আওয়ামী লীগ বনাম আমার লীগ সমস্যা: আমার দৃষ্টিতে সমাধানের উপায়


প্রকাশিত : আগস্ট ২৬, ২০১৯ ||

এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু:
উপ-মহাদেশের তৃতীয়, পাকিস্তানের দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সনাতনী রাজ্যস্থান, (রাম রাজ্য) দিল্লী সালতানাত, মুঘল সা¤্রাজ্য, নবাবী শাসনকাল অতিক্রম করে বিট্রিশ শাসন ব্যবস্থা থেকেই উপ-মহাদেশের মানুষের মধ্যে আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধারণা এবং রাজনৈতিক দল গঠনের জাগ্রত চিন্তা-চেতনা থেকেই এই উপ-মহাদেশে প্রথম রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, কংগ্রেস। প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের পরে জাতি স্বত্ত্বার চিন্তা-চেতনা থেকে গঠিত হয় উপ-মহাদেশের দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল ‘মুসলীমলীগ’। মুসলীমলীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগ। মুসলীমলীগ নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের একাংশের জনগণের, আঞ্চলিক অধিকারবোধের চিন্তা-চেতনা থেকে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলীম লীগ। পরবর্তীতে ধর্ম ভিত্তিক বিশেষ একটি জাতির জন্য নয়, অঞ্চল ভিত্তিক-জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের স্বার্থ রক্ষার্থে, আওয়ামী মুসলীম লীগকে সার্বজনীন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত করে তোলার জন্য আওয়ামী মুসলীম লীগের নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। এই আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক দলটি, উপ-মহাদেশের তৃতীয়, পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই পাকিস্তান খন্ডিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। যে কারনে আওয়ামী লীগ উপ-মহাদেশের তৃতীয়, পাকিস্তানের দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান রাজনৈতিক দল।
আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক দলের সুদুর প্রসারী ইতিহাস ঐতিহ্য এবং গৌরব থাকা স্বত্ত্বেও পর্যায়ক্রমে কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যবসা নীতির ধারক ও বাহকরা নিজেদের স্বার্থে ‘আওয়ামী লীগ’ এর পাশ কাটিয়ে, ‘আমার লীগ’ গঠণ করে চলেছে। যে কারণে ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ ক্রমশ: তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে।
ঐসকল রাজনৈতিক ব্যবসানীতির অনুসারীরা যেকোন উপায়ে সরকারের একটি পদ দখল করতে পারলেই দলকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। সরকার প্রধান ছাড়া সরকারের সাধারণ সদস্যরা যদি দল নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে দলের প্রকৃতি ও গতি স্বাভাবিক ভাবেই বিনষ্ট হয়ে থাকে। সরকার প্রধান নিজে যেমন, একদিকে সরকার প্রধান হিসেবে সরকারকে পরিচালিত করবেন, ঠিক তেমনি সরকার প্রধান অপরদিকে দলীয় প্রধান হিসেবে দলকেও সুচারূপে পরিচালনা করবেন। কারন তিনি সভ্যসাচী, তাঁর দুই হস্ত সমান পরিচালিত হবে। সরকার এবং দল একাকার হওয়ার কারনে (একই ব্যক্তি-উভয় দিকে সদস্য থাকার সুবাদে) দলের অবস্থান প্রসারিত ও গৌরবজনক না হয়ে, ক্রমশ: সমালোচিত ও সংকুচিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি।
যেহেতু প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, সরকারের সদস্যদের (মন্ত্রী, এমপি এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্থানীয় সরকারের, সিটিকর্পোরেশন মেয়র, কাউন্সিলর, মেয়র পৌরসভা ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান জেলা পরিষদ, চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, সেকারণে-ঐসকল পদাধিকারী ব্যক্তিদের আজ্ঞাবাহী হয়ে তাদের স্বার্থই রক্ষা করে থাকেন। দলের স্বার্থ রক্ষায় তারা থাকে সদা সর্বদা বিতশ্রদ্ধ। যার কারনে দল (দলের পদাধিকারী ব্যক্তিবর্গ) সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। একই সাথে যেহেতু প্রশাসন