পালংশাক: একটি উৎকৃষ্ট সবজি


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান:

পালংশাক পাতাজাতীয় একটি পুষ্টিকর শীতকালীন সবজি। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পালংশাক একটি প্রধান সবজি। বাংলাদেশে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাতাজাতীয় সবজি।

স্বাদ ও পুষ্টিমানের বিবেচনায় পালংশাক একটি উৎকৃষ্ট পাতা জাতীয় সবজি। আহার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পালংশাকে রয়েছে প্রোটিন ৩.৩ গ্রাম, শ্বেতসার ৪.০ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ১.৮ গ্রাম খনিজ লবন, ০.০৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১ ও ০.০৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২। তাছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম পালংশাকে ৯৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৯৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১০.৯ মিলিগ্রাম লৌহ ও ৩০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পালংশাকে কচুশাক, লালশাক, বাঁধাকপি ও লাউশাক থেকে বেশি ভিটামিন ‘সি’ আছে। ভিটামিন ‘সি’ দাঁত ও মাড়ি মজবুত করে এবং স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়া সর্দি, কাশি নিরাময় করে। ভিটামিন সি’ ক্যালসিয়াম ও লৌহের বিপাকেও সহায়তা করে। বাঁধাকপি, মুলাশাক ও লাউশাক থেকে পালংশাকে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। শরীর গঠনের জন্য ক্যালসিয়ামের বিশেষ প্রয়োজন। এটি দেহের হাড় ও দাঁত গঠন করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যথেষ্ট সাহায্য করে। উলেখ্য, শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য প্রচুর ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। ঠিক একই কারণে সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সময় প্রসূতি মায়ের খাবারে যথেষ্ট ক্যালসিয়াম থাকা দরকার।

পালংশাকে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলাশাক ও লাউশাক থেকে বেশি লৌহ রয়েছে। লৌহ রক্তের সজীবতা বজায় রাখে। এর অভাবে অবসাদ, ঔদাসিন্য, বুক ধড়ফড়ানি (অল্প পরিশ্রমে) এবং কোন কোন সময় জিহবায় তিক্ততা ও মুখে প্রদাহ (ঝঃড়সধঃরঃরং) হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত, সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং স্বভাব সুলভ চঞ্চলতার অভাব প্রধান লক্ষণ। ঘাটতি বেশি ও দীর্ঘস্থায়ী হলে রক্তাল্পতা (ধহধবসরধ) সৃষ্টি হয়। অন্ত:সত্ত্বা মহিলাদের শরীরে লৌহের কমতি থাকলে নবজাত শিশুর দেহে জমাকৃত লৌহের পরিমাণ খুব কম হয়, বিশেষভাবে যদি স্বাভাবিক সময়ের পূর্বে শিশু জন্ম নেয়। এসব শিশুর দেহে লৌহের পরিমাণ প্রয়োজনীয় পর্যায়ে উঠানো কষ্টকর। লৌহের ঘাটতি ভিটামিন ‘এ’র আত্তীকরণে বাঁধার সৃষ্টি করে।

খাদ্যোপোযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পালংশাকে ৮৪৭০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন (পধৎড়ঃবহব) থাকে। সেখানে প্রতি ১০০ গ্রাম বাঁধাকপি, সরিষাশাক, লেটুস ও ধনেপাতায় যথাক্রমে ৬০০, ২৬২২, ৯৯০ ও ৬০৭২ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন আছে এবং লাউশাকে মোটেই ক্যারোটিন নেই। ক্যারোটিন একটি যৌগিক পদার্থ যা খাওয়ার পর ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয়। চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা ভিটামিন ‘এ’র প্রধান কাজ। এছাড়া ত্বক, হাড় ও দাঁতের গঠন এবং সুস্থতা রক্ষার জন্য ভিটামিন ‘এ’ বিশেষ প্রয়োজন। প্রসূতি অবস্থায় মায়ের খাবারে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ দরকার। দেহে ‘এ’ ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিলে প্রথমে রাতকানা রোগ হয়। অল্প আলোতে পরিস্কার দেখতে না পাওয়া এ রোগের প্রধান লক্ষণ। অল্প বয়স্ক শিশুরাই (১০ বছর বয়স পর্যন্ত) এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। যদি কোনো ছেলে-মেয়ে হাঁটার সময় বার বার আছাড় খায় তাহলে অবিলম্বে তার দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ঘাটতি বেশি এবং অনেকদিন স্থায়ী হলে আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, ভিটামিন ‘এ’ র অভাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০-৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায় এবং ১০ লাখ শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়। তাছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু ও মা রক্তস্বল্পতার শিকার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের শিশুদের বিভিন্ন প্রকার অপুষ্টির মধ্যে ভিটামিন ‘এ’র অভাবজনিত অন্ধত্ব একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। মায়ের দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ থাকে। মায়েদের খাদ্যে শাক-সবজির অভাব থাকায় এবং শিশুদেরকে মায়েরা বুকের দুধ না খাওয়ানোর কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জীবনে এই অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব দেখা দেয়। তাই মায়ের দুধে ভিটামিন ‘এ’ তৈরির জন্য স্তন্যদানকালে মায়ের বেশি করে গাঢ় ও সবুজ রঙের শাক সবজি খাওয়া উচিত। আর শিশুদের মায়ের বুকের দুধ অবশ্যই খাওয়াতে হবে। তাছাড়া যদি শিশুদেরকে নিয়মিত তেলসহ রান্না করে কিছু পালং ও অন্যান্য শাক খাওয়ানো যায় তাহলে ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি কমে আসবে এবং ভবিষ্যতে তার অপুষ্টিও রোধ হবে। ফলে শিশু ভবিষ্যতের জন্য একজন সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম নাগরিক তথা দেশের সেরা সম্পদরূপে গড়ে উঠতে পারবে।

এছাড়া বাতের ব্যথা, অস্টিওপোরেসিস, মাথাব্যথা দূর করতে প্রদাহনাশক হিসেবে পালংশাক কাজ করে। এ শাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষারীয় উপাদান থাকায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অধিকন্তু পালংশাকে রয়েছে প্রচুর ফাভোনয়েড নামের গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। আর এই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট দেহ কোষের ক্ষয়রোধ করে শরীরকে তারুণ্য দীপ্ত এবং সুস্থ ও সবল রাখে। অর্থাৎ বার্র্ধক্যকে জয় করতে পালংশাকে রয়েছে অনন্য ভূমিকা। পালংশাকের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট মস্তিস্কের কোষগুলোকেও সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখে। তাই মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও এর জুড়ি নেই। তাছাড়া পালংশাকে রয়েছে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরণের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা।

বস্তুতঃ দেহের পুষ্টি সাধন এবং রোধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অন্ধত্ব রোধ করে সুস্থ-সবল জীবনের জন্য পালংশাক ও অন্যান্য শাক-সবজির জুড়ি নেই। ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও লৌহ সমৃদ্ধ পালংশাক কিংবা অন্যান্য পাতাজাতীয় যে কোন দেশিয় শাকের মাত্র ৫০ গ্রাম আমাদের শরীরের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। পুষ্টিজ্ঞানের অভাবে হয়তো আমরা মহামূল্যবান এসব শাক-সবজির গুরুত্ব বুঝতে পারছি না। ত্রুটিপূর্ণ রন্ধন প্রণালীর জন্য শাক-সবজির পুষ্টির অপচয় হয়। যেমন- শাক-সবজি কেটে ধোয়ার ফলে প্রচুর ভিটামিন বি-১ ও ‘সি’ চলে যায়। তাই শাক-সবজি রান্নার আগেই ভাল করে ধুয়ে তারপর কাটতে হবে। যাতে পুষ্টিমান কমে না যায়। তাছাড়া যথাযথ পরিমাণে তেল দিয়ে রান্না না করার কারণে শাকে বিদ্যমান ক্যারোটিন দেহে শোষিত হতে পারে না। তাই পালংশাক অবশ্যই পরিমাণ মতো তেল দিয়ে রান্না করে খেতে হবে।

