ঘোটকমুখী সিংহে দেবী দুর্গা


প্রকাশিত : অক্টোবর ৫, ২০১৯ ||

 

মিদহাদ আহমদ

শরৎ আর শিউলির মেলবন্ধন,আগমনীর বার্তা নিয়ে আসে।শরতের শারদীয় উৎসবই হলো বসন্তের বাসন্তী উৎসব।দেবী দুর্গা মর্তে আসেন মহিষাসুরমর্দিনী রূপে।দুর্গার সাথে থাকেন দুই পুত্র গণেশ আর কার্তিক।আর থাকেন দুই কন্যা ঘটের লক্ষী আর স্বরের সরস্বতী।দশ হাতে দশ অস্ত্রে সজ্জিত থাকেন মা দুর্গা।এই মা কখনো কন্যারূপে পূজিতা হন,আবার কখনও মাতৃরূপে।মা ভবানীর আরেক রূপ মা দুর্গা।দেবী দুর্গার ত্রিনেত্র।দেবী ত্রিনয়নী। দেবী কখনো মর্তে আসেন ঘোড়ায় চড়ে,কখনও বা নৌকায়, কখনও বা গজে, আবার কখনও বা সেই দেবী আসেন দোলায় বা পালকীতে চড়ে।দেবীর মর্তে দোলায় আসা মানেই ভূ-কম্পন,ধ্বংসযজ্ঞ। এসব কথা এখন থাক।

এখন বলি,দেবী দুর্গার বাহনের কথা।মহিষাসুরমর্দিনী দেবীর বাহন সিংহ।সিংহের গর্জন আর তেজের কথা সকলেরই জানা। তবে এইটা জানা আছে কি,এই সিংহই সেই কৃষ্ণচন্দ্রের শুরু করা শারদ উৎসবের সিংহ কি না?

না। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরে বসন্ত কালীন পূজা শরৎ কালে শুরু হয়। বসন্তের পূজা শরতে শুরু হওয়ারও একটা কারণ আছে। আগে বসন্তকালে বসন্তের মহামারী ছড়িয়ে যেত।বাসন্তী উৎসবের সময় রোগ-মহামারী সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। তাই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই বসন্তকালীন পূজা নতুন করে শুরু করলেন শরৎকালে। ব্যস।সে থেকেই দুর্গাপূজা শরৎকালীন পূজা।শারদীয় দুর্গোৎসব। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শুরু করা দুর্গাপূজার দুর্গা প্রতিমার বাহন ছিল ঘোটকমুখী সিংহ। ঘোটকমুখী সিংহ বলতে বোঝায়,শরীরের আকৃতি সিংহের মতো,আর মুখ হলো ঘোড়ার। হ্যাঁ।ঠিকই বলছি। কৃষ্ণচন্দ্রের শুরু করা দুর্গাপূজায় দেবীর বাহন ছিল ঘোটকমুখী সিংহ। এই ঘোটকমুখী সিংহেরও একটা ইতিহাস আছে। অনেক পৌরাণিক কাহিনী এবং পুরাণে বর্নিত আছে ঘোড়ার কথা। অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা তো সবারই জানা। এককথায় যুদ্ধ সম্পর্কিত সব ইতিহাসের সাথেই ঘোড়া জড়িত, সিংহ নয়।সেই মা দুর্গা যখন অসুরকে বধ করতে আসেন,তখন সেই অসুর বধে সিংহ নয় বরং ঘোটকমুখী সিংহ নিয়ে আবির্ভূতা  হন।

কলকাতার মিত্রবাড়ির দুর্গোৎসবের কথায় আসি। সেখানে সিংহের মুখ ঘোড়ার মতো। এমন ঘোটকমুখী সিংহ বাংলার অনেক বাড়িতেই দেখা যায়। মনে করা হয়, ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক এই ঘোড়া। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতীককেই দেবীর বাহন করা হয়েছে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেবদেবীরা কিভাবে দুর্গাপূজা করেছিলেন, তার একটি তালিকা এই পুরাণে পাওয়া যায়। তবে এই প্রসঙ্গে কোনো পৌরাণিক গল্পের বিস্তারিত বর্ণনা এই পুরাণে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে:

