সাতক্ষীরা পৌরসভার ১৫০ বছর এবং ঐতিহ্যবাহী পঞ্চ মন্দির


প্রকাশিত : অক্টোবর ৫, ২০১৯ ||

অরবিন্দ মৃধা: উন্নত নগর এবং নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি পৌরসভা বা পৌরনগর। সাতক্ষীরা পৌরসভার সাধ্যশতবর্ষ বা একশত পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়াটা সাতক্ষীরা জনপদের মানুষের ইতিহাস ঐতিহ্যের মুকুর (দর্শন)। মধ্যযুগে বঙ্গদেশের উন্নত সভ্যতার নিদর্শন বহন করে চলেছে এই জনপদের প্রাচীন যশোর রাজ্য বা যশোহর পরগণা, যার রাজা ছিলেন প্রতাপাদিত্য। সাতক্ষীরা অঞ্চলটি বাদশাহী আমলে বুড়ন পরগণা হিসেবে পরিচিত ছিল। এ জনপদের ‘যশোরেশ্বরী পীঠ’ প্রাগৈতিহাসিক কালের জনবসতির জানান দেয়। বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মিলেছে বগুড়া মহাস্থানগড়ের প্রতœত্বাত্ত্বিক খননে, যেটি খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের সভ্যনগরের নিদর্শন। এই সভ্যতা পুন্ড্রনগর সভ্যতা হিসেবে পরিচিত। সেই যুগে সুন্দরবনি এই জনপদ ‘পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির’ ব্যাঘ্রতট’ হিসেবে পরিচিত ছিল। মোঘল আমলে ‘ভূঁইয়া’ শাসকগণ স্তিমিত হলে ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানী নানা ‘ছলচাতুরির মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা চালায়, তাঁদের সাথে যুক্ত হয় দেশিয় এবং পারিবারিক বিভিষণগণ, ফলে ১৭৫৭ খ্রি. বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অকাল পতন ঘটে। ১৭৬৫ খ্রি. বাদশা শাহ্্ আলমের নিকট থেকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী গ্রহণ করে। ১৭৬৯ খ্রি. বাংলা ১১৭৬ সনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাংলায় ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয়, এটিই ছিয়াত্তরের মনান্তর নামে খ্যাত। ১৭৭২ খ্রি. ওয়ারেণ হোষ্টিংস গর্ভনর নিযুক্ত হয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে দেওয়ানী আদালত কলকাতায় স্থানান্তর করেন। তিনি রাজস্ব আদায় এবং জামিদারি শাসন ব্যবস্থায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাজস্ব আদায়ের জন্য কালেক্টর নিয়োগ করেন এবং ১৭৮১ খ্রি. মি. হেঙ্কেল জজ ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে মুড়লী (যশোর) আসেন।

১৭৮৬ খ্রি. যশোরকে পৃথক জেলা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় এটিই তৎকালীন বঙ্গদেশের প্রথম জেলা। তখন সাতক্ষীরা যশোর জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৮৪২ খ্রি. খুলনাকে মহাকুমা ঘোষণা করা হয়। এটিই বাংলার প্রথম মহাকুমা। ১৮৮৪ খ্রি. খুলনাকে পৌরসভা করা হয়। ১৮৮২খ্রি. সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা মহাকুমার সমন্বয়ে খুলনা জেলা গঠিত হয়। ১৮৬৩ খ্রি. চব্বিশ পরগণা জেলা হয়, তখন সাতক্ষীরা মহাকুমা ২৪ পরগণার অধীনে যায়। ১৮৪৫ খ্রি. মাগুরা মহাকুমা স্থাপিত হয়। নীল বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে কলারোয়াকে প্রথম মহাকুমা ঘোষণা করা হয়। তখন মহাকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন নবাব আব্দুল লতিফ। ১৮৬১ খ্রি. সাতক্ষীরাতে মহাকুমা কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়, এবং ১৮৬১ খ্রি. নড়াইল মহাকুমা হয়। ঝিনাইদহ ১৮৬২ খ্রি., বাগেরহাট ১৮৬৩ খ্রি. মহাকুমা হয়।

বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন এ জনপদের প্রাচীনত্বের স্মারক। উপকুলীয় সভ্যতার ঢাল বঙ্গপোসাগর নামটি ‘বঙ্গ’ ‘বঙলা’ ‘বাংলা’ নামের শিকড়। ১৮১৬ খ্রি. সুন্দরবন রক্ষণাপবক্ষণ, শাসনের জন্য সরকার রেভিনিউ বোর্ডের অধীনে কমিশন গঠন করে। ১৯০৫ খ্রি. সুন্দরবন রক্ষার কর্তৃত্বভার খুলনা, ২৪ পরগণা এবং বরিশাল জেলার কালেক্টরগণের উপর ন্যাস্ত হয়। সাতক্ষীরার সুন্দরবনি জনপদের ভাষা-সংস্কৃতি প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীনত্ব বহন করে।

১৮৫০ খ্রি. ইংরেজ সরকার মিউনিসিপালিটি আইন পাশ করে। ১৮৬৪ খ্রি. যশোর পৌরসভা গঠিত হয়। সাতক্ষীরা অঞ্চল মধ্যযুগ থেকেই সমৃদ্ধ, বহু জমিদার এবং প্রভাবশালী মানুষের বসবাস ছিল। সাতক্ষীরা উন্নয়নের প্রাণপুরুষ ছিলেন জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী। তাঁর সময়ে ১৮৬৯ খ্রি. প্রাণসায়েরের তীরে সাতক্ষীরা পৌরসভা গঠন হয়। এর আগে টাউনশ্রীপুর মিউনিসিপালিটি এ অঞ্চলের প্রথম পৌরসভা। মূল ফলক অনুযায়ী ১৮৬৭ খ্রি. টাউনশ্রীপুর পৌরসভা গঠিত হয় ১৯৫৫ খ্রি. পর্যন্ত কার্যকরী ছিল। দেবহাটা উপজেলার ইছামতি তীরবর্তী এই জনপদ ছিল একটি সমৃদ্ধ পৌরনগর। সাতক্ষীরা পৌরসভা প্রতিষ্ঠা এবং নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন জমিদার পরিবারকে কেন্দ্র করে সুচিত হয়েছিলো। জমিদারির শুরুতে তাঁরা জনকল্যাণ মুখী কাজের পাশাপাশি দেবদেবীর বিগ্রহ মন্দির ও জনকল্যাণমুলক কাজে যতœবান হন। প্রাণনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন আধুনিক সাতক্ষীরা জাগরণের প্রাণপুরুষ। তাঁর কর্মদক্ষতাবলে বৃটিশ সরকার কর্তৃক ১৮৬৯ খৃ. সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয় এবং প্রাণনাথই প্রথম মিউনিসিপ্যালিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে (১৮৬৯-১৮৯৪) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রাণনাথের পর তাঁর পৌর গিরিজানাথ রায় চৌধুরী (১৮৯৪-১৯০০) মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। পরে (১৯০৯-১৯১৫) পর্যন্তও গিরিজানাথ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে গিরিজানাথের পুত্র শৈলেজানাথ রায় চৌধুরী (১৯২৪-১৯২৭) পর্যন্ত এবং (১৯২৭-১৯৩২) পর্যন্ত গিরিজানাথের ভাইপো যতীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তদবংশীয় ভবেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ১৯৪৬ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৭ এর আগস্ট পর্যন্ত সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে উন্নয়নের জন্য বৃক্ষরোপন, রাস্তাঘাট, পুকুর খনন, শিক্ষা, বিনোদন, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চাসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে সাতক্ষীরায়। এসব কাজের পাশাপাশি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বহু অর্থ ব্যয়ে নিজ বাড়ী সংলগ্ন মন্দির চত্ত্বরে দর্শনীয় অন্নপূর্ণা মন্দির ও অন্যান্য মন্দির নির্মাণ এবং তাঁর সময়েই কালভৈরব ও গোবিন্দদেব মন্দির নির্মিত হয়। জমিদার পরিবারের বাইরে সেই কাল থেকে অদ্যাবধি যাঁরা সাতক্ষীরা পৌরসভার নির্বাচিত সভাপতি বা চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলেন এবং আছেন তাঁরা হলেন, হরিনাথ মজুমদার (১৯০০-১৯১১), হরিনাথ মজুমদার (১৯১৯-১৯২৪), দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় (১৯৩২-১৯৩৮), নিরোদচন্দ্র চট্টোপাধ্যয় (১৯৩৮-১৯৪০), লীলাপদ মজুমদার (১৯৪০-১৯৪৪), জনাব আব্দুল জব্বার খান (১৯৪৭-১৯৫২), জনাব আব্দুল গফুর (১৯৫২-১৯৭০), জনাব নুর আহমদ খান (১৯৭৪-১৯৭৭), জনাব মোজাহার আলী (১৯৭৭-১৯৮২), জনাব মোজাহার আলী (১৯৮৪-১৯৮৮), জনাব মোজাহার আলী (১৯৮৯-১৯৯১), জনাব আব্দুল জলিল (১৯৯৩-১৯৯৯), জনাব শেখ আশরাফুল হক (১৯৯৯-২০১১), জনাব আব্দুল জলিল (২০১১-২০১৬), জনাব তাজকিন আহমেদ ২০১৬ থেকে চলমান।

