জেলায় কর্মক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্তা বাড়লেও কমছে না বৈষম্য


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ বাড়লেও কমেনি মজুরি বৈষম্য। পুরুষ নির্ভরশীলতা কমিয়ে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। জেলাতে ক্রমেই নারী শ্রমিকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সারা বছর কাজ না থাকায় পুরুষেরা পেশা বদল করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও নারীর সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এক সময় এ অঞ্চলে পুরুষেরা পাট চাষ করতো। কিন্তু এখন পাটের দাম তুলনামূলক কম থাকায় কম মজুরিতে মহিলা শ্রমের চাহিদা বাড়ছে ক্ষেত মালিকদের কাছে। ক্ষেত মালিকরা বলছে পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকের মজুরি কম। তাই জেলায় এক কৃষিতে নারী শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি।

স্বামীর মৃত্যুর তিনদিন পর শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে রোকেয়া বেগম। চলতি মাসের ৫ তারিখে তার স্বামী হার্টএ্যাটাকে মারা যান। সে সময় তার ঘরে এক দিনেরও খোরাকি ছিল না। প্রথম তিন দিন পাড়া প্রতিবেশিরা খেতে দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে লোকের ক্ষেতে কাজ করছি। বললেন- সদর উপজেলার আগরদাড়ি ইউনিয়নের বকচরা গ্রামের সদ্য প্রয়াত আকবর আলীর স্ত্রী রোকেয়া বেগম। বয়সের ভারে শরীরের চামড়াও গুটিয়ে গেছে তার। মাথার চুলও পেঁকে সাদা হয়ে গেছে। একটি ছেলে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন রোকেয়া বেগম। অভাবের তাড়নায় ছেলেও তাকে দেখতে পারে না বলে জানায় রোকেয়া। শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে সাতক্ষীরা বাইপাস সড়কের পাশের বিলে পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর সময় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন বাবা, ছবি তুলছো কেনো? আমাকে কি কিছু দিবে ? আমি গ্রামের মহিলা। ছবি তোলার সাথে সাথে মুখের ঘোমটা টেনে দেয়। প্রতিবেদকের সাথে তিনি বললেন, স্বামী মরে যাওয়ার পর ঘরে কিছুই ছিলনা। কি করবো। জীবন যুদ্ধে চলতে গেলে মুখে কিছুতো দিতে হবে। লোকেরা কত দিন দিবে। বাধ্য হয়ে কাজে নেমে পড়লাম। যত দিন কাজ করতে পারবো ততদিন কাজ করবো। ভিক্ষা করতে ভাল লাগে না। বলেন, আল্লাহ যেন তাকে ভিক্ষা না করান।

জীবনের এমন সময়ে যখন শুয়ে বসে থাকার কথা, তখন রোকেয়া বেগম কাজ করে যাচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বলেছে একটা বিধবা ভাতার কার্ড করে দিতে। চেয়ারম্যান তাকে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু কবে দিবে কার্ড তা বলেননি চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান মজনুর রহমান মালি জানান, বিধবা ভাতার কার্ড আসলে চেষ্টা করবো। প্রতিদিন কাজ হয় না। এক আটি পাট ধুইলে ২০ টাকা। প্রতিদিন এভাবে পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে এক শ’ থেকে দেড় শ’ টাকা আয় করেন রোকেয়া।

রোকেয়ার সাথে পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন পাগলির মা ফজিলা বেগম। বয়স তার ৬৫ থেকে ৭০ এর কাছা কাছি। দুটি সন্তান তার। এক ছেলে এক মেয়ে। বললেন, ছেলে মেয়ে দু’জনই পাগল। ওদের বাপও প্রায় পাগল। তাই সংসারের ঘানি এখন তাকেই টানতে হয়। এমন বৃদ্ধা বয়সে শ্রম বিক্রি করা নজিরবিহীন। গলা পানিতে নেমে পাটের আঁটি টেনে আনা আর সেই আঁটি থেকে পাট ছাড়িয়ে পাটকাঠি বের করা কতনা কষ্টকর তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

ফজিলা বেগম বলেন, শুনেছি সরকার বয়স্কদের অনেক কিছু দেয়। কই আমি তো পাইনি! আমি এখনো কোন ভাতা পায়নি।

ফজিলার পাশে একই কাজ করছে আলেয়া বেগম। এক মেয়ে তার প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। তাকেও সংসার চালাতে লোকে ক্ষেতে কাজ করতে হয়। এমন অবস্থা এখন সাতক্ষীরা জেলার অনেকেরই।

বিশ্লেষকরা জানান, অর্থনৈতিকভাবে কিছু ব্যক্তির আয় বৃদ্ধি পেলেও গ্রামীন নারীদের আয়ের বৈষম্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে নামলেও প্রকৃত মজুরি পাচ্ছে না। এছাড়া গ্রামীন নারীদের স্বাবলম্বী করতে না পারলে অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে পড়বে।

মজুরি বৈষম্যের শিকার নারীদের দাবী, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে মজুরি বৈষম্য হ্রাস ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের আরো বেশি সম্পৃক্ত করা।