প্রসঙ্গ: হাঁসধরা প্রতিযোগিতা/ কামারুজ্জামান


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯ ||

১৬ই আগস্ট, ২০১৯ খ্রিঃ। বড়ই শোকাহত হলাম। হেতুÑ ‘আশাশুনির কুল্যায় সাঁতার ও হাঁসধরা প্রতিযোগিতা’। দৈনিক ‘পত্রদূতে’র শেষ পৃষ্ঠায় এই সংবাদ-শিরোনামটির উপর দৃষ্টি আটকে গেল; থমকে গেলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। মনে পড়ে গেল কয়েক বৎসর আগে এই এলাকায় ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা। আজ সেই গল্পই হোক। একটি ছদ্ম নামÑ তালপুকুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্কুলে চলছে বার্ষিক ক্রীড়া-প্রতিযোগিতা। সর্বসাধারণের জন্য রাখা হয়েছে দুটো খেলা। একটা জলের, আরেকটা ডাঙার। বিকাল ৩টায় তালপুকুরে হাঁসধরা খেলা আর ৪টায় স্কুল মাঠে বিবাহিত বনাম অবিবাহিত প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। হাঁসধরা খেলার হাঁস কেনা বাবদ টাকা আদায় করা হয়েছে স্থানীয় ইউ পি মেম্বরের কাছ থেকে এবং ফুটবল ম্যাচের পুরস্কারের অর্থ চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে। বিকাল ৩টা বাজার আগেই তালপুকুর এলাকা বাজতে লাগল; তালপুকুরের চারিধার লোকে লোকারণ্য। “তিল ঠাঁই আর নাহি রে!” একটা তাজা হাঁস খাঁচাবন্দী করে বাঁধানো ঘাটের উপর রাখা হয়েছে। চারিপাশে অনেক লোকজন দেখে হাঁসটা বেশ আতঙ্কিত। ঘড়িতে ৩টা বাজার সাথে সাথে হাঁসটাকে পুকুরের মাঝখানে ছেড়ে দেওয়া হবে। পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাঁসটাকে যে ধরতে পারবে, হাঁস তার। এটাই এ খেলার পুরস্কার। আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকী। উঠতি বয়সের কয়েকজন অর্বাচীন যুবক উপস্থিত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে মাতব্বরি ফলাচ্ছে, অনতিবিলম্বে খেলা শুরু হতে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে এবং নিজেকে একটু জাহির করার মানসে যে যার মত যত সব অপ্রয়োজনীয় ফালতু কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে একটানা বকবক করে চলেছে। যেহেতু আজকের দিনে সেই আগেকার দিনের মত ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘণ্টা বাজানো ঘড়ি আর নেই, তাই ঘড়িতে সময় হয়ত বাজবে না, কিন্তু মুখ বেজে চলেছে অবিরাম, যেন খৈ ফুটছে। অবশেষে সত্যিই ৩টা ‘বাজল’। খেলা আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম হৃদয় হোসেন ওরফে নির্দয় হোসেন ভারী হাঁসটার পাখ ধরে যেভাবে শক্তিভর সজোরে পুকুরের মাঝখানে নিক্ষেপ করল, তাতে তার পাখ দুটি বুঝি ভেঙেই গেল। না ভাঙলেও অন্তত মচকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল এবং নিদেন পক্ষে হাঁসটা যে খুব ব্যথা পেয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে তাতে কার কী এসে যায়! মুহূর্তে পুকুরের চারিপাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল একপাল মানুষ। অসংখ্য মানুষের থাবা হাঁসটার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রাণীটি আতঙ্কে দিশেহারা। এখন সে কী করবে, কোন দিকে যাবে? লাভলু মিয়া খুব নিকটে চলে এসেছে। হাঁসটা উল্টো দিকে পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু না, পিছনে সোহেল উদ্দীন উদ্দীন। লোলুপ দৃষ্টি মেলে হামলে পড়ল একেবারে সামনে। হাঁসটা পাখা ঝাঁপটিয়ে মাথার উপর দিয়ে দূরে সরে গেল। হাঁস ডুব দিয়ে ঘাটের বিপরীত দিকে অনেকটা দূরে গিয়ে ভেসে উঠল। কিন্তু এখানেও রেহাই নেই। ধেয়ে আসছে আর এক দল, হাঁ করে তার দিকে, যেন এখনি ধরে ফেলবে। হাঁস কী করবে বুঝতে পারছে না। ওরা আরো নিকটে চলে আসতেই, সে