সাতক্ষীরা জমিদার বাড়ি পঞ্চ মন্দির:

সাতক্ষীরার জনহিতকর জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী এবং তার পিতা বিষ্ণুরাম রায় চৌধুরী এবং ভ্রাতুষ্পুত্রসহ পরিবারের অন্যান্যদের তত্ত্বাবধানে তাঁদের বাড়ি সংলগ্ন অঙ্গনে অন্নপূর্ণা, আনন্দময়ী, কালভৈরব শিবমন্দির এবং গোবিন্দদেব মন্দির নামে পাঁচটি অতি সুন্দর মন্দির নির্মিত হয়েছিল। দূরদর্শী কৃতীপুরুষ প্রাণনাথ এবং তাঁর ভাইপো দেবদ্বিজ ভক্ত, ধর্মনিষ্ঠ দেবনাথ রায় চৌধুরী পরবর্তীকালে তাদের জমিদারী পরগণা সাতক্ষীরার উন্নয়নের জন্য খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ, দীঘি খনন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিনোদন কেন্দ্র, অতিথিশালা, বৃক্ষরোপণ, ধর্মীয় উৎসব, মেলাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে স্মৃতিশ্রুতি ও লোকমুখে তাঁরা আজও কিংবদন্তিতুল্য হয়ে আছেন।

বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী, (জ. ১৭৬৪- মৃ. ১৮৪৪)। ইনি নদীয়ার খ্যাতিমান মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অধীনে একজন কর্মচারী ছিলেন এমন তথ্য পাওয়া যায়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মৃত্যুর পর (১৭১০-১৭৮২ খৃ.) নদীয়া রাজ্যের বিভিন্ন পরগণা নিলামে বিক্রি হয়। সম্ভবত তখন বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বুড়ন পরগণা ক্রয় করে বর্তমান সাতক্ষীরায় আসেন। স্বভাবতই উল্লেখ করা যায় ১৭৮২ থেকে বা সমসাময়িক সময়ে ১৭৯৪ এর মধ্যে বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বুড়ন পরগণায় এসে অবস্থান এবং জমিদারী পরিচালনা কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি রায় চৌধুরী উপাধি ধারণ করেন। এ সময় তিনি তালা খাজরাসহ কয়েকটি ছোট এলাকার জমি অর্জন করেন। বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী সে যুগের সপ্তসতী রাঢ়ী সমাজের ব্রাহ্মণ ছিলেন বলে জানা যায়। খৃষ্টপূর্ব ভারতবর্ষসহ বঙ্গদেশে যখন বৌদ্ধধর্ম প্লাবনে ভেসেছিল তখন ব্রাহ্মণগণ এদেশে ছিলেন না। আদিশুরের রাজত্বকালে কান্যকুঞ্জ থেকে ৫জন কুলীন ব্রাহ্মণ এনে বৈদিক ধর্ম ও যাগযজ্ঞের প্রচলন করা হয়। এ সময় সাতশতী বা সাতশত অকুলীন ব্রাহ্মণকে কুলীন মর্যাদা দিয়ে রাঢ়, গৌড়, বঙ্গদেশে পাঠানো হয়। এই সাতশতী ঘরানার ব্রাহ্মণ বিষ্ণুরাম বুড়ন পরগণার জমিদারী পরিচালনা শুরু করলে সাতশতীসাতঘরিসাতঘরিয়াসাতক্ষরিয়া থেকে সাতক্ষীরা নামের পত্তন হয়েছে। যদিও নামকরণ নিয়ে অনেক কীংবদন্তি আছে। তবে সাতক্ষীরা নামটি ১৮০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিষ্ণুরাম রায় চৌধুরীর জমিদারী আমলে বলে ধারণা করা হয়।

