মহাশূন্যের ওজোন স্তারের ক্ষয় ও ক্ষতির প্রভাব


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান:
ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর বায়ু মন্ডলের একটি স্তর। যেখানে বেশী মাত্রায় ওজোন গ্যাস থাকে। এই স্তর স্ট্র্যাটেস্ফিয়ারের নিচের অংশে অবস্থিত। ভূ-পৃষ্ট থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার উপরে অবস্থিত ওজোন স্তর। পৃথিবীর ছাতা হিসেবে কাজ করে ওজোন স্তর। সূর্যের ক্ষতিকর বেগুনী রশ্মিকে পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দেয়না, যেমন রোদ কিংবা বৃষ্টির ভিতরে আমরা সুরক্ষিত থাকি। এটি হলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি প্রতিরোধক বায়ু মন্ডলের ওজোন স্তর।
মহাশুন্যের ওজোন স্তরের ক্ষয় ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা তৈরী করতে প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত পরিবেশ সুরক্ষায় মন্ট্রিল প্রটোকলকে কেন্দ্র করে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্য দেশেরমত বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস পালনের মাধ্যমে জনগনের মধ্যে ওজোন স্তর, ক্ষয় এবং এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে দিবসটি পালন করা হয়।
শিল্প বিপ্লব এবং মানুষের আধুনিক জীবনের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক থেকে নির্গত হচ্ছে সিএফসি (ক্লোরোফ্লুরো কার্বন)। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন ধরনের স্প্রে, পরিষ্কারক এবং রেফ্রিজারেটরে এসব ক্ষেত্রেই সিএফসি বেশি ব্যবহৃত হয়। শুধু সিএফসি নয়, মিথাইল, ক্লোরফর্ম কার্বন, টেট্রাক্লোরফাইড, হাইডো-ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, ব্রোমো-ক্লোরোফ্লুরো কার্বন এবং মিথাইল ব্রোমাইড এর ভুমিকায় ওজোন স্তর ক্ষয় সাধন হচ্ছে। তবে সিএফসি এর ভুমিকাই বেশি। সিএফসি বায়ু মন্ডলে অধিক স্থিতিশীল। এগুলো ভাঙ্গতে প্রায় ২০-১২০ বছর সময় লাগে। সিএফসি বৃষ্টির সাথেও নিচে পড়ে না। সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেটরে বা অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবেই কেবল ভাঙ্গতে পারে। সিএফসি ভেঙ্গে ক্লোরিন পরমানু মুক্ত হয় এবং মুক্ত কোরিন ওজন পরমানুর সাথে যুক্ত হয়ে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তাকে অক্সিজেনে পরিণত করে। ফলে কমতে থাকে ওজোন স্তরের ঘনত্ব। ওজোন স্তর পাতলা হয়ে পড়লে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীর বায়ু মন্ডলে প্রবেশ করে। আর এই অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীর সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি স্বরুপ। ওজোন স্তর ক্ষয়ে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে ক্যান্সার, চর্ম রোগ, চোখে ছানি পড়াসহ সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের ক্ষতি হয়। তাই ওজোন স্তর ও পরিবেশ সুরক্ষায় ফ্রিজ, এসিসহ এধরনের যন্ত্রে আধুনিক পরিবেশ বান্ধব গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, তা দেখে ক্রয় করে সেটি ব্যবহার করতে হবে।
ফরাসী পদার্থদিব চার্লস ফ্যব্রি এবং হেনরী বুইসন ১৯১৩ সালে ওজোন স্তর আবিস্কার করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ জি,এম,বি ডবসন ওজোন স্তর নিয়ে বিস্তর গবেশনা করেন। ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি ওজোন পর্যাবেক্ষন স্টেশন সমূহের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। ১৯৭৪ সালে ওজোন স্তর ক্ষয় হচ্ছে সেটি ধরা পড়ে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা যায়, বায়ু মন্ডলে ক্রমাগত ক্লোরোফ্লুরো কার্বন বা সিএফসি গ্যাস বৃদ্ধির ফলে ওজোন স্তর ক্ষয় হচ্ছে। আর মানুষের কর্মকান্ডে ক্রমাগত এই গ্যাস বেড়ে চলেছে। তাছাড়া বায়ু মন্ডলে পুঞ্জিভূত গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণের কারনে বৈষিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে নানা প্রকৃতিক দূর্যগের সৃষ্টি হচ্ছে।
১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বায়ু মন্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ের জন্য দায়ী দ্রব্যগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সিমিত করতে ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থের উপর মণ্ট্রিল প্রটোকল গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ১৯২০ সালে এই মণ্ট্রিল প্রটোকলে স্বাক্ষর করে। এর পর থেকে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
ওজোন স্তর ক্ষয় ও পাতলা হয়ে পড়লে সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি পৃথিবীর বায়ু মন্ডলে প্রবেশ করলে প্রাণীদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেযায়। বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগের সৃষ্টি হয়। স্কীন ক্যান্সার হতে পারে, বনজ সম্পদ ও কৃষি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। ক্ষুদ্র অনুজীব সমুদ্র শৈবল এবং প্লাংকটন নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রাকৃতির খাদ্যচক্রের ক্ষতি হতে পারে।
১৯৮৯ সালে মন্ট্রিল প্রোটোকল নামে সিএফসি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওজোন স্তর ক্ষয় রোধে সিএফসি ব্যবহার হ্রাস করে এইচসিএফসি ব্যবহার করা। যদিও এইচসিএফসি ক্ষতিকর তবুও সিএফসি থেকে অনেকাংশেই কম। শিল্প কারখানায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের গুরুত্বের সাথে বিষয়টি পালন করতে হবে। অপ্রয়োজনে কোন ধরনের স্প্রে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা। স্প্রে শেষ হয়ে গেলে ক্যানটি পোড়ানো যাবে না। পরিষ্কারের কাজে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার, জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। তাহলে ওজোন স্তর সুরক্ষা থাকবে এবং পৃথিবীর প্রাণীকুল সুস্থ্য থাকবে।
ওজোন স্তর প্রাণীকুলের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ। সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি শোসন করে নেয়। ওজন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মির শতকরা ৯৭-৯৯ ভাগই শোষন করে নেয়। যা কিনা ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থানরত উদ্ভাষিত জীবন সমূহের ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম। প্রতিনিয়তই বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তর মারাত্মক ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি গুলোকে প্রতিহত করে পৃথিবীর প্রাণীকুলকে রক্ষা করছে। লেখক: সাংবাদিক।