প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আবারো ডুব মেরে পিছনে সরে গেল বটে, কিন্তু ঠিক না পেয়ে আরো বিপজ্জনক স্থানে। ভেসে উঠতেই সামনে আবির্ভূত হলো আর একজন। সাথে সাথে আক্রমণ। কিন্তু শিকার লক্ষ্যভ্রষ্ট। অল্পের জন্য ফসকে গিয়ে হাঁস বায়ে মোড় নিল। অকস্মাৎ পাশ থেকে ক্ষিপ্রগতিতে হামলে পড়ল আর এক জন। হাঁসটাকে প্রায় ধরেই ফেলল। প্রায় নয়, ধরেই তো ফেলেছে! হাঁস ভয়ার্ত স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। পানিতে ডানা আছড়াতে লাগল। প্রাণপণ চেষ্টা করে কোনক্রমে নিজেকে মুক্ত করে একপাশে ছিটকে পড়ল। একজনের থাবায় আটকে থাকল কয়েকটা ছেঁড়া পালক। ধরা-শিকার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঐ লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। পুকুরের চারিধার থেকে মুহুর্মুহু ভেসে আসছে উত্তেজনাকর উল্লাসধ্বনি। সবাই উৎসাহ দিচ্ছেÑ ধর ধর! একদিকে মানুষের উল্লাস, অন্যদিকে বাঁচার আকুতি। চলছে, এক ধরণের উৎসব। কিন্তু আর কতক্ষণ! হাঁসটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, প্রাণীটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে আর পারছে না। হঠাৎ সামনে একজন, পিছনে আর একজন! বুভুক্ষু মানুষের মত! অসহায় হাঁস! তার দুচোখে আতঙ্ক-ভয়, কণ্ঠে উৎকণ্ঠার চাপা স্বর। সে বাঁচতে চায়। সে পালাতে চাইল। কিন্তু না, এবার সে পারল না। একজন তার একটা পা ধরে ফেলেছে। শক্ত করে আটকে ধরেছে। হাঁস পাখা ঝাঁপটাতে লাগল। একই সাথে আর একজন তার আরেকটা পা আটকে ধরেছে। শুরু হয়ে গেল দু’জনের মধ্যে হাঁস নিয়ে টানাটানি-কাড়াকাড়ি। কেউ ছাড়বে না। দুজনেই সমানে সমান। টানাটানি, আরো জোরে! হেঁচকা টানে হাঁস ছিঁড়ে গেল। একজনের হাতে চলে আসল হাঁসের একটা পাসহ পার্শ্বদেশের কিছু অংশ আর একজনের হাতে থেকে গেল দেহের বৃহদাংশ। নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে পড়ল। কিন্তু ভিকটিম হাঁসটা তখনো জীবিত। কী বীভৎস দৃশ্য! দুই মানুষ পুকুর থেকে উঠে অর্জিত নিজ নিজ অংশ হাতে ঝুলিয়ে উল্লাস করতে করতে গৃহাভিমুখে ছুটল। এই খেলায় একজন চাম্পিয়ন হলো আর একজন রানার্সআপ। হাঁস জীবনযুদ্ধে হেরে গেল। তালপুকুর কালের সাক্ষী হয়ে থেকে গেল নির্বাক।
হাঁসটা অনামিকা। ওর কোন নাম নেই। আজ শোকাবহ স্মৃতি রোমন্থন করে ওর একটা যথার্থ নাম দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। নিন্দুকেরা হয়ত বিদ্রƒপের হাসি হেসে বলবে, হাঁসের আবার নামকরণ! তা বলুকগে! নির্যাতিতা ‘নির্ভয়া’, বীরাঙ্গনা ও শাহীদাদেরকে স্মরণ করে নরপশুদের গালে চপেটাঘাত করা অত্যাচারিত হাঁসটির নাম দিলাম ‘অপরাজিতা’।
একটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে আজকের গল্পটা লেখা। হাঁসধরা খেলায় সব সময় যে হাঁস ছিঁড়ে যায়, তা অবশ্য নয়। তবে প্রাণীটি যে ভীষণ কষ্ট পায়, এতে কোন সন্দেহ নেই। বল দিয়ে টানাটানি-কাড়াকাড়ি করা আর জীবন নিয়ে টানাটানি করা কখনো এক সমান ও সমতুল্য হতে পারে না। এই জাতীয় খেলার পর এই হাঁস সাধারণত ঐ দিনের ঐ রাতে জবাই করে পিকনিক বা ‘হাঁসভাতি’ আয়োজন করে বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে মউজ করে ভূরিভোজন করা হয়। জবাই করার আগে একটা নিরীহ প্রাণীকে কেন এভাবে কষ্ট দেওয়া হবে, যার-পর-নাই নিপীড়ন-নির্যাতন করা হবে? বন্ধ হোক হাঁসধরা খেলা তথা হাঁসমারা পাশবিকতা। আমাদের কাছে যা কেবলই ‘খেলা’, একটি নিরীহ প্রাণীর জন্য তা বিপন্ন ‘জীবন’।
খেলা নিয়ে জীবন,
নাকি জীবন নিয়ে খেলা?
দায়িত্বের বোঝা নিয়ে
নরের জীবনভেলা
ন্যুব্জ হয়েও সোজা চলে
সকাল-সন্ধ্যাবেলা।
খেলতামাশায় পশুর জীবন,
মানবকর্মে হেলা।