পানিফল চাষ: অফুরন্ত সম্ভাবনা


প্রকাশিত : অক্টোবর ৪, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান: পানিফল একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। এর ইংরেজি নাম ডধঃবৎ পযবংঃহঁঃ এবং উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ঞৎধঢ়ধ নরংঢ়রহড়ংধ। পানিফল স্থানভেদে ডধঃবৎ পধষঃৎড়ঢ়, নঁভভধষড় হঁঃ, ফবার ঢ়ড়ফ নামেও পরিচিত। পানি ফলের আদিনিবাস ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা হলেও এর প্রথম দেখা পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকায়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু জায়গায় পানিফলের গাছকে আগাছা হিসেবে গন্য করা হয়। জানা যায় যে, প্রায় তিন হাজার বছর পূর্ব থেকেই চীনদেশে পানিফলের চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় বাণিজ্যিকভাবে পানিফলের চাষ শুরু হয়েছে।

পানিফল একটি বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। জলাশয় ও বিল-ঝিলে এ ফলটি জন্মে। এ গাছের শিকড় থাকে কাদার মধ্যে, কান্ড থাকে পানিতে ডুবে, আর পাতা পানির উপর ভাসতে থাকে। পাতা দেখতে অনেকটা কচুরিপানা পাতার মতো, তবে ছোট ও পুরু এবং গাঢ় সবুজ। পাতায় শিরা তেমন চোখে পড়ে না। পাতা ৮ সে. মি. লম্বা ও পাতার কিনারা খাজকাটা, প্রায় ৬ সে. মি. চওড়া হয়। পাতার বোঁটা পশমযুক্ত। কান্ড নলাকার দড়ির মতো, পেন্সিলের মতো মোটা হয়। এক একটি গাছ প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পানি ফলের আরেক নাম ‘শিংড়া’। ফলগুলোতে শিংয়ের মতো খাঁজকাটা থাকে বলেই এরকম নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কোথাও কোথাও একে ‘পানি সিংগাড়া’ নামেও ডাকা হয়। বীজ থেকে পানিফলের গাছ জন্মে। সাধারণত পাকা ফলের বীজ প্রথম দু’ বছরের মধ্যেই গজিয়ে যায়। তবে বারো বছর পর্যন্ত পনিফলের বীজ গজানোর ক্ষমতা রাখে। পানিফলের ফুল ক্ষুদ্রাকার ও সাদা রঙের। ফুল উভলিঙ্গি। ফলচাষ শুরু হয় জুন-জুলাই মাসে এবং ফল সংগ্রহ শুরু করা হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে।

