও দিচ্ছে তারা। এর মাধ্যমে শুধু এই এলাকারঅবস্থার উন্নতি’ই হচ্ছেনা, সেই সাথে এই এলাকার মানুষের জীবনাযাত্রা পাল্টে যেতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, প্রকল্পের অফিসে বর্তমানে একজন ইউনিয়ন সমন্বয়কারী, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা, উদ্যোগ উন্নয়ন কর্মকর্তা, এমআইএস অফিসার, প্রবীণ কর্মকর্তা, ৯ জন স্বাস্থ্য কর্মী ও ২৫ জন শিক্ষকদের সমন্বয়ে এই এলাকায় কাজ করে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে নিয়মিত সুবিধা পাচ্ছে এই এলাকার প্রায় ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আশাশুনি ইউনিয়নের ২৬টি গ্রামে ২৫টি সমৃদ্ধি শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে নিয়মিত বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পাঠদান করানো হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থদের নিয়ে চলে এই পাঠদান। যেখানে শিশু, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদেরকে পড়ানো হয়। এছাড়া স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদেরকেও এখানে পড়ানো হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কেন্দ্রেনিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখার অবস্থান। প্রতিটা শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে প্রতি মাসে একবার করে কেন্দ্রে অভিভাবক সভার আয়োজন করা হয়। অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা না করে, বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। যার মাধ্যমে অভিভাবকরা সচেতন হতে পারে। এছাড়াওশিক্ষা কেন্দ্রের শিশুদের নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া অতিদরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদেরকে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করা হয়। এসএসসি তে ৪.০০ হতে ৪.৯৯ জিপিএ প্রাপ্ত ছেলে-মেয়েদের ১২০০০ টাকা করে দুই বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত মোট ৮৭ জনকে ১০৪৪০০০ টাকা প্রদান করা হয়।
স্বাস্থ্য সেবার আওতায় মাত্র ১০০ টাকায় একটি পরিবারের স্বাস্থ্য কার্ড করে পুরো এক বছর পরিবারে সকল সদস্যদের বিনামূল্যে ডাক্তার দেখাতে পারছেন। নিয়মিত প্রতিটা ওয়ার্ডের ৫০০ খানার বিপরীতে রয়েছে একজন করে স্বাস্থ্য কর্মী। যিনি প্রতিদিন ২৫টি করে বাড়ি পরিদর্শন করে থাকেন। স্বাস্থ্য কর্মী প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন।স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সপ্তাহে একদিন অফিসে দিনভর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা ছাড়াও নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করেন।
এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা প্রতি মাসে স্যাটেলাইট ও স্ট্যাটিক ক্লিনিকের মাধ্যমে এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রতি ৪ মাস অন্তর অন্তর একটি করে বিশেষায়িত স্বাস্থ্য ক্যাম্পের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। এসব চিকিৎসা সেবা এলাকার মানুষের বিনামূল্যে প্রদান করে থাকে তার। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্য প্রতি এলাকায় প্রতি বছর ১০০ টি করে স্বাস্থ্য সম্মতটয়লেট স্থাপন করে থাকে।
সমৃদ্ধ বাড়ির আওতায় প্রতি বছর ৫০টি করে বাড়ি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই বাড়ির নাম দেয়া হয়েছে সমৃদ্ধ বাড়ি। ভার্মি কম্পোস্ট, ফলজ গাছ,বনজ গাছ, ঔষধি গাছ, ফুলের গাছ, বিভিন্ন শাক-সবজির বীজ, বন্ধু চুলা, হাঁস-মুরগী, কবুতর, গরু, ছাগলসহ একটি পরিবারে জন্য প্রয়োজনীয় সকল উপরকরণ থাকে।
এছাড়াও এলাকার ভিক্ষুকদের পূনর্বাসনের জন্য বর্তমানে ০২ জনকে ১০০০০০ টাকা করে প্রদান করা হয়। উক্ত ১০০০০০ টাকা দিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী, মুদি দোকন নির্মাণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের আর ভিক্ষাবৃত্তি চালাতে হয় না। গরীব-অসহায় লোকদের প্রতি মাসে ভাতা প্রদান করা হয়। বয়ষ্কদের চলাচলের জন্য চশমা, লাঠি, হুইল চেয়ার, গরীব বয়স্ক লোকদের মৃত্যুর পর দাফন ও সৎকারের জন্য ২ হাজার করে টাকা দেয়াসহ বিভিন্ন রকমের সামাজিক কাজ করে থাকে।
ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের লক্ষে ৯টি সমৃদ্ধি কেন্দ্র ঘর তৈরি করা হয়েছে। যেখানে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গরা সালিশ-বিচারসহ উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারে। অবসরে বসে প্রাবীণরা সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন বই,ম্যাগাজিনের ব্যবস্থা রয়েছে।
যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধকল্পে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ৯টা ওয়ার্ডে ১৮টি কমিটি তৈরি করা রয়েছে। যার মাধ্যমে প্রতি ২ মাস পর পর প্রতিটা ওয়ার্ডে মিটিং করা হয়ে থাকে। যুব সমাজের সদস্যদের নিয়ে দ্বি-মসিক যুব মিটিং এবং স্থানীয় ইউপি সদস্যেরে সমন্বয়ে ওয়ার্ড সমন্বয় মিটিং করা হয়ে থাকে। যেখানে এলাকার বিভিন্ন বিষয় এবং উন্নয়ন চিন্তার বিষয়ে আলোকপাত হয়ে থাকে। এছাড়া এই যুব সমাজের সদস্যদের নিয়ে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। যেমন-বৃক্ষ রোপন, গাছের চারা বিতরণ, কার্লভাট তৈরি, সাঁকো তৈরি, বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়।
সমৃদ্ধি কর্মসূচির বিষয়ে ইউনিয়ন সমন্বয়াকরী মো. তারিকুর রহমান বলেন, দারিদ্র বহুমাত্রিক, সে কারণে শুধুমাত্র সামান্য কিছু ঋণের মাধ্যমে দারিদ্রতা হ্রাস করা সম্ভব নয়। প্রকৃত অর্থে দারিদ্রতা দূরীকরণের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অ-আর্থিক বিষয়াদি ও উপযুক্ত ঋণ নিয়ে সমন্বিত কর্মসূচির নাম সমৃদ্ধি কর্মসূচি। সমৃদ্ধি কর্মসূচি একটি দীর্ঘ মেয়াদি কার্যক্রম যা বহুমাত্রিক সমন্বয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জনগণের টেকসই দারিদ্র, বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আশাশুনি ইউনিয়নের উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কৃষি অফিসার, মৎস্য অফিসার, স্বাস্থ্য অফিসার, যুব উন্নয়ন অফিসার, শিক্ষা অফিসার, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিসার এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণের সার্বিক সহযোগিতায় এই কর্মসূচি জোরদারভাবে কাজ করে যাবে বলে আমার প্রত্যাশা।
আশাশুনি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স. ম সেলিম রেজা মিলন বলেন, উন্নয়ন সংস্থা আশাশুনিতে সমৃদ্ধি কর্মসূচির মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নকল্পে ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমি নিজেও তাদের কার্যক্রমের আওতায় ঢাকায় একটি মিটিং গিয়েছিলাম। এই কর্মসূচির আওতায় তাদের কার্যক্রমগুলো অনেক ভালো। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বস্থ করেন তিনি।