বিষ্ণুরামের দুইপুত্র রাধানাথ ও প্রাণনাথ। রাধানাথের পাঁচ পুত্র। এঁরা হলেন কাশিনাথ, দেবনাথ, পার্বতীনাথ, উমানাথ ও শ্যামানাথ রায় চৌধুরী। এঁরা পঞ্চনাথ সমিতি করে পৈত্রিক অংশের জমিদারী দেখাশুনা করতেন। আর প্রাণনাথের দুই পুত্র বৈদ্যনাথ ও শিবনাথ রায় চৌধুরী। এঁদের জমিদারী সম্পত্তি পরবর্তীতে দশ আনা ছয় আনা অংশে বিভক্ত ছিল বলে জানা যায়। তাঁদের পরবর্তী বংশধরগণ জমিদারী উচ্ছেদের আগ পর্যন্ত সাতক্ষীরায় জমিদারী করেছেন।যাইহোক সাতক্ষীরা জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিষ্ণুরাম এবং প্রাণপুরুষ জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী। তাঁদেরই আগ্রহে বাড়িতে রাসমঞ্চসহ পূর্বে উল্লেখিত মন্দিরগুলি নির্মাণ ও দেব বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরগুলির মধ্যে অন্নপূর্ণা মন্দিরটি অপূর্ব কারুকার্য খচিত অনিন্দসুন্দর দর্শণীয় একটি বিখ্যাত মন্দির। জমিদার বাড়ির মন্দিরগুলি বর্তমানে পুরাতন সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ি বা মন্দির নামে খ্যাত।

আনন্দময়ী বা কালীমন্দির: প্রাচীর বেষ্টিত সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ির মন্দিরে ঢুকতেই সামনে দেখা যাবে আনন্দময়ী কালীমন্দির। বর্গাকৃতির মন্দিরটির খোলা বারান্দায় তিনটি গেট। মূল মন্দিরের প্রবেশদ্বারে দাঁড়ালেই শঙ্ক, চক্র, মু-ু, পুষ্প/পদ্মধারী চতুর্ভুজা শান্তসৌম্য আনন্দময়ী জটাধারী মূর্তি শিববক্ষে আড়াআড়িভাবে উপবিষ্ট মায়ের দর্শন পাওয়া যাবে। জমিদার আমলে মাতৃমূর্তি পাথরের ছিল। ৭১ সালে সেটি খোয়া যায়। জানা গেছে, পরবর্তীতে ভগ্ন অবস্থায় মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়েছে। মন্দির দেওয়ালের বহিরাঙ্গণ কারুকার্য খচিত। ভিতরের বাম পার্শ্বে বারান্দার দেয়ালে শয়ন অবস্থায় গনেশ মূর্তি এবং ডান পার্শ্বে খোদাইকৃত পদ্মাসনে বসা চর্তুভূজি বিষ্ণুমূর্তি। মন্দিরটি স্থাপনকাল উল্লেখ করা হয়েছে ১২০১ সাল। সে মোতাবেক এই মন্দির ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটির মাপ ৩র্২-র্র্৪র্ ৪র্৬-র্২র্ ।

শিবমন্দির: আনন্দময়ী বা কালীমন্দিরের ঠিক পিছনে একরতœ বিশিষ্ট শিবমন্দির। এর গায়ে উল্লেখ আছে স্থাপনকাল ১২০১ সাল অর্থাৎ ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দ। মন্দিরটি ভূমি থেকে সমচতুষ্কোণ আকৃতি থেকে ছাঁদের অংশ গোলাকারভাবে চূড়া নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য শিব মন্দিরের সাদৃশ্যমান করে গাঁথুনীতে কারুকার্য করা আছে। মন্দিরের মধ্যে পাথরের শিবলিঙ্গ বিগ্রহ আছে। প্রতিদিন পূজা হয়। বিগ্রহটি পশ্চিমবাহী। দেখে বোঝা যায়, পরবর্তীতে সংস্কারকালে কিছু কিছু বিকৃত হয়েছে। শিব মন্দিরটি ১র্৫-র্৪র্ ১র্৫-র্৪র্  মাপের। স্বভাবতই প্রতীয়মান হয় বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী তন্ত্র বা শক্তির সাধক ছিলেন। তিনি বুড়ন পরগণার জমিদারী কার্য পরিচালনার সাথে সাথে বসত বাড়ীর সাথে নিত্য পুজোর জন্য প্রথমে কালীমাতা ও শিব বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন এবং তাঁর আমলে এই দুটি মন্দির হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর জমিদারী আমলে অন্নপূর্ণা, কালভৈরব ও গোবিন্দদেব বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ও মন্দিরগুলি পর্যায়ক্রমে নির্মিত হয়েছে। প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিজ্ঞানী শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্র উল্লেখ করেছেন, ‘প্রাণনাথের সময়ে তাঁহারই তত্ত্বাবধানে সাতক্ষীরার বাটিতে অন্নপূর্ণা, আনন্দময়ী ও গোবিন্দদেব এবং কালভৈরব প্রভৃতি বিগ্রহের জন্য সুন্দর সুন্দর দেব মন্দির ও রাস মন্দির নির্মিত হয়। অন্নপূর্ণা মন্দির দেশপ্রসিদ্ধ, দেবনাথই (রাধানাথের পুত্র) সাতক্ষীরা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ছায়াবৃক্ষ সমন্বিত রাস্তা প্রস্তুত করেন। দীঘিকা খনন করাইয়া তাহার কূলে দোলমঞ্চ টাউনহল ও অতিথিশালা প্রতিষ্ঠা করেন।’(তথ্যসূত্রঃ যশোহর খুলনার ইতিহাস ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৯৭৩। দেজ সংস্করণ- কলিকাতা বই মেলা, জুন ২০১৩।)এই দেবনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন দেবদ্বিজ ভক্ত এবং প্রজাহিতৈষী জমিদার। তিনি তাঁর কাকা প্রাণনাথের একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন, শিক্ষা সংস্কৃতি উন্নয়নসহ সকল ভাল কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। যাইহোক, অন্নপূর্ণা, কালভৈরব এবং গোবিন্দের মন্দিরসহ অন্যান্য ধর্মীয় এবং জনহিতকর কাজগুলি জমিদার প্রাণনাথ রায়চৌধুরী তাঁর বংশের অন্যান্যদের সময়ে স্থাপিত হয়েছে। কেননা-অন্নপূর্ণা ও কালভৈরব মন্দির স্থাপনকাল বিষয়ে মন্দিরের গায়ে লিখিত নিদর্শন আমরা দেখতে পায়নি।

কালভৈরব মন্দির: শিব মন্দিরের সামনে একই সমান্তরালে পশ্চিমপাশে প্রায় একই আকৃতিতে (একটু বড়) দ-ায়মান কালভৈরব মন্দির। এই মন্দিরের দেবতা কালভৈরব। বর্তমান মূর্তির অবয়বে লক্ষ করা যায় তাঁর ডান হাতে লাঠি, বাম হাতে গদা কাঁধে ধারণ করে শান্তসৌম্য মূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় পাগড়ীবাঁধা গেরুয়া রঙের বসন পরিহিত বিগ্রহ। এটি মূলত শিবমূর্তি। শিব বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পূজিত হচ্ছেন। এখানকার শিব কালভৈরবরূপী। বিগ্রহটির উচ্চতা র্৬-র্৩র্ । মন্দিরের সেবিকা রেণু দাস (৬৫) জানান, পূর্বে জমিদার আমলে কালভৈরব বিগ্রহ পাথরের ছিল। সেটি খোয়া যাওয়ার পর মন্দির পরিচালনা কমিটির ভক্তগণ সিমেন্ট দ্বারা একইরূপ বিগ্রহ তৈরী করেছেন। মন্দিরের মাপ ১র্৬-১র্৬। বিগ্রহটি দক্ষিণবাহী।

অন্নপূর্ণা মন্দির: সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ির মন্দিরমালার মধ্যে মনোরম অপূর্ব দর্শণীয় মন্দির হলো অন্নপূর্ণা মন্দির। তিন স্তর বিশিষ্ট সমচতুষ্কোণী বিভিন্ন কারুকার্য খচিত এই সুদীর্ঘ মন্দিরটি অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে মন্দির চত্ত্বরের মাঝখানে দ-ায়মান। মন্দিরটির সমস্ত অবয়ব জুড়ে খোদাই করে টেরাকোটা স্থাপন করা হয়েছিল। ফুল, ফলসহ চার যুগের বহু দেবদেবী, অবতার, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, কালি এবং তাঁদের অনুসঙ্গীগণের প্রতিবিম্ব দ্বারা। দেখেই বোঝা যায় এই কারুকার্যের শিল্পীগণ ছিলেন দক্ষ এবং বিচক্ষণ। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধান করলে সৃষ্টিতত্ত্বের অনেক রহস্য এই টেরাকোটার শৈল্পিক নিদর্শণ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।মন্দিরটির তিন স্তরে বিভক্ত। প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে একই সমান্তরালে দুটি করে ছোট চূড়া এবং তৃতীয় স্তরে অর্থাৎ মাথায় চূড়া গম্ভুজটি বড়। অর্থাৎ মন্দিটি পাঁচরতœ (চূড়া) বিশিষ্ট মন্দির। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরের দেয়াল গাত্রে লম্বাচুল বিশিষ্ট মানুষের চিত্র প্রতীয়মান হয়।

এই অন্নপূর্ণা মন্দিরের পূর্ব পার্শ্বে প্রবেশদ্বার আছে। এর সদর দ্বার কালিমন্দিরের ন্যায় দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত অর্থাৎ অন্নপূর্ণা দেবী দক্ষিণবাহী। মন্দিরের গায়ে নির্মাণ ফলক চোখে পড়েনি। এটি প্রাণনাথের জমিদারী আমলে নির্মিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাণনাথ রায় চৌধুরী (জ. ১৮০৯?- মৃ. ১৮৯৪?) জমিদারী দায়িত্ব গ্রহণের পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যুগে পৈত্রিক জমির অংশ ছাড়াও মলই (কপিলমুনি) ভেরচি, ম-লঘাট, বালা-া, উখড়াসহ কয়েকটি পরগণা নিলামে ক্রয় করে সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। সাতক্ষীরাকে সমৃদ্ধ জনপদরূপে গড়ে তোলা ও নৌ যোগাযোগের জন্য বিস্তীর্ণ খাল খনন করে বেতনা নদীর সাথে শহরের নৌ-সংযোগ করিয়ে দেন। যেটি প্রাণসায়ের নামে সর্বজনের কাছে পরিচিত। রাস্তাঘাট, ল্যাম্পপোস্ট, পিএন হাইস্কুল (১৮৬২) প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়ার্কস (১৯১৯) স্থাপন করা হয়।

বিষ্ণুরামের জমিদারী কবে শেষ হয়েছে এবং প্রাণনাথের জমিদারী কবে নাগাদ শুরু হয় সে বিষয়ে সঠিক তথ্য আজও উদঘাটন না হওয়ায় সময় নির্ধারণের বিষয়টি জটিল হয়েছে। তারপরও ধারণা করা হয় (১৮৩৫-৪০) খৃষ্টাব্দ নাগাদ অন্নপূর্ণা, গোবিন্দদেব ও আনন্দভৈরব মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছে। এসব কাজে তার ভাইপো দেবনাথ রায় চৌধুরী অন্যতম সহযোগী ও উদ্যোক্তা ছিলেন।

পঞ্চমন্দিরাঙ্গণের কালি ও শিব মন্দিরের স্থাপনকাল ১২০১ সাল উল্লেখ করা আছে, সে মোতাবেক মন্দির প্রতিষ্ঠাকাল হয় ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দে। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় উক্ত সময়টি বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীর জমিদারি, বসবাস এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাকাল? নাকি মন্দির প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের মতে ১২০১ সাল বা ১৭৯৪ খৃস্টাব্দ জমিদারী ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাকাল এবং বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীর সাতক্ষীরা বসবাস ও জমিদারীকার্য শুরু করার কাল। অর্থাৎ ধর্মপ্রাণ বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বাড়িতে আরাধ্য দেবদেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নবাগত হিসেবে সাতক্ষীরায় জীবনযাত্রা শুরু করেছিলেন। এই সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৪ এর মধ্যে কোন এক সময়ে তিনি বুড়ন পরগণার জমিদারী ক্রয় করেন। সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ীর মন্দিরগুলি নির্মাণ সম্পর্কে বিচক্ষণ ঐতিহাসিক শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্র একারণেই বলেছেন, “প্রাণনাথের সময়ে তাঁহারই তত্ত্বাবধানে সাতক্ষীরার বাড়ীতে অন্নপূর্ণা, আনন্দময়ী ও গোবিন্দদেব এবং কালভৈরব প্রভৃতি বিগ্রহের জন্য সুন্দর সুন্দর দেব মন্দির ও রাসমঞ্চ নির্মিত হয়” প্রাণনাথ রায় চৌধুরী (১৮৬৯-৯৪) পর্যন্ত সুদীর্ঘ কর্মজীবনে সাতক্ষীরা উন্নয়নে ২৫ বছর সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটির প্রেসিডেন্ট/চেয়ারম্যান হিসেবে জীবৎকাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি উদ্যমী, কর্মঠ এবং প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তার কর্মময় জীবনের আরও বহু ঘটনা রয়ে গেলো অগোচরে।

অন্নপূর্ণা মন্দিরটি শিব মন্দিরের উত্তরপার্শ্বে দীর্ঘ একরতœ বিশিষ্ট ব্যতিক্রমধর্মী মন্দির। এর নির্মাণশৈলীও অপূর্ব। নীচ থেকে পর্যায়ক্রমে গোলাকার আকৃতি উপরের দিকে সরু হয়ে চূড়ারতেœ মিশে গেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি প্রতœতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটি অধিগ্রহণ করেছে। মন্দিরটির মাপ ৪র্৭ উঁচু ও ২র্৪২র্২-র্৩র্  মাপের।

গোবিন্দদেব মন্দির: মায়ের বাড়ীর অন্নপূর্ণা মন্দিরের পার্শ্বে অর্থাৎ উত্তরপাশ্বে গোবিন্দদেব মন্দির। বর্তমান নাম ফলকে রাধাগোবিন্দ মন্দির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্র এটিকে ‘গোবিন্দদেব’ মন্দির হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নির্মাণকালে নামফলকে কি নাম ছিল সেটি সঠিকভাবে জানার উপায় নেই। কারণ মন্দিরটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ইট বালি খুয়ে খুয়ে (২০০০-২০০১) খৃষ্টাব্দ নাগাদ ভেঙ্গে পড়ে। পরবর্তীতে মন্দির পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে ফের মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরটির মাপ ২র্৮৩র্০-র্৪র্ , বারান্দা র্৯-র্১র্ ৩র্০-র্৪র্ । পুণঃনির্মাণকাল (২০০২-০৯)

জগন্নাথদেব মন্দির: গোবিন্দদেব মন্দির সংলগ্ন চত্ত্বরে মন্দির সমিতির উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে জগন্নাথদেব মন্দির। মন্দির এর চূড়া নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।

দূর্গা মন্দির: গোবিন্দদেব, জগন্নাথ মন্দিরের একই সমান্তরালে নির্মিত হয়েছে দুর্গা মন্দির। এটি মন্দির সমিতির উদ্যোগে (২০০২-২০০৯) সালে নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর এখানে সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে থাকে।

গ্রহরাজ (শনি) মন্দির: সাতক্ষীরা মায়ের বাড়ি ঢুকেই ডান পার্শ্বে দেখা যাবে একচূঢ়া বিশিষ্ট দর্শনীয় একটি আধুনিক মন্দির। এটির নাম গ্রহরাজ (শনি) মন্দির। দেবহাটা উপজেলার হিজলডাঙ্গা নিবাসী ধর্মপ্রাণ শ্রী সন্তোষ অধিকারীর উদ্যোগ ও অর্থায়নে মন্দির সমিতির সহযোগিতায় (২০০৯-২০১০) খৃষ্টাব্দে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে।

পুরাতন সাতক্ষীরার জমিদার বাড়ি পঞ্চ মন্দিরের মধ্যে দেশ বিখ্যাত অপূর্ব দর্শনীয় পঞ্চরতœ বিশিষ্ট অন্নপূর্ণা মন্দির, এটি বর্তমানে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র ঃ         ১.         যশোহর খুলনার ইতিহাস, শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্র, দেশ পাবালিকেশন, কোলকাতা।

২.         ঐতিহাসিক মন্দির দর্পন- অরবিন্দ মৃধা, প্রকাশনায়- ম্যানগ্রোভ, সাতক্ষীরা, প্রকাশকাল- ২০১৫ খ্রিঃ, সাতক্ষীরা।

৩.        ব্যাঘ্রতট পরিক্রমণ- শেখ মাসুম কামাল ও জ্যোতি চট্টোপাধ্যয়, প্রকাশনায় জেলা প্রশাসন, সাতক্ষীরা, প্রকাশকাল- ১৯৮৬।

৪.         সাতক্ষীরা জেলার ইতিহাস, মোঃ আবুল হোসেন, প্রকাশকাল- ২০০১, সাতক্ষীরা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক