স্বপ্নের বাইপাস সড়ক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (আপডেটসহ ভিডিও)


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৬, ২০১৯ ||

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরা শহর বাইপাস সড়ক, ময়মনসিংহ-গফরগাঁও-টোক সড়কে বানার নদীর উপর সেতু, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় ৪ লেনের ফ্লাইওভার, মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন সড়কে ১৩টি সেতু, পটিয়া বাইপাস সড়ক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৬ অক্টোবর সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ডা. আ ফ ম রুহুল হককে সাথে নিয়ে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এসব উন্নয়ন কাজের মধ্যে ভোমরা স্থল বন্দর সংযোগসহ সাতক্ষীরা শহর বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১৮৩.৫১ কোটি টাকা। ৭.৩ মিটার প্রস্থের ২৩.৮৫ কিলোমিটার মহাসড়কটিতে ৩টি ব্রিজ, ৫০ টি কালভার্টও নির্মাণ করা হয়।
সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ২৩ জুলাই শ্যামনগর মহাসীন ডিগ্রী কলেজ মাঠে এক জনসভায় সাতক্ষীরা বাইপাস সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী আন্তর্জাতিক হাড়জোড়া বিশেষজ্ঞ প্রফসর ডা. আ ফ ম রুহুল হক, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবেক তালা-কলারোয়ার এমপি ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাতক্ষীরা সদর আসনের এমপি এমএ জব্বারের সার্বিক প্রচেষ্ঠায় ১১৬ কোটি টাকার ব্যয়ে বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি-একনেক। বাইপাস সড়কের মূল প্রকল্পের নাম ছিল ‘কনস্ট্রাকসন অব সাতক্ষীরা টাউন বাইপাস উইথ এ লিঙ্ক টু ভোমরা ল্যান্ড পোর্ট।’ বাস্তবে এই প্রকল্পে বাঁকাল থেকে ভোমরা বন্দর পর্যন্ত এবং জিরো পয়েন্টে একটি কালভার্ট তৈরি করা হলেও বাইপাস সড়কের সঙ্গে ভোমরা রোডের মাঝে ১ কিলোমিটারের বেশী এলাকায় কোন সংযোগ তৈরি হয়নি।
সাতক্ষীরা নাগরিক সমাজের অভিযোগ, একটি মহলের স্বার্থ রক্ষার জন্য বাঁকাল লিঙ্ক রোডের সঙ্গে সংযোগ না রেখেই জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করা হয়েছে।


