দুর্গাপূজা হোক আমাদের নৈতিকতা শিক্ষার সূতিকাগার


প্রকাশিত : অক্টোবর ৭, ২০১৯ ||

ডা. সুব্রত ঘোষ:
শারদীয় দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। অনাদিকাল থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ পূজা করে আসছে। দুর্গাপূজার ইতিহাস জানতে পাই মার্কন্ডেয় পুরাণ, চন্ডীতন্ত্র শাস্ত্রে। দুর্গাপূজা পদ্ধতি অবলম্বনে বাঙালি হিন্দুরা যেভাবে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন তার কাঠামো হচ্ছে, দশ প্রহরণধারিণী সিংহবাহিনীর সঙ্গে ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, বিদ্যার দেবী সরস্বতী, দেব সেনা নায়ক কার্তিক ও সিদ্ধিদাতা গণেশ পুজিত। সবার ওপরে অবস্থান দেবাদিদেব মহাদেব। দুর্গার এই বৈশিষ্ট্যকে অনেকে সংসদীয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো বলে অভিহিত করেন।
দুর্গাপূজা এক সময় রাজা ও ধনী ব্যক্তিরা করলেও বর্তমানে ধনী-গরিব সকলের মহামিলনের ফলে সার্বজনিন রূপ নিয়েছে। দুর্গাপূজা একদিকে একক পরিবার প্রথা অন্যদিকে বিশ্ব পরিবারের একটি সুশৃঙ্খল প্রতিরূপ, সব ধরনের মুক্তি সংগ্রাম অত্যাচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে শক্তি সাহসের প্রেরণা দান, মানবতাবিরোধী জাতিভেদ প্রথার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। যুগ যুগ ধরে এ পূজা বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতিতে চলে আমায় এ দীর্ঘ কাঠামোতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ পরিবর্তন ও সংস্কার হিন্দু ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয়। দেবী দুর্গার আর্বিভাব তখনই হয়েছে যখন অন্যায়কারীদের কাছে যার যার ন্যায় ও সত্যবাদীরা পরাজিত হয়েছে। বাল্মিকী রামায়ণে দেখা যায়, রামের জয়লাভের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা দেবী দুর্গার স্তব করেছিলেন।
মহাভারতে পাওয়া যায়, কুরক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বে শ্রীকৃষ্ণের আদেশে অর্জুন দুর্গাদেবীর স্তব করেছিলেন শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থে বলা হয়েছে। শতবর্ষব্যাপী দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল, যুদ্ধে দেবতারা পরাজিত স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের শরণাপন্ন হয়ে প্রতিকার চাইলেন অসুরদের হাতে দেবতাদের নির্যাতনের কাহিনী শুনে প্রচন্ড ক্রোধ জন্মে। ক্রোধ থেকে তেজ আর তেজ রাশি মিলিত হয়ে এক নারীমূর্তির আবির্ভাব ঘটলো। সেই নারী মূর্তিই হলো দুর্গা। অত্যাচারী ভোনালিপ্সু মহিষাসুরের সঙ্গে দেবীর ভীষণ যুদ্ধ ও দেবশক্তির বিজয় অসুরদের বিনাশ অসুর শক্তির বিনাশে দেবগণ উল্লাসিত এবং দেবীর স্তুতি নিবেদন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। ‘হে দেবী আমার প্রতি প্রসন্ন হোন, অসুরদের বিনাশ করে আমাদের যেরূপ রক্ষা করলেন ভবিষ্যতের শত্রু জয় থেকে রক্ষা করবেন।’ সত্য যুগে দেখা যায় রাজা সুরথ সমাধি বৈশ্য সে যুগে সর্ব প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। ত্রেতা যুগে রাবণকে সংহার এবং সীতা উদ্ধারের জন্য দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। এ পূজা অকাল বোধননামে পরিচিত। দ্বাপর যুগে অর্জুনসহ পান্ডবদের দেবী দুর্গার স্তব প্রমাণ করে প্রাচীনকাল থেকে দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় পূজা।
মা দুর্গা বাঙালি হিন্দুর ভাবমূর্তিতে শিবের জায়া, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতীর জননী। তিনি তার পতিগৃহ কৈলাশে থাকেন। বছরের তিন ঋতুতে তিনি তিন রূপে আবির্ভূত হন। শরৎকালে শারদীয়, হেমন্তকালে ক্যাতায়ন পূজা ও বসন্তকালে বাসন্তী পূজা এই তিন ঋতুতে ভক্তরা এই তিন পূজা নামে করে থাকে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় শারদীয় পূজা। রাম চন্দ্র সীতাকে রাবণপুরী থেকে উদ্ধারের জন্য ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দেবীর যে পূজা করেছিল সেই শারদীয় পূজা প্রতি বছর মা দুর্গা তার সন্তানদের নিয়ে আশ্বিন মাসের ষষ্ঠী তিথিতে পাঁচ দিনের জন্য কৈলাশ থেকে মর্তে আসেন এবং পূজা শেষে চলে যান। জীবজগতের সুখশান্তি, অসুরদের বিনাশ এবং শরণাগতদের রক্ষার জন্য দেবীর দশহাত ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, তীক্ষèবাণ, শক্তি, ঢাল ধনু, পাশ, অংকুশ ও কুঠার এই দশ অস্ত্রে সজ্জিত থাকে। পৃথিবীতে যাওয়া- আসার পথে দেবী যে বাহন ব্যবহার করেন তার ওপরই জগতের শুভাশুভ নির্ভর করে।
দেবী দুর্গা বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও তিনি এক। কোথাও কোথাও শক্তি পূজা নামে পরিচিত। অনেকে শক্তির উপাসককে বিশেষ সম্প্রদায়ের বলে মনে করে অবমূল্যায়ন করে এটা ঠিক নয়। শক্তি পূজার ধারা চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রোম, গ্রিস, আফ্রিকা, মেক্সিকো প্রভৃতি স্থানে শক্তি পূজা বিভিন্ন দেবতার নামে প্রচলিত ছিল। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক দেবীমূর্তি। এই দেবী মূর্তিকেই দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
যেথায় দেবী দুর্গার আর্বিভাব হয়েছে সেখানেই দেখা গেছে ভক্তদের কাছে সর্বদাই শ্রেহময়ী জননী, কল্যাণ প্রদায়ণী মা, দুষ্টের বিনাশ করে কল্যাণ সাধনই তার উদ্দেশ্য। দেবী দুর্গাপূজার সময় ফল মিষ্টি প্রসাদ খাওয়া হয়, একই দিন পূজা বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। নাচ-গানে মুখরিত থাকে কিন্তু এগুলোই মুখ্য নয় তার উদ্দেশ্য অর্জনে কাজ করাই আমাদের কর্তব্য হওয়া উচিত।
আজ যখন আমরা দেবীর পূজা করছি তখন দেখতে পাচ্ছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদীদের অভয়ারণ্য হচ্ছে। চাঁদাবাজ-দুর্নীতি-ঘুষখোরেরা সমাজকে করছে কলুষিত। হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্ষমতার মোহ মানুষকে করেছে বিভাজন, সমাজ ক্ষত-বিক্ষত, জনজীবন দুর্গত। প্রতিদিন খুন-ধর্ষণ জবরদখলের অরাজকতায় নিমজ্জিত। সর্বত্র মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। মা দুর্গা দেবীর আশীর্বাদে সকলের দেহমন বিশুদ্ধ হোক, সত্য সুন্দরের আলোকিত হোক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, সবখানে ছড়িয়ে পড়–ক শান্তি সুখের বার্তাÑ এটাই দেবীর কাছে বিনম্র প্রার্থনা। লেখক: কলামিস্ট, চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং সংগঠক।