সরকারের সদস্যদের নির্দেশ অনুসরণ করে এবং সরকারের সদস্যদের হাতে সমস্ত প্রকার সুযোগ সুবিধা (দান, অনুদান, চাকরি, মামলা রুজু, মামলা অব্যহতি সহ আনুসঙ্গিক সুবিধা) নিহীত থাকে। সেকারণে, দলের সাধারণ নেতাকর্মী সমর্থকবৃন্দ, দলের স্বার্থে, দলের পদাধিকারীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত না হয়ে, সরকারি পদাধিকারীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে। এরূপ অবস্থায়, দলের পদাধিকারীরা ঠুটো জগন্নাথ হয়ে আছে, আর সরকারি পদাধিকারীরা সেই সুযোগে, ‘আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মী সমর্থকদের বাদ দিয়ে, নিজের ভাই, ভগ্নি, ভাগ্নে, ভাইপো, স্ত্রী, শ্যালক, শ্বশুর, মামা শ্বশুর, ভাসুর এবং নিজের অধিনস্ত থাকে এমন অনভিজ্ঞ, অক্ষম কর্মচারী ব্যক্তিদের দ্বারা খাতা পূরণ করে, ‘আওয়ামীলীগ’ বাদ দিয়ে, ‘আমার লীগ’ গঠণ করে, আওয়ামী লীগকে প্রায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এইরূপ অবস্থায় আমার মনে হয়, আওয়ামী লীগকে, আমার লীগের সমস্যা থেকে মুক্ত করতে হলে, কিছু সতর্ক পদক্ষেপ অতিদ্রুত (আগামী জাতীয় কাউন্সিলে, দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য) গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমন:
১। যিনি নিজে বা তার নিজের পিতা-মাতা, ভাই-ভগ্নী, স্ত্রী-পুত্র, শ্যালক-শ্বশুর, ভাগ্নে-ভাইপোগণ, জাতীয় সংসদের বা স্থানীয় সরকারের অথবা বে-সরকারী কোন সংস্থায় নির্বাচন করতে চান, তাকে দলের কোন স্তরে, কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকায় না রাখা।
কারণ: আওয়ামী লীগ সমর্থক, আওয়ামী লীগ বিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী প্রত্যেক নাগরিক-ই ভোটার। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ব্যক্তি, সংকীর্ণ মানষিকতার কারনে, দলীয় মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দীদের প্রতি আস্থা হারিয়ে, অসৌজন্য আচারণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের তালিকায় অন্ত্রর্ভূক্ত করে এবং আওয়ামী বিরোধী ও বিদ্বেষীদের প্রতি বোকার মত, অলিক কল্পনায় আস্থাশীল হয়ে, তাদের সমর্থন (ভোট) পাওয়ার বিশ্বাসে, আওয়ামী বিরোধী ও বিদ্বেষীদের আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকা ভূক্ত করে, ‘আওয়ামী লীগ’ এর স্থলে ‘আমার লীগ’ গঠণ করে থাকে।
২। একই ব্যক্তি দলের একই স্তরে, একই পদে দুইবারের অধিক প্রার্থী হতে পারবেন না। পদোন্নতি গ্রহণের জন্য, হয় উর্দ্ধ স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন অথবা দলের যেকোন স্তরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী করার জন্য, মনোনয়ন প্রার্থী হবেন অথবা উপদেষ্টা মন্ডলীর তালিকাভূক্ত হবেন।
কারণ: একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন, দলের একই স্তরে এবং একই পদে অধিষ্টিত থাকার কারনে, তিনি দলের নিয়ম, কানুন, শৃঙ্খলা ভুলে যান এবং দলের গঠনতান্ত্রিক বিধি বিধানের বাহিরে, নিজস্ব মন গড়া বিধি বিধান প্রয়োগ ও কায়েম করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে শুরু করেন, দলের কাছে তিনি দায়বদ্ধ নন, দল তার কাছে দায়বদ্ধ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩। একই ব্যক্তি একাধারে দুইবারের অধিক, দলের কোন স্তরের (জাতীয় সংসদে এবং স্থানীয় সরকারের) কোন পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন চাহিতে পারিবেন না এবং মনোনয়নপ্রাপ্ত হইবেন না। যদি এমন কোন বিশেষ ব্যক্তি থাকেন, যাঁকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখা, দল, দেশ ও জনগনের জন্য সমিচিন নহে, তাহলে তাকে অন্তত পক্ষে, আসন পরিবর্তন (জেলা বা বিভাগ পরিবর্তন) করে, মনোনয়ন প্রদান করা প্রয়োজন।