সাতক্ষীরা শহরের যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি উঠতে থাকে ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি এবং বিভিন্ন সময়ে সাতক্ষীরার উন্নয়নে গঠিত বিভিন্ন নামের সংগঠন এই দাবি জানাতে থাকে। ১৯৯৬ সালে ভোমরা স্থলবন্দর চালু হওয়ার পর বাইপাস নির্মাণের এই দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালে সাতক্ষীরা বাইপস সড়ক নির্মাণে আরও একবার পদক্ষেপ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ২০০১ সালে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ফলে আশাহত হয় জেলাবাসি। আশাহত জেলাবাসির মধ্যে আশার আলো জ্বেলে ২০১০ সালের ২৩ জুলাই শ্যামনগরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাতক্ষীরায় বাইপাস সড়ক নির্মাণের ঘোষণা দেন। এর কিছু দিন পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেকে ভোমরা স্থলবন্দর সড়ক হতে বিনেরপোতা পর্যন্ত ২২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বাইপাস সড়কের জন্য ১১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি সংশোধন করা হয় এবং ১৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে লাবসা পলিটেনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন সড়ক হয়ে বিনেরপোতা বিসিক শিল্পনগরী পর্যন্ত ১২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার বাইপাস সড়ক নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সাতক্ষীরা শহর বাইপাস সড়ক নির্মাণে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে একনেকের বৈঠকে ১৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা অনুমোদন দেয়ার পর ১৭ সালের ৩১ মার্চ মূল সড়কের মাটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়। সাতক্ষীরা সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ থেকে ভোমরা স্থলবন্দর থেকে বিনেরপোতা পর্যন্ত ২২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বাইপাস সড়কের জন্য ১১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পের বাইপাস সড়ক নির্মাণ শুরুর আগেই আলিপুর চেকপোস্ট থেকে ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দুই লেনের লিঙ্ক রোডের রাস্তা আগেই নির্মাণ করা হয়। বাকি ১২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে ৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও পরবর্তীতে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৯০ কোটিতে দাঁড়ায়। এই প্রকল্পে সড়কে মোট ৩৬টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। বাইপাসের সঙ্গে সংযোগ না থাকলেও ভোমরা বন্দরের জিরো পয়েন্টে এই প্রকল্পেরই একটি কালভাট নির্মাণ করা হয়েছে। যেটি বাংলাদেশ ভারত আমদানি রপ্তানির সেতু হিসেবে কাজ করবে।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়। যেখানে ১২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দুই লেনের (২৪ ফুট চওড়া) সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু একনেকে ১৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা অনুমোদন দেয়া হয়। বাইপাসের জন্য পলাশপোল, কাশিমপুর, বাবুলিয়া, বাঁশঘাটা, লাবসা, মথুরাপুর, বিনেরপোতা এই আটটি মৌজার ৯২ দশমিক ৫৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই জমি অধিগ্রহণে ব্যয় করা হয় ৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। সড়কটি সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে শুরু হয়ে সিটি কলেজের পেছন হয়ে কাশেমপুর গ্রাম দিয়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন যশোর সড়কে গিয়ে মিশেছে। সেখান থেকে মুথরাপুর মোড় হয়ে খেজুরডাঙ্গি হয়ে বিনেরপোতা মেঘনা মোড়ে গিয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এদিকে সাতক্ষীরা সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরকৃত (০৮-০৬-২০১৬) তারিখে প্রকল্প প্রস্তাবনার নকশার ওপরে শিরোনামে দেখা যায় ‘সাতক্ষীরা টাউন বাইপাস উইথ এ লিঙ্ক টু ভোমরা ল্যান্ড পোর্ট’ এবং কালো কালি দিয়ে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের বিনেরপোতা, সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের লাবসা এবং আলিপুর চেকপোস্ট হয়ে ভোমরার দিকে কালো দাগ টানা হয়েছে। অথচ বাস্তবে মেডিক্যাল কলেজের সামনে সংযুক্ত হওয়া এই বাইপাস সড়কের সঙ্গে আলিপুর থেকে ভোমরা বন্দর পর্যন্ত সড়কের সঙ্গে সরাসরি কোন লিঙ্ক রাখা হয়নি।
এরপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ও প্রতিশ্রুত সাতক্ষীরা বাইপাস সড়ক চালু হওয়ায় সাতক্ষীরাবাসির কৃতজ্ঞতা ও প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরার জন্য বাইপাস সড়ক একটি মাইলফলক বলে নাগরিক সমাজ মনে করেন। নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা এই বাইপাস সড়কটি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে মেডিক্যাল কলেজের সামনের সংযোগের আগে থেকে আলিপুর (বাকাল চেকপোস্ট) পর্যন্ত একটি নতুন রোড তৈরি করে ভোমরা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করলেই আমদানি-রপ্তানি কাজে ব্যবহৃত যানবাহনগুলো নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারবে। বিপদ ও ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে মেডিক্যাল কলেজের শত শত শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাতক্ষীরাবাসী।
এদিকে বুধবার প্রধানমন্ত্রী আরও যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন তারমধ্যে ৩৩৮.৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় ৪ লেনের ফ্লাইওভার প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক বরাবর ১২৩৯ মিটার দৈর্ঘের একটি ও ঢাকা বাইপাস মহাসড়ক বরাবর ৬১১ মিটার ৪ লেনের দুই ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং ঢাকা সিলেট মহাসড়ক বরাবর ২.১৩ কিলোমিটার এবং ঢাকা বাইপাস সড়ক বরাবর ১.০৮৪ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্থকরণ করা হয়।
ময়মনসিংহ-গফরগাঁও-টোক সড়কে বানার নদীর উপর ২৮২.৫৫৮ মিটার দৈর্ঘের সেতুটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয় ৩২৯০.৮০ লাখ টাকা (৩২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা)। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের ইন্দ্রপুল থেকে চক্রশালা পর্যন্ত বাঁক সরলীকরণ প্রকল্প (পটিয়া বাইপাস সড়ক) বাস্তবায়নে খরচ হয় ৮৭.৭০ কোটি টাকা। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর পরিবর্তে ১৩ স্থায়ী কংক্রিট সেতু নির্মাণ করা হয়। এসব সেতুরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে প্রধানমন্ত্রী এসব এলাকার উপকারভোগীসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব উন্নয়ন কাজ রক্ষণাবেক্ষণে সংশি¬ষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান। বক্তব্য নিরাপদ সড়ক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি চালক, পথচারী থেকে শুরু করে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ মোটেও সচেতন নয়। চালক থেকে শুরু করে সবার সচেতন হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন। সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্কুল থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের সচেতন করার উপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গণভবন প্রান্ত থেকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এসময় পাশে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক এমপি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান। উদ্বোধন হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ নিয়ে ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
সাতক্ষীরা প্রান্ত থেকে কথা বলেন, জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল ও একজন মসজিদের ইমাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দার, পুলিশ সুপার মোহম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক আবু আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ আহমেদ বাপীসহ প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ।