সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান কারাগারে পাঠালেন দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান (আপডেট)


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৯ ||

বদিউজ্জামান: দুদকের দায়েরকৃত স্বাস্থ্য বিভাগের সাড়ে ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের  চাঞ্চল্যকর মামলায় সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা ও দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান। এ মামলার প্রধান আসামী তৌহিদুর রহমানানের হাইকোর্টের দেওয়া ৬ সপ্তাহের অন্তবর্তীকালীন আগাম জামিনের মেয়াদ গতকাল শেষ হওয়ায় তিনি স্বেচ্ছায় সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে বিচারক তা নাকচ করে দেন। মামলার অপর আসামি হিসাব রক্ষক আনোয়ার হোসেন হাইকোর্টের নির্দেশে স্বেচ্ছায় গত ২৭ আগস্ট একই আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে সেটিও নাকচ করা হয়। এছাড়া এ মামলার অপর পলাতক আসামী স্বাস্থ্য বিভাগের কলঙ্ক স্টোর কিপার ফজলুল হকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের এক আদেশে দেশ ত্যাগ না করার নির্দেশ বলবৎ রয়েছে।

সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান সোমবার আদালতে আত্মসমার্পন করবেন এমন খবর ওই দিন পত্রদূত পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়। খবরটি প্রকাশের পর সকাল থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জেলা ও দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান এর এজলাস কক্ষে ভীড় জমাতে থাকে। বেলা সাড়ে ১১টার সময় স্পেশাল ২৫/১৯ নম্বর মামলাটির ডাক হলে আসামির কাঠগড়ায় উপস্থিত হন এ মামলার এক নম্বর আসামি সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুর রহমান। যথানিয়মে আসামি পক্ষের আইনজীবী বারের সভাপতি এড. এম শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক এড. তোজাম্মেল হোসেন তোজাম এবং এড. মিজানুর রহমান পিন্টু বক্তব্য রাখার জন্য ডায়াসে দাঁড়িয়ে যান। বক্তব্যের শুরুতে এড. মিজানুর রহমান পিন্টু আদালতকে বলেন, বিজ্ঞ আদালত-ডা. তৌহিদুর রহমান একজন নিরাপরাধ ব্যক্তি, তিনি অর্থ আত্মসাতের সাথে আদৌ জড়িত ছিলেন না, তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। আইনজীবী মিজানুর রহমান আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে সেটা হতে পারে কিন্তু তিনি অর্থ আত্মসাতের সাথে কোন ভবেই জড়িত নন। এসময় আসামি পক্ষের অপর আইনজীবী বারের সভাপতি এম শাহ আলম বলেন, সিভিল সার্জন সাহেব একজন শিক্ষিত এবং বয়স্ক ব্যক্তি, তিনি এ মামলার অভিযোগের সাথে আদৌ জড়িত নন, তিনি স্বেচ্ছায় বিজ্ঞ আদালতে এসেছেন এবং তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলও বটে, বিজ্ঞ আদালত তাঁকে জামিন দিলে হারানো বা পালানোর কোন সম্ভাবনা নেই। এ সময় তার পক্ষের অপর আইনজীবী বারের সেক্রেটারি তোজাম্মেল হোসেন তোজাম ডাক্তার আসামিকে তদন্ত রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অন্তবর্তীকালিন জামিনের আবেদন করেন।

অপরদিকে দুদকের সাতক্ষীরার পিপি এড. মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, সিভিল সার্জন হিসেবে তাঁর অফিসের এতবড় দুর্নীতির দায়ভার তাঁকে নিতেই হবে, তাঁর সহায়তা ছাড়া অফিসের অন্য কেউ এ ধরনের কাজ করার সাহস কোন ভাবেই দেখাতে পারেনা, তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত বলেই দুদক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি জামিনের বিরোধীতা করে আসামিকে জেল হাজতে প্রেরণের জন্য আবেদন জানান। এ সময় অনেক আইনজীবী স্বেচ্ছায় দুদকের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। এসব আইনজীবীর মধ্যে অতিরিক্ত পিপি এড. ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, সাতক্ষীরার স্বাস্থ্য বিভাগে ইতোপূর্বে এতবড় দুর্নীতি দেখা যায়নি, ডাক্তার তৌহিদ সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন অফিসটাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন, তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়া উচিত। এ সময় এড. খায়রুল বদিউজ্জামান বলেন, বালিশ কান্ড এবং পর্দা কান্ডকেও হার মানিয়েছে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন অফিস। তিনি আরও বলেন, আসামি পক্ষ হতে সিভিল সার্জনের দায়িত্বে অবহেলার কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয়েছে। সাতক্ষীরার ২২ লক্ষ্য মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তামাশা করার অধিকার এই আসামির নেই। এজন্য তাঁকে বাইরে না রেখে জেলখানায় রাখা উত্তম। বিচারক শেখ মফিজুর রহমান এসব আইনজীবীর বক্তব্যও মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং সবশেষে আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

প্রকাশ থাকে যে, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬ কোটি ৬১ লাখ ৩১ হাজার ৮২৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দূর্নীতি দমন কমিশন প্রধান কার্যালয় ঢাকার উপ সহকারি পরিচালক জালাল উদ্দীন বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামী করে স্পেশাল ২৫/১৯ নম্বর ওই মামলাটি দায়ের করেন।

উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য বিভাগের কলঙ্ক দূর্নীতিবাজ ফজলুল হকের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৭ কোটি ৯৯ লক্ষ ৯৮ হাজার ৬৪৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা আরও একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সে শ্যামনগর উপজেলার ইছাপুর গ্রামের মৃত আজিজুল হকের পুত্র।