প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেন পরমাত্মনা।

বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে রাগম-লে।

মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা, দ্বিতীয়ত

ত্রিপুরপ্রেষিতেনৈব, তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা

ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেন শাপাদ্দুর্বাসসঃ পুরা।

চতুর্থে।পূজিতা দেবী ভক্ত্যা ভগবতী সতী।।

তদা মুনীন্দ্রৈঃ সিদ্ধেন্দ্রৈর্দেবৈশ্চ মুনিমানবৈঃ।

পূজিতা সর্ববিশ্বেষু বভূব সর্ব্বতঃ সদা।।

অর্থাৎ, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসম-লে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নতুন রীতি প্রচলন করে মহালয়ার দিন থেকে শুরু করলেন সকলের মঙ্গলকামনায় যজ্ঞ, টানা নবমী পর্যন্ত চলত সেই যজ্ঞ৷ কথিত আছে, মহালয়ার পর থেকে নাকি কখনও আগুন নিভতো না যজ্ঞের৷ দেবী এখানে রাজরাজেশ্বরী, শক্তির প্রতীক৷ তাই যোদ্ধাবেশী৷ দেবীর বাহন এখানে ঘোটকমুখী৷ এখনও সেই প্রথা মেনেই রাজবাড়িতে পুজো হয় একচালার যোদ্ধা দেবীর৷ প্রতিমার মাটি মাখতে ব্যবহার করা হয় শুধুমাত্র গঙ্গাজল৷ নবদ্বীপ থেকে নিয়ে আসা হয় সেই জল৷ আগে পুজোতে বাড়ির মহিলারা উপস্থিত থাকলেও প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় দেবীর সঙ্গে যাওয়ার নিয়ম ছিল না৷ তখন নীলকণ্ঠ পাখি দেবীপ্রতিমার সঙ্গে ভাসানে যেত৷ ভাসান হয়ে গেলেই সে ফিরে আসত রাজবাড়ির বারান্দায়; এরপর অন্দরমহলে শুরু হয়ে যেত বিজয়ার প্রস্তুতি৷ এখন আর রাজবাড়ির পুজোতে সেই জৌলুস না থাকলেও রয়ে গেছে আচার রীতি৷ এখনও দেবীর পুজোয় ব্যবহার করা হয় ১০৮ টি ফোটা পদ্ম৷ জল আনা হয় নবদ্বীপের গঙ্গা থেকে৷ আগে পুজোর পরে তৈরি হতো মাটির অসুর মূর্তি৷ রাজা তীর-ধনুক নিয়ে বধ করতেন তাকে৷ সে রীতিও এখন আর নেই৷ তবে এখনও দেশ-বিদেশের লোক পুজোর সময় সকলে আমন্ত্রিত হন রাজ দালানে৷

যারা বৈষ্ণব তাদের দুর্গার বাহন হয় ঘোটকমুখী সিংহ।সেই প্রথাও আজ বিলুপ্ত। অনেকেই ইতিহাস এবং বনেদীয়ানা ধরে রাখার জন্য এখনও দুর্গা প্রতিমার বাহন সিংহের মুখ ঘোটকমুখী করে থাকেন, তবে তাও খুব একটা দেখা যায় না। কালের বিবর্তনে অনেকটাই হারিয়ে গেছে এই ঘোটকমুখী সিংহ। কৃষ্ণনগরের বনেদী পূজায় এই ঘোটকমুখী সিংহ দেখা যায়। কলকাতার আরও কয়েকটা বনেদী বাড়িতে দেখা যায় ঘোটকমুখী সিংহ। এই ঘোটকমুখী সিংহই প্রথমে ছিল পার্বতীর বাহন। অতঃপর সেই ঘোটকমুখী সিংহের জায়গায় আসে সিংহ।দেবীর বাহন সিংহ।

পুরাণ থেকে জানা যায় দেবীর বাহন রূপে সিংহকে দান করেছিলেন গিরিরাজ হিমালয়। কারন, অসুরদের নিধনে সহায়ক সিংহই সবচেয়ে বেশি।দেবীর বাহ্য লক্ষণের সাথে মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায় সিংহ বাহন কতটুকু যুক্তিযুক্ত।

দেবী নিখিল বিশ্বের সম্রাজ্ঞী, আর সিংহ পশুরাজ্যের সম্রাট। দেবী অস্ত্রধারিণী ,সিংহ দন্ত নখরধারী । দেবী জটাজুট সমাযুক্ত , সিংহ কেশরী, অর্থাৎ হিংস্রতায় দুজনেই সমযাত্রী ।

আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে শিক্ষা নিলে দেখা যায় সিংহ হিংস্রতায় পূর্ণ হয়েও দেবীর পদতলে নিত্য শরণাগতে কত অবিচল। তেমনি আমাদেরও উচিত মাতৃচরণের শরনাগত হওয়া। মায়ের লক্ষ্য জনকল্যাণ, সত্ত্বগুণময়ী মা রজোগুণময় সিংহকে বাহন নিয়ন্ত্রণ করে লোক স্থিতি রক্ষা করছেন।

রজোগুণের সঙ্গে তমোগুণের সমন্বয় হলে হবে লোকের অকল্যাণ। তাতে আসুরিকতা ও পাশবিকতার জয় হবে।এ আসুরিকতা ও পাশবিকতার সংহার করে, উচ্ছেদ করে লোকস্থিতি ও সমাজের কল্যাণকর কাজ সমাধা করতে চাই।

মা মহামায়া,মা ভবতারিণী, মা চ-ী যে রূপে কিংবা যে বাহনেই আসুন না কেন, দেবী হলেন মহিষাসুরমর্দিনী। মহিষাসুর বিনাশেই দেবী মর্তে আসেন।দেবীর রাঙা চরণে মর্তবাসীর অকল্যাণ দুর হোক। দেবীর চরণে অর্পিত হোক পুষ্প মাল্য। স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বল থাকুক দেবীর বাহন,ঘোটমুখী সিংহ,কিংবা পশুরাজ সিংহ।

মা নিখিলের সম্রাজ্ঞী। মা আলোর দিশারী।