সৌদি আরবে হামলার অজুহাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে যুক্তরাষ্ট্র?


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ ||

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে যে উত্তেজনা চলছিল, সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ভয়াবহ হামলার পর তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। শনিবারের হামলার দায় ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে ওই হামলার পেছনে ইরান জড়িত। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হাজির না করলেও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দাবি করছেন, এমন হামলা চালানোর সক্ষমতা হুথিদের নেই। হামলাটি ইরাক বা ইরানের ভূখণ্ড থেকে চালানো হয়েছে। ইরাকি এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা ইরাকের একটি ঘাঁটি থেকে সিরিয়া চালানো সৌদি মদতে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী না করলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ কঠোর পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও উত্তেজনা নতুন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, সৌদি আরবে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। আবার কোনও বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানকে দোষারোপ করে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে এবং তেলের খনি দখল করবে।

শনিবার সকালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর মালিকানাধীন বড় দুটি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র আবকাইক-এ ড্রোন হামলার পর আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয় ইরান। হুথিদের অত্যাধুনিক ড্রোন নির্মাণেও সহায়তা দিয়েছে তেহরান। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দাবি করেছেন, ইয়েমেন থেকে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সৌদি আরব কেউই হুথিদের এই দাবিতে বিশ্বাসী নয়। এই হামলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরের মতোই ইরানকে দোষারোপ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেন, ইরান এখন বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ওপর আঘাত এনেছে। আর এই আঘাত যে ইয়েমেন থেকেই এসেছে তার কোনও প্রমাণ নেই। সৌদি আরবের বৃহৎ দুই তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার নেপথ্যে ইরানের জড়িত রয়েছে দাবি করে স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও মনে করেন, ড্রোন হামলায় ইরান জড়িত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ‘হামলার ব্যাপ্তি ও গতিপথের কারণে হুথি বিদ্রোহীদের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে’। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা হামলা ও লক্ষ্যবস্তুর ১৯টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। যা ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা নয়, সৌদি তেল স্থাপনার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক। কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই হামলাটি উত্তর উপসাগর, ইরান বা ইরাকের কোনও ঘাঁটি থেকে চালানো হয়ে থাকতে পারে। যদিও ইরাক তাদের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে এক ইরাকি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইকে বলেছেন, ইরাকি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। ইরাকি গোয়েন্দার মতে, সৌদি পৃষ্ঠপোষকতায় সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতেই দক্ষিণ ইরাকের হাসদ আল-শাবি’র ঘাঁটি থেকে ইরানি ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকেও তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। সেখানে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীরও। চলতি বছর প্রথম দিকে স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলেছিলেন সৌদি আরবের আফিফে হামলা চালানো ড্রোনটি ইরাকে তৈরি। কিন্তু সে সময়ও কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেননি তারা।
ড্রোন হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে সৌদি আরব। ভয়াবহ ওই হামলার পর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। এ সময় যুবরাজ ট্রাম্পকে সাফ জানিয়ে দেন, এ হামলার জবাব দিতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার টেলিফোনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যুবরাজের কথা হয়েছে। এ সময় এমবিএস জানান, ‘সন্ত্রাসী হামালা মোকাবিলায় রিয়াদ সক্ষম ও প্রস্তুত।’ যুক্তরাষ্ট্রের সৌদি দূতাবাসের এক বিবৃতি বলা হয়েছে, ট্রাম্প এমবিএস-কে জানিয়েছেন, ‘ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশটিকে সহায়তায় প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।’

এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরান-মার্কিন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নাশকতাকারীদের আমরা চিনি বলে বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে। নিশ্চিত হওয়ার পর মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযানের জন্য প্রস্তুত। তবে আমরা অপেক্ষা করছি সৌদি আরবের অবস্থান জানার জন্য। কোনও শর্তের ভিত্তিতে আমরা অভিযানে নামবো তা নিশ্চিত হতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ইরানে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার রাতেই তিনি টুইটারে লিখেছেন, ‘ইরান তাদের এমন ব্যবহার ততদিন থামাবে না যতদিন না হামলার ফল ভয়াবহ হবে’। তিনি পরামর্শ দেন ইরানের তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর জন্য। এতে করে দেশটির মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে।
মেগাআপলোড ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা কিম ডটকম রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক নিউজকে বলেছেন, এই ঘটনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দোষারোপ করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাবে এবং তেলের খনি দখল করবে।
এমন পরিস্থিতিতে চুপচাপ বসে নেই ইরানও। রবিবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর কমান্ডার আমিরআলি হাজিজাদেহ বলেন, ‘সবার জেনে রাখা উচিত, ইরানের চারপাশে দুই হাজার কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে আমেরিকার সব ঘাঁটি ও বিমান ক্যারিয়ার। সেগুলো আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে। ইরান সবসময়ই পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’