পালংশাক এবং অন্যান্য শাক-সবজির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই, নানা রকম রোগের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এখন বাজারে প্রচুর পালংশাক পাওয়া যায় এবং এগুলো দামেও খুব সস্তা। তাই আসুন নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই এসময় প্রতিদিন পুষ্টি সমৃদ্ধ পালংশাক ও অন্যান্য শাক-সবজি বেশি করে খাই এবং দেশকে অপুষ্টির অভিশাপ থেকে মুক্ত করে সুস্থ-সবল ও সুন্দর জীবন গড়ে তুলি।

চাষাবাদ পদ্ধতি:

উপযোগি জমি ও মাটি: দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি পালংশাক চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগি।

জাত নির্বাচন: পালংশাকের বিভিন্ন জাতের মধ্যে কুপি পালং, সবুজ বাংলা, অলগ্রীন, দেবাঞ্জলী, সাথি, ঘোষাপালং, নীলাবতী প্রভৃতি উলেখ্যযোগ্য।

বীজ বপণের সময়: ভাদ্র থেকে পৌষ মাস।

জমি তৈরি: ৩/৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হবে।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি: পালংশাক চাষে প্রতি ৪০ বর্গমিটার বা এক শতক জমিতে ২০ কেজি গোবর, ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০০ গ্রাম টি.এস.পি ও ২৫০ গ্রাম এম.ও.পি সার ব্যবহার করতে হয়। শেষ চাষের সময় সমুদয় গোবর ও টি.এস.পি সার জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। আর ইউরিয়া ও এম.ও.পি সার সমান দু’কিস্তিতে চারা গজানোর ১০-১৫ দিন পর একবার এবং ২৫-৩০ দিন পর বাকী অর্ধেক উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভাল করে জল মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বপণ: পালংশাকের বীজ ছিটিয়ে বা সারি করে বপণ করা যায়। ছিটিয়ে বোনার জন্য বীজ সমস্ত জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। তারপর একটা হালকা চাষ ও মই দিয়ে বীজগুলো মাটিতে ঢেকে দিতে হয়। সারিতে বপণ করা হলে জমিতে ২০-২৫ সে.মি. দূরে দূরে সারি করে প্রতি সারিতে ৫-৬ সে.মি. পর পর ২-৩ সে.মি. মাটির নিচে ২-৩টি বীজ বপণ করে ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। বীজের খোসা শক্ত বলে বপণের পূর্বে বীজ ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে তাড়াতাড়ি চারা গজায়। ৪০ বর্গমিটার বা এক শতক জমিতে ১০০-১২৫ গ্রাম বীজের দরকার হয়।

পানি সেচ: মাটিতে রসের অভাব হলে পানি সেচ দিতে হবে। এরপর মাটিতে রসের অবস্থা অনুযায়ী ৪-৫ দিন পর পর সেচ দিতে হয়। এতে পালংশাকের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। আবার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরবর্তী পরিচর্যা: জমিতে আগাছা হলে নিড়ানি দিয়ে তা পরিস্কার করতে হবে। ক্ষেতে চারা বেশি ঘন হয়ে গেলে চারা গজানোর ১৫-২০ দিন পর থেকে ঘন জায়গার চারা তুলে পাতলা করে দেয়া উচিত। তাছাড়া মাঝে মাঝে ক্ষেতের মাটি নিড়ানি বা ছোট কোদাল দিয়ে খুচিয়ে আলগা ও ঝুরঝুরে করে দিতে হবে। এতে ফসল ভাল হয়।

ফসল সংগ্রহ: বীজ বপণের ৪৫-৫০ দিন পর পালংশাক সংগ্রহ করার উপযোগী হয়। গাছে ফুল না আসা পর্যন্ত যে কোন সময় পালংশাক সংগ্রহ করা যায়।

ফলন: এক শতক জমিতে ৩০-৪০ কেজি পালংশাক পাওয়া যায়।

লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা।