মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা. হজরত আলী: শুধু দেশকে দিয়েই গেছেন


প্রকাশিত : অক্টোবর ৯, ২০১৯ ||

নিয়াজ কওছার তুহিন: মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিতে আবেদন করার জন্য বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি একজন সংগঠক। তার হাত ধরে বহু যুবক সংগঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। তাই তিনি সংগঠক হিসেবেই থাকতে চেয়েছেন। এ কারণেই অন্যদের অনুরোধ স্বসম্মানে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন সনদ তিনি নেননি। তিনি আর কেউ নন। তিনি ডা. হজরত আলী। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাতক্ষীরা জেলা ইউনিট কমান্ডের সর্বশেষ সাবেক কমান্ডার মোশারফ হোসেন মশু এভাবেই তাঁর পরিচয় দেন। বলেন, আমার বহু অনুরোধ করেছি কিন্তু তিনি শোনেন নি।

কালিগঞ্জে সবাই তাকে চেনেন একজন জনদরদী চিকিৎসক হিসেবে, একজন জনদনদী মানুষ হিসেবে। কিন্তু এই মহান ব্যক্তিটি দেশকে পরাধীনতা গ্লানি থেকে মুক্ত করার জন্য অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। বিনিময়ে তার চাওয়া পাওয়া ছিল না কিছুই। দেশের জন্য এই অকৃত্রিম ভালবাসার বিষয়টি হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। যিনি অন্যের অসুস্থতার খবর পেয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে ছুটে যেতে যেতেন তিনি বর্তমানে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার সামর্থ্য না থাকলেও অনুভূতি শক্তি এখনও প্রখর।

উপজেলার ভাড়াশিমলা ইউনিয়নের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামে (উত্তর কালিগঞ্জ) শহীদ সামাদ স্মৃতি ময়দান সংলগ্ন ডা. হজরত আলীর বাড়ি। প্যারালাইজড অবস্থায় ওই বাড়িতে শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি। কথা হয় বড় ছেলে স্থানীয় জাফরপুর কাজী আলাউদ্দীন ডিগ্রী কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকবর আহমদ এর সাথে। পিতা ডা.হজরত আলীর কর্মময় জীবন সম্পর্কে তিনি জানান, ১৯৩০ সালে জন্ম হয় হজরত আলীর। পিতামহের নাম শের আলী। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তার পিতা ছিলেন সবার বড়। তাদের আদি নিবাস মথুরেশপুর ইউনিয়নের হাড়দ্দাহ গ্রামে। ১৯৮০ সালে নারায়ণপুরে বাসগৃহ নির্মাণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তার পিতা।

আকবর আহমদ জানান, তার পিতা দেবহাটার টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৫৫ সালে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এলএমএফ পাশ করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচীতে চলে যাান চাকুরির জন্য। ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে চাকুরি ছেড়ে করাচি থেকে বাড়িতে চলে আসেন। স্থানীয়দের চিকিৎসাসেবা দিতে থাকেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারী (এমবিবিএস) ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৬০ সালের ৮ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা লস্করপাড়ার বিয়ে করেন। তার মা’র নাম জান্নাতি বেগম। তিনি ২০০৮ সালে ৬২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ৩ ভাই যথাক্রমে আকবর আহমদ, জাহিদ আহমদ ও জাকির আহমদ এবং ৪ বোন যথাক্রমে রিতা, মিতা, মিনু ও শেলী। সবাই বিবাহিত। এর মধ্যে জাহিদ আহমদ বিপুল অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। ছোট ভাই জাকির আহমদ ব্যবসায়ী।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয়দফা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার সাথে সাথে সাথে মাঠে নেমে পড়েন ডা. হজরত আলী। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে কিছু সময়ের জন্য বঙ্গবন্ধু কালিগঞ্জ আসেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয় ডা. হজরত আলীর। এসময় তিনি বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে মুগ্ধ হন। সাধারণ নির্বাচন ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্বের নানা কুটচাল ও সার্বিক পরিস্থিতির সম্পর্কে খবর রাখার চেষ্টা করতেন সর্বদা। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে স্থানীয় অনেক যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকেন। ডা. হজরত আলী তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ট্রেনিং এর জন্য নাম তালিকাভুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে গঠন করেন সংগ্রাম পরিষদ। ১১ সদস্যবিশিষ্ট এই সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন ডা. হজরত আলী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাষ্টার জেহের আলী । ডা. হজরত আলীর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ নাম তালিকাভুক্ত করা সকলকে ভারতে ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে ২৭ মার্চ ডা. হজরত আলী নিজে সীমান্ত নদী ইছামতি পার হয়ে শুন্যেরবাগান শরণার্থী ক্যাম্পের ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি দেশে ফেরেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেন নি তিনি।

১৯৭২ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আবারও মানুষের চিকিৎসা প্রদান শুরু করেন। ২০০৭ সালে বসতবাড়ির পাশে পিতা শের আলীর নামে একটি ক্লিনিক স্থাপন করেন। ওই ক্লিনিকে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এর বাইরে সময় পেলে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিতেন। সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে তিনি তার মতামত প্লাকাডে লিখে একা একা দাড়িয়ে পড়তেন উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদমূখর। অসুস্থতাজনিত কারণে প্রায় ১ বছর যাবত বাইরে যাতায়াত একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে গত ৩ অক্টোবর ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এখন নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী। পিতার সুস্থতার জন্য আকবর আহমদ, জাকির আহমদ টুটুল, ছোট মেয়ে শেলীসহ পরিবারের সদস্যরা সকলের দোয়া ও আশির্বাদ কামনা করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ডা. হজরত আলীর ছোট মেয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান আহ্বায়ক ও তারালী ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন ছোট’র স্ত্রী শেলী জানান, শৈশব কাল থেকে তিনি পিতার নিকট থেকে তার তিনটি দৃঢ় বিশ্বাসের বিষয় শুনে আসছেন। প্রথমটি হলো- সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাস। তারপর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ এবং এই স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা (বিএলএফ কমান্ডার) খান আসাদুর রহমান জানান, ডা. হজরত আলী ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তার নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদে সদস্য ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে মাস্টার জেহের আলী (প্রয়াত), নাসির উদ্দীন (প্রয়াত), শেখ আতাউর রহমান (অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকতা), আব্দুল আফু প্রমুখ। সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে ডা. হজরত আলী মহান মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরো খবর: জীবনযোদ্ধা বীর: ডা. হজরত আলী

ডা. হজরত আলীর আশু রোগমুক্তি ও সুস্থ্যতা কামনা

ডা. হযরত আলীর শয্যা পাশে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক এমপি