দুর্নীতির বিরুদ্ধে শপথ: স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৪, ২০১৯ ||

মো. আনিসুর রহিম:
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করেছেন। ‘আমাদের অফিসে এসে কেউ হয়রানি হবে না। কারো কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা নেব না। আমাদের অফিস দুর্নীতিমুক্ত থাকবে।’
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্যে দিয়ে সমগ্র বাঙালি স্বত্ত্বায় একটা ধারণা জন্মেছিল এখন থেকে দেশে আর ঘুষ দুর্নীতি থাকবে না। সকল প্রকার শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটবে। পাক হানাদার পশ্চিমা পাঞ্জাবী গোষ্ঠীকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীন-সর্বভৌম সরকার গঠন করেছি। কেউ কাউকে শোষণ করবে না। সরকার শোষণ মুক্ত সুন্দর পরিবেশে সকল মানুষকে সুখী সমৃদ্ধশালী শান্তিময় অবস্থা সৃষ্টি করবে। এ-ই ছিল আবাল বৃদ্ধ বনিতা সর্বশ্রেণি সর্ব পেশার মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন।
সাতক্ষীরা জেলার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জেলা প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ পরবর্তী দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বর্তমান শাসনকালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করেছিলেন। অতি সম্প্রতি তিনি সর্ব পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা উর্দ্ধতন সকল পর্যায়ে জানিয়ে দিয়েছেন।
আমরা গত ২মাসে লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি টাকার বান্ডিলসহ দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালদের গ্রেপ্তার হতে দেখছি। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ঘুষ দুর্নীতির প্রবণতা অনেকাংশে কমতে দেখছি। এরই মাঝে জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল দুর্নীতি অনিয়ম আর অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম পরিচালনার দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দকে জানিয়ে দিলেন।
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এক মতবিনিময় সভায় এসে বলেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পুলিশ প্রশাসনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমরা যে কোন মূল্যে দুর্নীতি-অনিয়মকে প্রতিহত করবো। আপনারা আগে যে পুলিশকে দেখেছিলেন, এখন থেকে ভিন্ন রকম দেখবেন। আমরা সাতক্ষীরার মানুষের উপর যে নির্বিচার অত্যাচার-নির্যাতন-অনিয়ম দেখতাম, গত দু’মাসে তেমনটি আর দেখিনা। জেলার ডিবি পুলিশকে ভেঙে ফেলে ঢেলে সাজানো হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
একইভাবে সাতক্ষীরা জেলার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান দুর্নীতিমুক্ত থেকে বিচার ব্যবস্থায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যক্ত করে চলেছেন। সাধারণ মানুষকে বিচার ব্যবস্থার আস্থায় ফিরিয়ে আনতে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করছেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোষণ, বঞ্চনামুক্ত সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা করতে পারেন নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি, তেলের খনি; আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। তিনি আরোও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘…চাটার দল সব চেটে খেয়ে ফেলেছে’।
এমন এক অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। সাতক্ষীরা জেলার বিজ্ঞ জেলা জজ, জেলা পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসক সাতক্ষীরা জেলায় সবধরনের অনিয়ম, অবৈধ কাজ, দুর্নীতি বন্ধের দৃঢ় সংকল্পে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
আমরা সাতক্ষীরাবাসী প্রশাসনের ৩ বিভাগের টিম কর্ণধরের ঘোষণায় আশ^স্ত হতে চাই। সাতক্ষীরা জেলার নাগরিকবৃন্দ বড়ই হতভাগা। মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা কেটে সেখানে সবকিছু গড়ে উঠেছে এবং উঠছে। রাজশাহী বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশে^র একটি সৌন্দর্যম-িত পরিচ্ছন্ন জেলায় পরিণত হয়েছে।
আমরা সাতক্ষীরাবাসী আমরা কি পেয়েছি? নদ-নদী পথ শুকিয়ে হরিয়ে গেছে। রেলপথ পাবো পাবো করেও পাইনি। সড়ক পথের জীর্ণদশায় কেউই সাতক্ষীরায় আসতে চায় না। সাতক্ষীরা হতে কলকাতা যেতে ৩ ঘন্টা লাগে। অথচ ঢাকা যেতে ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা লাগে। এছাড়া আছে সীমাহীন দুর্ভোগ। সড়ক পথে ৫ কিলোমিটার পর পর চাঁদাবাজী। গরীব ইঞ্জিনভ্যান চালক, গরুর বিচলী অথবা সাতক্ষীরা বড়বাজারে সবজি আনতে বিনেরপোতা ব্রীজে চাঁদাবাজরা ২০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করে। সাতক্ষীরা আশাশুনি মাত্র ২৪ কিলোমিটার পথ যেতে দেড় ঘন্টা লাগবে। বাসটার্মিনাল থেকে নবারুণ স্কুলের মোড় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার পথ আসতে ৪ জায়গায় যানজট ঘটিয়ে ৩৫ মিনিট সময় নেবে। বাস-ট্রাক মালিক শ্রমিকের সমিতি বা ইউনিয়নের কাজে জেলার ২৪ লাখ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে। সাধারণ বাস-ট্রাক মালিকরাও চাঁদাবাজ মাস্তানদের কাছে দীর্ঘকাল ধরে জিম্মি হয়ে আছে।
সাধারণভাবে গরীব মেহনতি মানুষের রুটি রুজির উপর আঘাত আসলে কেউই দেখার নেই। রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-কর্মীতের উপর কারও কোন আশা-ভরসা নেই। কতকাল আগে তা উঠে গিয়েছে, তা কেউ বলতে পারবে না। পৌরসভার বন্দোবস্ত নেই, বন্দোবস্ত বাতিল হয়েছে-এমন জায়গা দখল করে জেলা শহরে যানযট সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক নেতারা অনেকেই এদের পৃষ্টপোষক। সরকারি পর্যায়ের দুর্নীতির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিতে সাতক্ষীরা জেলার মানুষ নিদারুণ দু:খ কষ্ট যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে সবকিছু সয়ে ফেলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ একাকার হয়ে গিয়েছে।
এমন এক সময়ে সাতক্ষীরা জেলার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল গত ১৩ অক্টোবর যে শপথ বাক্য উচ্চারণ করলেন তাতে সাতক্ষীরাবাসী গভীর রাতে অন্ধকারের মাঝেও আলোর দিশা খুঁজে পাচ্ছে। মুজিববর্ষ পালনে ‘ক্লিন সাতক্ষীরা-গ্রিন সাতক্ষীরা’ কর্মসূচী বাস্তবায়নে তিনি সফল হবেন এ আমাদের প্রত্যাশা। দুর্নীতি মুক্ত, পরিচ্ছন্ন সবুজ সাতক্ষীরা গড়ে তোলার কাজ জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামালের একার নয়। সাতক্ষীরা জেলার ২২ লাখ মানুষের সবার। আমরা সকলে দুর্নীতিমুক্ত সাতক্ষীরা গড়ে তুলতে সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারলেই সাতক্ষীরার উন্নয়ন সম্ভব হবে। লেখক: আহবায়ক, জেলা নাগরিক কমিটি, সাতক্ষীরা