ক্যাসিনোর টাকা পাঠাতেন সাঈদের কাছে: অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাংকে লোকমানের ৪১ কোটি টাকা


প্রকাশিত : September 27, 2019 ||

অনলাইন ডেস্ক: মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও পরিচালক। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তি মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া নিজেই একজন ক্যাসিনো ডন। মোহামেডান ক্লাবে ক্যসিনো ভাড়া দিয়ে অর্থ আয়ের কথা বলে তিনি নিজেই কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। সেই অবৈধ অর্থ আবার পাচার করেছেন বিদেশে। অস্ট্রেলিয়ার দুটি ব্যাংকে তার নামে জমা হয়েছে অন্তত ৪১ কোটি টাকা।
মতিঝিলে ক্যাসিনো পাড়ায় অভিযানের পর সামনে আসে এই লোকমানের নাম। আলোচনার মধ্যেই বুধবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ৪১ কোটি টাকা পাচারের। তদন্ত সূত্র বলছে, এছাড়া ক্যাসিনো ও ক্লাব ব্যবহার করে তিনি কি পরিমান অর্থ কামিয়েছেন তার হিসাব নিকাষ চলছে। গতকাল তাকে তেজগাঁও থানায় হস্তান্তর করা হয়। আজ তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। তার বিরুদ্ধে মাদক আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। র‌্যাব সূত্র জানায়, ২১ লাখ টাকায় ক্লাবে ক্যাসিনো ভাড়া দেন লোকমান হোসেন।
সেই ক্যাসিনো থেকে তিনি কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। অবৈধ ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকা এবং তা থেকে আয়কৃত টাকা তিনি অস্ট্রেলিয়ার দুইটি ব্যাংকে রেখেছেন। তিনি ক্যাসিনোর টাকা পাঠাতেন আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি স্থানীয় কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদের কাছে। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবের কাছে এ কথা জানান লোকমান। বুধবার রাতে মনিপুরী পাড়ার বাসা থেকে মাদকসহ লোকমানকে আটক করে র‌্যাব-২ এর একটি দল।
গতকাল সকালে রাজধানীর শেরেবাংলানগরে র‌্যাব-২ এর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের কাছ থেকে মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার নাম উঠে আসে। তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের ইনচার্জ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক। লোকমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হওয়ার কারণে আমরা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত শুরু করি। তদন্তে তার ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর তাকে তেজগাঁও মনিপুরী পাড়ার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে পাঁচ বোতল বিদেশি মদ পাওয়া যায়। অনুমোদন ছাড়াই এই মদ অবৈধভাবে বাসায় রেখেছিলেন তিনি। তা ছাড়া তার মদপানের লাইসেন্স নেই।
গ্রেপ্তার করার পর তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি আরও বলেন, লোকমান ঢাকা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম-সম্পাদক ডিএনসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ কে এম মহিদুল হক ওরফে সাঈদের কাছে মোহামেডান ক্লাবটি ক্যাসিনোর জন্য ভাড়া দেন। সাঈদ প্রতিদিন লোকমানকে ৭০ হাজার করে টাকা দেন। যা প্রতি মাসে ২১ লাখ টাকা। মোহামেডান ক্লাবের অবৈধ ক্যাসিনো ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন তিনি। মূলত ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি আরও জানান, মোহামেডান ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন লোকমান। তার এ টাকা অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ ও এএনজেড ব্যাংকে রাখা আছে। অস্ট্রেলিয়ায় তার ছেলে অধ্যয়নরত থাকার কারণে সেখানে টাকা রাখাকে নিরাপদ মনে করেন। লোকমানও মাঝেমাঝে অস্ট্রেলিয়ায় যেতেন।
আশিক বিল্লাহ আরও জানান, আমরা প্রথম থেকেই লোকমানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছিলাম। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হলে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলায় অবস্থান করছিলেন। বুধবার রাতে র‌্যাব গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, তিনি তার বাসায় এসেছেন। এসময় ৪ লিটার মদসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনেক তথ্য গোপন করেছেন। তার নামে তেজগাঁও থানায় মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনের মামলা করা হবে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে বিস্তারিত জানা যাবে।
তিনি আরও জানান, যুবলীগ নেতা সাঈদ আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি। তাছাড়াও বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। তিনি যুবলীগেরও নেতা। তিনিও ক্যাসিনোবাণিজ্যে জড়িত। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আছে। র‌্যাব জানতে পেরেছে তিনি বিদেশে আছেন। দেশে আসলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও জানান, লোকমান ক্যাসিনোর টাকা পাঠাতেন আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদের কাছে। সাঈদের মাধ্যমে টাকা কোথায় রাখতেন, দেশে না কি বিদেশে পাঠাতেন, সে বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অবৈধভাবে ক্যাসিনো চলার বিষয়টি ঐতিহ্যবাহী এ ক্লাবের গভর্নিং বডির সদস্যরাও জানেন। তবে তারা কতটুকু জড়িত বা টাকার ভাগ পান কী-না এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। মোহামেডান গভর্নিং বডির আর কাউকে আটক করা হবে কী-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, লোকমান আটক হওয়ার পর ক্লাবের গভর্নিং বডির সদস্যরা র‌্যাবের নজরদারিতে আছে। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে তাদের আটক করা হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ক্যাসিনো কিং খালেদের সঙ্গে লোকমানের কোন লিঁয়াজো ছিল কী-না অন্য প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সাঈদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা জানালেও খালেদের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে লোকমান র‌্যাবের কাছে দাবি করেছেন।
মোহামেডান ক্লাব সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৪ থেকে ১৫ মাস ক্যাসিনো চলেছে মোহামেডানে। এই সময়ে ক্লাব ফান্ডে মাত্র ২০ লাখ টাকা গেছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ লোকমানের পকেটে গেছে। মোহামেডান ক্লাবের দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাবপত্র অনুযায়ী, দেখাগেছে গত ৩১শে জানুয়ারি ক্লাবের আয় ছিল ৫১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সেদিন ব্যয় হয় ৩৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সবাইকে ‘ভাগ’ দিয়ে তাদের লাভ হয় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। জুয়া খেলতে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর সুযোগ করে দিয়ে মোহামেডান ক্লাব থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পেত পুলিশ। ক্লাবের দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাবপত্রে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এই হিসাবপত্রে ‘বিজনেস প্রমোশন’ নামে একটি খাত রয়েছে। এই খাতে খরচ হতো প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা, যা পুলিশসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা পেতেন বলে ক্লাবের কয়েকজন কর্মচারী ও জুয়াড়িরা জানিয়েছেন।