কারণ: একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন একই আসনে মনোনয়ন প্রাপ্ত হয়ে এবং একই আসনে নির্বাচন করে, ঐ নির্বাচনী অঞ্চলকে তিনি, তাঁর নিজস্ব ভূমি হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন। তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন, সেখানে তিনিই নির্বাচন করবেন, তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর স্ত্রী, পুত্র বা ভ্রাতা, অন্য যে কেউ, সেই আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। অন্য কাহারো ঐ আসনে নির্বাচন করার সুযোগ এবং অধিকার নাই। এইরূপ অবস্থার কারনে, ঐ নির্বাচনী এলাকার নেতা, কর্মী, সমর্থকদের মনে, দল বিরোধী মনোভাব জন্মলাভ করে এবং নেতা-কর্মীরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে, আদর্শকে পরিহার করে, অসৎ পন্থা অবলম্বন করে, অর্থ বিত্ত্বের অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করে। যার ফলে, নেতাকর্মীরা আদর্শচ্যুত হয়ে, ব্যক্তি চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব হারা হয়ে, নিজেদেরকেও হারিয়ে ফেলে এবং নিজ দল, বিরোধী দল, প্রশাসন ও জনগণ, সকলের কাছে-দলের সুনাম বিনষ্ট করে। দল হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৪। দলের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলের বিধান পরিবর্তন করে, দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল এর বিধান প্রবর্তন করা প্রয়োজন এবং বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি দুই বছর অন্তর দলের প্রত্যেক স্তরের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠানের বিধি বিধান প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
কারণ: তিন বছরের জন্য কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, অথচ-দশ, বার ও পনের বছরের মধ্যেও আর কাউন্সিল অধিবেশন না হওয়ার কারনে, দলের নেতৃবৃন্দ নিজেদেরকে, দলের স্থানীয় পর্যায়ের সর্বময় কর্তা বিবেচনায় কারো কোনো মতামতের তোয়াক্কা করে না। অধস্তন নেতা ও কর্মীরা ক্রমশ: দলের প্রতি ভক্তি, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং উচ্চ আশা হারিয়ে, গতিহারা হয়ে, দূর্নীতি পরায়ন হয়ে পড়ে। দলের কোন আন্দোলন-সংগ্রামে (ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ডে) অংশগ্রহণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলীয় নেতা, কর্মী, সমর্থকদের প্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করে।
৫। কোন স্তরের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে, কেবলমাত্র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন সম্পন্ন করে, নব-নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্ব প্রদানের পদ্ধতি, বাধ্যতামূলক ভাবে বিলুপ্ত করতে হবে। ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনেই অন্ততপক্ষে সম্পূর্ন সম্পাদক মন্ডলীর পদে নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন এবং উর্দ্ধতন স্তরের কমিটি গঠনের জন্য কাউন্সিলার তালিকা একই অধিবেশন থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে নির্বাচন করা প্রয়োজন।
কারণ: সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর, জবাব দিহিতামূলক নেতৃত্ব না দিয়ে, একক সিদ্ধান্তে স্বাধীন নেতৃত্ব দেওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে, সারাদেশে দলের (টিম ওয়ার্ক এর স্থলে এক নায়ক তান্ত্রিক কার্যক্রমের কারণে) সারাদেশে দলের নেতাকর্মী, সমর্থকরা দলের প্রতি উদাসীন ও আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ দশ বছরেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না করে, দলকে ব্যর্থ ও অকার্যকর করে তুলেছে।
সাথে সাথে আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতৃ স্থানীয় আদর্শিক দল প্রেমী ব্যক্তিগণকে বাদ দিয়ে, এক টাকায় চার হালি কাউন্সিলর পাওয়া যায়, এমন প্রকৃতির কর্মচারীদের কাউন্সিলর বানিয়ে, উর্দ্ধতন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থীদের নিকট লক্ষ লক্ষ টাকায় কাউন্সিলর বিক্রয় করে, উর্দ্ধতন কমিটিকে একটি নাজুক নাম সর্বস্ব কমিটি গঠনে সহায়তা করে, দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। (চলবে…)