পানিফল কচি অবস্থায় লাল, পরে সবুজ এবং পরিপক্ক হলে কালো রং ধারণ করে। ফলটির পুরু নরম খোসা ছাড়ালেই পাওয়া যায় হৃৎপিন্ডাকার বা ত্রিভুজাকৃতির নরম সাদা শাসঁ। কাঁচা ফলের নরম শাসঁ খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রতি ১০০ গ্রাম পানিফলে ৮৪.৯ গ্রাম পানি, ০.৯ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ২.৫ গ্রাম আমিষ, ০.৯ গ্রাম চর্বি, ১১.৭ গ্রাম শর্করা, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.১১ মিলি গ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ ও ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। তাছাড়া এ ফলে ৬৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পানিফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে। দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলোর মধ্যে ক্যালসিয়াম অন্যতম। ফসফরাসের সহযোগিতায় শরীরের হাড় ও দাঁতের গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। লৌহ অত্যন্ত জরুরি একটি খনিজ লবন। লৌহের অভাবে মানবদেহে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। ছোট ছেলেমেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজে এ রোগের শিকার হয়। পানি ফলে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পানি ফলে ভিটামিন ‘সি’ এর পরিমাণ ১৫ মিলিগ্রাম। আর শসাতে আছে ভিটামিন ‘সি’ মাত্র ৫ মিলি গ্রাম। ভিটামিন ‘সি’ শরীরে চামড়া, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ অন্ত্রে লৌহ শোষণে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৩ ভাগ পরিবার ভিটামিন ‘সি’ এর অভাবে ভুগছে। খাদ্যে ভিটামিন ‘সি’ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি বিবেচনা করে এ ফলের প্রতি আমাদের অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বস্তুতঃ পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ফলের গুরুত্ব খুব বেশি। আদিকাল থেকেই ফল মানুষের উত্তম খাবার হিসেবে পরিচিত। ফলে সব ধরণের পুষ্টি উপাদান কম-বেশি রয়েছে। তবে ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ খুব বেশি থাকে। ফল আমরা কাঁচা বা পাকা অবস্থায় সরাসারি খেয়ে থাকি। তাই ফলের ভিটামিন বা খাদ্যমানের অপচয় হয় না। এছাড়া ফল থেকে পাওয়া শর্করা, আমিষ ও ¯েœহজাতীয় পুষ্টি উপাদানগুলো সহজেই হজম করা যায়। উন্নত দেশের লোকজন প্রচুর পরিমাণে ফল খেয়ে থাকেন। আমাদের দেশের লোকজনের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্য ভাল হওয়ার ইহা অন্যতম কারণ। দেহের ক্ষয়পূরণ, পুষ্টিসাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য প্রতিদিন আমাদেরও পানিফলসহ অন্যান্য ফল বেশি করে খাওয়া প্রয়োজন।

পানি ফল কাঁচা খাওয়া হয়, তবে সিদ্ধ করেও খাওয়া যায়। কাঁচা পানিফল বলকারক দুর্বল ও অসুস্থ মানুষের জন্য সহজপাচ্য খাবার। ফলের শুকনো শাঁস রুটি করে খেলে এলার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগ উপশম হয়। পিওপ্রদাহ, উদরাময় ও তলপেটের ব্যথ্যা উপশমে পানিফল খাওয়ায় প্রচলন রয়েছে। বিছা পোকা কামড়ের যন্ত্রনায় থেঁতলানো কাঁচা ফলের প্রলেপ দিলে  উপকার পাওয়া যায়। চীনের বেশ কিছু খাবার তৈরিতে পানিফল ব্যবহার করা হয়।

পানিফল খুব লাভজনক একটি ফসল। এর উৎপাদন খরচ খুব কম। চারা রোপণের ৯০-১০০ দিন পর থেকে পানিফল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ৫০-৬০ মণ পানিফল উৎপন্ন হয়। সাতক্ষীরা জেলার সদর, কলারোয়া, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় জলাবদ্ধ এলাকার চাষিরা পানিফল চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন। ফলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ফলের চাষ। জানা যায়, এ বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৭১ হেক্টর জমিতে পানি ফলের চাষ হয়েছে। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এ ফল সবার কাছে পরিচিত না হলেও ক্রমশ: এ ফলের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়কের দু’ধারে চোখে পড়ে এই পানিফল। এ জেলার হাটবাজারে ও ফুটপাতে ছাড়াও ক্ষেত থেকে তুলে মহাসড়কের ধারে পানিফল বিক্রি করতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের। প্রতি কেজি পানিফল স্থানভেদে ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হয়। সাতক্ষীরায় উৎপাদিত ফলটি এখন জেলার চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। লাভ বেশি হওয়ায় পানি ফলের চাষ দিন দিন বাড়ছে। এতে জেলায় কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে। অপরদিকে বেকারত্ব দূর হচ্ছে।

এই সোনালি সম্ভাবনাকে ফলপ্রসূ করার জন্য পানিফল চাষাবাদের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি সাতক্ষীরা জেলার জলাবদ্ধ পতিত জমির সদ্ব্যবহার, জনসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে পানিফল চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ, ফল বাজারজাতকরণ ও তত্ত্বাবধায়নের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা একান্ত আবশ্যক। লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা