কাশী বিশ্বনাথ দর্শন


প্রকাশিত : অক্টোবর ৫, ২০১৯ ||

 

মঙ্গল কুমার পাল

তীর্থ শব্দের অর্থ হচ্ছে পবিত্র স্থান বা পুণ্যস্থান। যেখানে গেলে মানুষ জানতে পারে ধর্মের হাজার হাজার বছরের দেব-দেবীর সত্য ইতিহাস। তীর্থ ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষ লাভ করে জ্ঞান এবং নির্বাণ। অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে লোভ,লালসা,কাম,ক্রোধ,

অন্যের হ্মতি না করা এবং ভোগ-বিলাসী জীবন ত্যাগ করে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হচ্ছে তীর্থ ভ্রমণের প্রধানতম উদ্দেশ্য। এমনই এক আকর্ষণ ও তীর্থ ভ্রমণের পূন্য বাসনায় গত ১৪/১০/২০১৮ তারিখ সকাল১১.৪০ মিঃ কলকাতা স্টেশন থেকে জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেসে বেনারসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। সাথে ছিল স্ত্রী এবং পুত্র। রাত ৩ টায় বারানসি স্টেশনে পৌছাই। ওখান থেকে একটা অটো নিয়ে গঙ্গার ঘাট চলে এলাম। কিছু সময় অবস্থান করার পর প্রভাতী আরতি শুরু হল এবং আস্তে আস্তে পূর্ব দিকে সূর্য উঠতে শুরু করলো। অপূর্ব এক দৃশ্য ফুটে উঠলো চারিদিকে। আরতি শেষ হলে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত গঙ্গার ধারে রাহুল গেস্ট হাউজে উঠলাম।                                                        বারাণসী বা কাশী ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা শহর। এই শহরেই ভারতের বিখ্যাত কাশী-বিশ্বনাথ মন্দিরটি অবস্থিত।স্কন্ধ পুরাণের কাশী খ-ে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উলে¬খ পাওয়া যায়। মন্দিরটি গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় কাশী বিশ্বনাথ মন্দির “জ্যোতিলিঙ্গ” মন্দির নামে পরিচিত শিবের বারোটা পবিত্রতম মন্দিরের অন্যতম। এই   মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব। তিনি বিশ্বনাথ বা বিশ্বেশ্বর নামে পূজিত হন। বারানসী শহরের অপর নাম কাশী। এই কারণে মন্দিরটি কাশী বিশ্বনাথ মন্দির নামে পরিচিত। মূল মন্দিরে প্রবেশ করতে হলে অনেক দূর পর্যন্ত সরু গলিপথ অতিক্রম করে যেতে হবে। অধিকাংশ সময়ই প্রচ- ভীড়। সারিবদ্ধ ভাবেই মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। সাথে মোবাইল, ক্যামেরা, ব্যাগ এবং অন্য কোনো জিনিস রাখা যাবে না। চেকিং ব্যবস্থা খুব কড়া। গলির ভিতরে দুধারে পূজার উপকরণ নিয়ে দোকান সাজিয়ে সব বসে আছে। আপনি পূজার উপকরণ কিনলে আপনার জুতা, ব্যাগ, মোবাইল সবকিছু রাখবার সুন্দর ব্যবস্থা তারা করে দেবে। মন্দির থেকে বের হয়ে আপনার জিনিসপত্র নিয়ে চলে যেতে পারবেন। প্রধান মন্দিরের মধ্যে ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ৯০ সেন্টিমিটার পরিধি বিশিষ্ট শিবলিঙ্গ রূপোর বেদীর উপর অবস্থিত। এখানে আরও কয়েকটি মন্দির আছে। মন্দিরগুলো হচ্ছে শানীশ্বর, বিরূপাক্ষ ও গৌরী। এখানে জ্ঞানবাপী নামে একটা ছোট কুয়ো আছে। কথিত আছে মন্দির আক্রমণ হলে প্রধান পুরোহিত জ্যোতিলিঙ্গটি রক্ষা করবার উদ্দেশ্যে সেটি সাথে নিয়ে কুয়োয় ঝাপ দিয়ে ছিলেন। প্রধান মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনা দিয়ে মোড়া। জানা যায় পাঞ্জাবের মহারাজ রঞ্জিত সিং প্রায় ১০০০ কেজি ওজনের সোনার পাত দিয়ে মন্দিরের উপরের অংশ মুড়ে দেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন  করলে মোক্ষ লাভ সম্ভব। প্রচলিত বিশ্বাস  বা কিংবদন্তি অনুসারে স্বয়ং মহাদেব এই নগরীর অভিভাবক এবং রক্ষাকর্তা। প্রচলিত বিশ্বাস পৃথিবী সৃষ্টির সময় সূর্যের প্রথম রশ্মি স্পর্শ করেছিল কাশীর ভূমি। কথিত আছে মহাভারতের পা-ব ভ্রাতারা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভ্রাতৃহত্যা ও ব্রহ্মহত্যা জনিত পাপ থেকে উদ্ধারের জন্য শিবকে খোঁজ করতে করতে এই শহরে উপস্থিত হয়েছিলেন। বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরে যাবার গলিপথে আছে অন্নপূর্ণা মন্দির। দেবীর মহিমা বৃদ্ধির জন্য স্বয়ং মহাদেব অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে ঐ মন্দিরে দেবী অবতীর্ণ হলেন। সেই থেকেই দেবী অন্নপূর্ণার পূজার প্রচলন বাড়ে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় অতীতে বহুবার কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও পুনর্নিমিত হয়েছে। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারাণী অহিল্যা বাঈ তৈরি করে দেন। বর্তমানে মন্দিরটি উত্তর প্রদেশ সরকার পরিচালনা করে আসছেন। প্রথম দিন অর্থাৎ ১৫/১০/১৮ তারিখ বিকালে মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্য  বের হলাম। প্রচুর দর্শনার্থী সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে। আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রথমে অন্নপূর্ণা মন্দির দর্শন করলাম এবং তারপর গেলাম বিশ্বনাথ মন্দিরে। মন্দির দর্শন করে একটু পায়ে হেঁটে চলে এলাম গঙ্গার ধারে দশাশ্বমেধ ঘাটে। বারানসির মূখ্য আকর্ষণ হচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ঘাট। ছোট বড় সব মিলিয়ে ৮৮ টি ঘাটের মধ্যে সর্বপ্রধান ঘাট হচ্ছে দশাশ্বমেধ ঘাট। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সবথেকে কাছাকাছি ঘাট এটি। পুরাণ মতে ভগবান ব্রহ্মা তাঁর দশটি অশ্ব দান করেন এই খানে। এই ঘাটে সকাল সন্ধ্যায় তীর্থ যাত্রীদের প্রচ- ভীড় দেখা যায়। এখানে এসে দেখতে পেলাম অপূর্ব দৃশ্য। হাজার হাজার ভক্ত উপস্থিত  হয়েছেন গঙ্গার ধারে এবং গঙ্গাবক্ষের নৌকার উপর। নৌকাগুলো রিজার্ভ করে নিয়েছে আরতি দেখবার জন্য। শুরু হলো সন্ধ্যা  আরতি। গঙ্গার ধার দিয়ে সারিবদ্ধভাবে তৈরি মঞ্চের উপর সাত জন পুরোহিত জ্বলন্ত প্রদীপ নিয়ে শুরু করলেন আরতি। অসংখ্য ভক্তের মধ্যে চারিদিকে যেন আলোর মেলা।অপরদিকেপিতৃ-পুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় গঙ্গার জলে ভাসানো হচ্ছে মাটির পাত্রে ফুল, মোমবাতি,ধূপ ইত্যাদি। গঙ্গার চারিদিকে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। আরতি শেষে গেস্ট হাউজে চলে এলাম। পরের দিন সকালে বের হলাম কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে পূজা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। গঙ্গাস্নান সেরে গত দিনের মতো  একই কায়দায় সারিবদ্ধভাবে অনেক ভীড়ের মধ্য দিয়ে মন্দিরে পৌছিয়ে পূজা দেওয়া হলো। এই সময় মন্দিরগুলো খুব সুন্দরভাবে দর্শন করলাম। পূজা দেওয়ার পর সকালের খাবার পর্ব শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম এবং পৌছে গেলাম হরিশ্চন্দ্র ঘাটে। ভাগ্য বিড়ম্বিত রাজা হরিশ্চন্দ্র রাজ্য ছেড়ে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে অনেক কষ্টে শূন্য হাতে কাশী পৌছালেন। কাশীতে গিয়েই দেখতে পেলেন বিশ্বামিত্র মুনি সেখানে উপস্থিত। মুনি বললেন, “দানের দক্ষিণা বাবদ আরও অর্থ দিতে হবে।” অবশেষে হরিশ্চন্দ্র স্ত্রী-পুত্রকে বিক্রি করে নিজেও ক্রীতদাস  হয়ে কাশীর শ্মশানে ডোমের কাজ করতে লাগলেন। পৌরাণিক কাহিনীতে উলে¬খিত কাশীর সেই শ্মশান ঘাট দর্শন করলাম। এর পর গেলাম সারনাথ বুদ্ধস্তুপ। সারনাথ বৌদ্ধ ধর্মের প্রাণ কেন্দ্র ছিল। বুদ্ধের প্রথম ধর্ম প্রচারের স্থান হিসেবে সারনাথ মহাতীর্থ স্থানের মর্যাদা লাভ করে। বুদ্ধত্ব লাভের পর বুদ্ধ এ স্থানে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের নিকট প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। সেদিন ছিল শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুনী এখানে বাস করতেন। অনেক প্রশস্ত একটি উদ্যান। চারিদিকে মনোরম পরিবেশ। কাশীতে চার দিন অবস্থান কালে অন্যান্য যে দর্শনীয় স্থান বা মন্দিরে গিয়েছিলাম তার মধ্যে দুর্গা মন্দির,সংকট মোচন মন্দির,কালভৈরব মন্দির,হনুমান মন্দির, সত্যনারায়ণ তুলসি মানস মন্দির, দ-পানি, অবিমুক্তেশ্বর,বিষ্ণু মন্দির উলে¬খযোগ্য। প্রসিদ্ধ এই কাশী বিশ্বনাথ ধাম দর্শন শেষে ১৮/১০/১৮ তারিখ কলকাতা এসে পৌঁছাই।