জীবনযোদ্ধা বীর: ডা. হজরত আলী


প্রকাশিত : অক্টোবর ৯, ২০১৯ ||

জীবনযোদ্ধা বীর: ডা. হজরত আলী

রফিকুজ্জামান খোকন: ডাক্তার হজরত আলী। পিতা মৃত শের আলী গাজী। গ্রাম-হাড়দ্দহ, বসন্তপুর, মথুরেশপুর, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা। ৮৯ বছর বয়সী মানুষটি বর্তমানে বয়সজনিত কারণে নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত। তাঁর ঘটনাবহুল নির্লোভ জীবনের ঘটনা তুলে ধরতে লেখকের ক্ষুদ্র প্রয়াস।

স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই সাাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ নেতা এড. এএফএম এন্তাজ আলী, এড. মুনসুর আলী, কাজী কামাল ছট্টু ও আবু নাসিম ময়না পিএন স্কুলে একটি বৈঠক করেন। সাতক্ষীরায় স্বাধীনতা আন্দোলন গতিশীল করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ ঘোষিত সকল কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে এই কমিটি নব-নির্বাচিত এমপিএ স. ম আলাউদ্দীনকে কোলকাতায় পাঠান অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহের জন্য। সাতক্ষীরা মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন সৈয়দ কামাল বখত সাকী ও সাধারণ সম্পাদক এএফএম এন্তাজ আলী। থানাগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে নি¤œরূপÑ

কলারোয়া: মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এমপিএ ও শেখ আমানুল্লাহ

তালা: ডা. আক্তার হোসেন ও প্রদীপ কুমার মজুমদার।

আশাশুনি:  এসএম এ মহিদ ও নবাব আলী

দেবহাটা: মাষ্টার শাহজাহান আলী ও সনৎ কুমার সেন।

কালিগঞ্জ: ডা. হজরত আলী ও মাষ্টার জেহের আলী।

শ্যামনগর: শেখ আতিয়ার রহমান ও এমকে ফজলুল হক এমপিএ।

(স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান: স. ম. বাবর আলী)

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ডা. হজরত আলী ভারতের শুন্যেরবাগান শরণার্থী ক্যাম্পের বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে শিবির ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রকাশ থাকে যে উনি এই দায়িত্ব পালনের জন্যে কোন পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। বিকেল থেকে রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত ভারতের বরুণহাটে চেম্বারে রুগী দেখে যে আয় করতেন সেটা দিয়েই সংসার চালাতেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বসন্তপুরে তাঁর দোতলা পাঁকাবাড়ি পাকসেনারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এরপর কালিগঞ্জে তাঁর নিজস্ব চেম্বারও লুটপাট শেষে অগুন লাগিয়ে দেয় রাজাকারদের সহযোগিতায়।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে নিয়মিত পেশার অংশ হিসেবে আবার চেম্বার দিয়ে ডাক্তারি করতে থাকেন। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ডাক্তার হিসেবে সরকারি পদে চাকরির প্রস্তাবনা দেন। বিনয়ের সাথে তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।

অনুরূপভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম তালিকাভূক্তির জন্যে কোনো ফরম তিনি পুরণ করেননি বা কোনো ফরমে সই পর্যন্ত করেননি। প্রাক্তন উপজেলা কমান্ডার নাছির উদ্দিন, শেখ ওয়াহেদুজ্জামানসহ অনেকের অনেক অনুরোধ উপরোধ বিভিন্ন সময়ে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। তার একটাই কথা ‘ফরম পূরণ করে আমি কখনোই মুক্তিযোদ্ধা হবো না, তা ছাড়া আমিতো সংগঠক।’

১৯৭৫-এর পট-পরিবর্তনের পর দেশে যখন বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ সব শুভ চেতনার প্রায় মৃত্যুময় মুহূর্তÑসেই সংকটের সময়ে একজন সাহসী মানুষ কালিগঞ্জের ষষ্ঠিতলা মোড়ে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’ লেখা প্লাকার্ড ঝুলিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন বছরের পর বছর। মানুষটির নাম ডাক্তার হজরত আলী। এমন মনন মানস জীবনযোদ্ধা বীর কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা নয় দেশবাসীর গর্ব। আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তিনি চিরদিন। লেখক: মুক্তিযোদ্ধা