হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতির ধরণ ও সরঞ্জাম


প্রকাশিত : অক্টোবর ৯, ২০১৯ ||

জাহিদা জাহান মৌ: লবণ ছাড়া তরকারি আর চুন ছাড়া পানের যেমন স্বাদ পাওয়া যায়না, তেমনি বাদ্য বাজনা ছাড়া গানের সুর খুঁজে পাওয়া যায়না। গানের সুরের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে তাই খুঁজতে হয় বাদ্যযন্ত্র।

তবলা ঢোল এবং হারমোনিয়াম সংস্কৃতির বাংলা গানের অন্যতম উপকরণ। ঢাক বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে প্রধান। ঢাকের ব্যবহার অতি প্রাচীন। বড় আকারের কাঠের খোলের উভয় মুখে পুরু চামড়ার ছাউনি দিয়ে ঢাক তৈরি করা হয়। খোলটি আনুমানিক এক হাত ব্যাস ও দুই হাত দীর্ঘ হয়ে থাকে। মোটা ফিতার সাহায্যে বাম কাঁধে কোল বরাবর ঝুলিয়ে দুই হাতে কাঠির সাহায্যে এটি বাজাতে হয়।

বাংলায় ঢাক একটি জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র, তাই একে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে অনেক প্রবাদবাক্যের সৃষ্টি হয়েছে, যেমন: ‘ধর্মের ঢাক আপনি বাজে’, ‘নিজের ঢাক নিজেই পেটানো’, ‘ঢাক থুয়ে চন্ডী পাঠ’ ইত্যাদি। ‘গাজনের নাই ঠিক ঠিকানা/ ডাক দিয়ে কয় ঢাক বাজা না।’ মালদহে প্রচলিত এই প্রবাদে  গম্ভীরা নাচ-গানে ঢাক বাজানোর কথা আছে। ঢাকের ব্যবহার আজও বাংলার সর্বত্র অক্ষুণœ আছে। বিশেষত হিন্দুদের পূজামন্ডপে ঢাক ও কাঁসর বাদ্য আবশ্যিক। বড় আকারের ঢাক জয়ঢাক বা বীরঢাক নামে পরিচিত; এগুলি অতীতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।

ঢোল ঢাকের চেয়ে আকারে ছোট। চর্মাচ্ছাদিত এই যন্ত্রটির ব্যবহার অধিক। সঙ্গীত ও নৃত্যকলায় তালবাদ্য হিসেবে ঢোলের ব্যবহার ব্যাপক। কবি, যাত্রা,  জারি, গম্ভীরা,  আলকাপ প্রভৃতি গানে অন্যান্য যন্ত্রের সঙ্গে ঢোলও বাজে। পূজা, বিবাহ, মুহররমের শোভাযাত্রা, লাঠিখেলা, কুস্তির আখড়া সর্বত্র ঢোল বাজানো হয়। কিছুকাল আগে পর্যন্ত গ্রামেগঞ্জে ঢোল বাজিয়ে সরকারি পরোয়ানা জারি করা হতো। একে বলা হতো ঢোল-সহরত। দক্ষ ঢুলি বাদনের কৌশলে ঢোলে বিশেষ বোল তুলতে পারে।

ঢোল ঢাকের চেয়ে আকারে ছোট। চর্মাচ্ছাদিত এই যন্ত্রটির ব্যবহার অধিক। সঙ্গীত ও নৃত্যকলায় তালবাদ্য হিসেবে ঢোলের ব্যবহার ব্যাপক। কবি, যাত্রা, জারি, গম্ভীরা,  আলকাপ প্রভৃতি গানে অন্যান্য যন্ত্রের সঙ্গে ঢোলও বাজে। পূজা, বিবাহ, মুহররমের শোভাযাত্রা, লাঠিখেলা, কুস্তির আখড়া সর্বত্র ঢোল বাজানো হয়। কিছুকাল আগে পর্যন্ত গ্রামেগঞ্জে ঢোল বাজিয়ে সরকারি পরোয়ানা।

আকার ও প্রকারভেদে বাঁশির বিভিন্ন নাম আছে, যেমন: আড়বাঁশি, কদবাঁশি, টিপরাবাঁশি, হরিণাবাঁশি ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে আড়বাঁশি সর্বাধিক প্রচলিত। এর অপর নাম মুরলী, মোহনবাঁশি, বেণু প্রভৃতি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে কৃষ্ণের মুরলী বা মোহনবাঁশিকে আড়বাঁশি বলা হয়েছে। কৃষ্ণ এই বাঁশির সুরেই রাধার চিত্ত হরণ করেছিলেন। ময়মনসিংহের একটি লোকসঙ্গীতেও একথা বলা হয়েছে: ‘আষ্ট আঙ্গুল বাঁশের বাঁশী মধ্যে দিয়া ছেঁদা/নাম ধরিয়া ডাকে বাঁশী কলঙ্কিনী রাধা।’

কদবাঁশির মাথা তেরছাভাবে কেটে কাঠের পাতলা খিল আঁটা হয় এবং সেখানে ঈষৎ ছিদ্রপথে ফুঁ দিলেই এটি বাজে। এর নিচে চার কোনাকার একটি উন্মুক্ত বায়ুরন্ধ্র থাকে। অঞ্চলভেদে কদবাঁশির বিভিন্ন নাম আছে, যেমন: মুখের মধ্যে পুরে বাজাতে হয় বলে উত্তরবঙ্গে ‘মুখাবাঁশি’, মুখের কাছে খিল থাকে বলে ফরিদপুরে ‘খিলবাঁশি’ এবং মুখ কলমের মতো দেখায় বলে ‘কলমবাঁশি’ বলা হয়। আদিবাসীরা একে বলে ‘লয়বাঁশি’।

এভাবে বাংলা গানের সাথে মিশে আছে নানা বাদ্যযন্ত্র। এরমধ্যে ডুগডুগি, ডান্ডা, সিঙ্গা, মাদল, একতারা, দোতারা, খোল, কাড়া, খঞ্জর, হারমোনিয়াম, ঘুঙুর, ঝাঁঝ বা ঝাঁঝর ইত্যাদি।

কিন্তু আধুনিক সাংস্কৃতিক সভ্যতায় বাদ্য যন্ত্রের কারণে আজ সেগুলো বিলীন হতে চলেছে। সাতক্ষীরা উত্তর কাটিয়া আমতলা মোড় এলাকায় সুবোল দাসের ঢোল তবলার দোকানে বসে জানা গেলো এসব বাদ্যযন্ত্রের কথা।

তিনি ৩৫ বছর ধরে আমতলা মোড়ে একচালা বিশিষ্ট দুই কামরার দুটো ঘর ভাড়া করে স্ত্রী তিন ছেলে এক মেয়েসহ বসবাস করছেন। সুবোল দাশ এখন আর তার পৈত্রিক কাজ করতে পারেন না। বয়স হয়ছে। তাই তার ব্যবসা তিন ছেলে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বড় ছেলে সুবোধ দাশ, মেজো ছেলে স্বপন দাশ এবং তার দুই মেয়ে ও ঢোল, তবলা এবং হারমোনিয়াম তৈরী এবং মেরামতের কাজ করছেন। ছোট ছেলে তপন দাশের বয়স ২৬ বছর। তিনি ১৫ বছর ধরে বাবার সাথে এই  কাজ করছেন। সেই ১৪ বছর বয়স থেকে বাবা আর বড় দুই দাদার সাথে কাজ করছেন। ৮ মাস আগে বিয়ে করেছেন তিনি।

কিন্তু বৃদ্ধ সুবোল দাশ এখন আর তার পুরনো ব্যবসা ঢোল, তবলা হারমোনিয়াম তৈরী বা মেরামত করতে পারেন না। বয়সের কারণে অক্ষম আজ।

তাই তিন ছেলে এবং মেয়ে জামাই তার। ৩৫ বছরের ব্যবসাটাকে আঁকড়ে ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। তবে তারা বলছেন, আজকাল আর এই ব্যবসায় লাভ নেই। রোজগার নেই। যেমন আয় হওয়া উচিত তা হচ্ছে না। কারণ জানতে চাইলে সুবোল দাশের ছোট ছেলে তপন দাশ জানান, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে আজ এ অবস্থা। অথচ তারা তাদের আদি ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। আর থাকতেও চাই আগামীতে।

তারা আরও জানান, বাড়ি ভাড়া করে কষ্ট করে কোন রকমে ঠাসাঠাসি করে তিন ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, পুত্র কন্যা নিয়ে বসবাস করছেন। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে তারা হয়তো এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন। এসব দেশীয় ও প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র আমদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ভিড়ে বিলুপ্তপ্রায় এসব বাদ্যযন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে তারা সরকারের প্রতি আকুল আহ্বান জানান।