খোলা কলাম: সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৮, ২০১৯ ||

এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কালিগঞ্জ উপজেলা শাখা দীর্ঘদিন কমিটি শূন্য থাকায় দলের অবস্থান অনেকখানি দুর্বল অবস্থায় পর্যবেশিত হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী সমর্থকবৃন্দের দীর্ঘদিনের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের (খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) পরামর্শ মোতাবেক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাতক্ষীরা জেলা শাখা কর্তৃক গত অক্টোবর মাসে ২৫ সদস্যের একটি সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি প্রদান করেছেন। উক্ত সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি নিয়ে সমগ্র উপজেলাব্যাপী নেতা, কর্মী, সমর্থকদের আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে তা উল্লেখ করা হলো:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, মোস্তফা রশিদী সুজা সাহেবের উপস্থিতিতে ২০০৩ সালে, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে একতরফা ব্যবস্থায় অত্র কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ ওয়াহেদুজ্জামান সভাপতি এবং খান আছাদুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

২০০৩ সালের উক্ত বিতর্কিত সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্বের কারণে সভাপতি শেখ ওয়াহেদুজ্জামান সাধারণ সম্পাদক খান আছাদুর রহমানকে উপেক্ষা করে অসাংবিধানিকভাবে একক সিদ্ধান্তে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করেন। যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের কারণে দীর্ঘদিন দলের অচল অবস্থা চলমান থাকে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি. এম. মোজাম্মেল হক, এমপি. মহোদয়ের (সাবেক) মধ্যস্ততায় একটি সমঝোতা হয় এবং ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি অত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনে শেখ ওয়াহেদুজ্জামান সভাপতি এবং সাঈদ মেহেদী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরের মধ্যেও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী কমিটি গঠন করেননি। যার কারণে দলের নিদারুণ দৈন্যতা ও অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

এইরূপ অবস্থায় ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি সভাপতি শেখ ওয়াহেদুজ্জামান মৃত্যুবরণ করেন।

২০১৯ সালের ২৪ মার্চ উপজেলা নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মেহেদী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন এবং নির্বাচিত হন।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই অত্র উপজেলায় কোন নেতৃত্ব না থাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বারংবার জেলা আওয়ামী লীগের নিকট এবং পরিশেষে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নিকট যেকোন প্রকারের একটি কমিটি প্রদানের জন্য নিবেদন করেন।

পরিশেষে গত অক্টোবর মাসে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ২৫ সদস্যের একটি সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি প্রদান করা হয়েছে। উক্ত কমিটিতে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেলা নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিগোচরে আসেনি, সেই সকল বিষয় নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা পর্যালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

সুদীর্ঘ দিন অত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি না থাকায় উপজেলার বারটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ উপজেলা আওয়ামী লীগের সেই শূন্যতা পূরণে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখে উপজেলা আওয়ামী লীগের সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন। কিন্তু সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে বার জন সভাপতিকে সদস্য করে সাধারণ সম্পাদকগণকে বাদ দেওয়ার কারনে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত চাপা অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

বারটি ইউনিয়নের বারো জন সাধারণ সম্পাদকের মধ্য থেকে একটি ইউনিয়নের একজন সাধারণ সম্পাদককে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য করে এগারোটি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকগণকে ব্যথিত দু:খিত এবং লজ্জিত করা হয়েছে।

সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহবায়ক ও যুগ্ম আহবায়ক পদের বিধান নেই এবং আহবায়ক ও যুগ্ম আহবায়ক পদ সৃষ্টির মাধ্যমে আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করলে সেক্ষেত্রে সদস্য সচিব পদের কোন প্রয়োজন হয় না। অথচ প্রদেয় সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে একজন আহবায়ক দুইজন যুগ্ম আহবায়ক পদ প্রদান করার পরেও একটি সদস্য সচিবের পদ প্রদান করে যুগ্ম আহবায়কদ্বয় ও সদস্য সচিবের পদের দায়িত্ব কর্তব্য ও ক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় দলীয় গঠণতন্ত্রের বিধিবিধান সুস্পষ্ট ভাবে অনুসরণ না করে ইচ্ছা মাফিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি প্রদান করা হয়েছে। অথচ সম্মেলনের মাধ্যমে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন না করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কেবলমাত্র থানা কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে কাদের দ্বারা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হবে? সে বিষয়ে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে একত্রিশ জন কাউন্সিলার নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। সেই একত্রিশ জন কাউন্সিলার কারা নির্বাচিত করে দেবে? দলীয় গঠণতন্ত্রে থানা নেতৃবৃন্দ ইউনিয়ন থেকে কাউন্সিলার গ্রহণ করতে পারে এমন বিধান দলীয় গঠণতন্ত্রে নেই। বিধায় ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন করার ক্ষমতা সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিকে প্রদান করা জরুরী আবশ্যক বলে বিবেচনা করছেন।

দলীয় গঠণতন্ত্রে একই ব্যক্তির একাধিক স্তরে পোটফোলিও পদ দখল করার সুযোগ না থাকা স্বত্ত্বেও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য সচিব পদ প্রাপ্ত হওয়ায় গঠণতন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে মর্মে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।

সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সিনিয়র যোগ্য এবং ত্যাগী নেতৃত্বকে নিদারুন ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। বিধায় সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

দলের সভানেত্রী যখন দলের ভিতরে অনুপ্রবেশকারী জামাত বিএনপিদেরকে চিহ্নিত করে দলের পদ পদবী ও কমিটি থেকে অপসারণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন, ঠিক সেই সময়ে চিহ্নিত জামাত ও বিএনপি দলের সক্রিয় নেতা, নাশকতা সৃষ্টিকারী জঙ্গিবাদী মো. নুরুজ্জামান জামুকে এবং কখনো আওয়ামী লীগ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা কাজী নওশাদ-দীলওয়ারা রাজুকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করে দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে ছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে নুরুজ্জামান জামুর মত ব্যক্তির স্থান পাওয়ার দ্বিতীয় কোন সুযোগ নেই। যার কারাগারে থাকার কথা সে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তুত কমিটিতে সদস্য পদ লাভ করেছে কিভাবে? সমস্ত নেতাকর্মী সমর্থকগণ তা জানতে চায়।

দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে, প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী শেখ মেহেদী হাসান সুমন এর সহদর ছোট ভাই কখনো দলের কোন অঙ্গ সহযোগী ও অন্যকোন শাখার কোন পদে না থাকা আবুল কাশেমকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। বিধায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

বিদ্রোহী প্রার্থী মেহেদী হাসান সুমনের আপন দুই মামাকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে (একই পরিবারে তিনজন) অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

বিদ্রোহী প্রাথী মেহেদী হাসান সুমনের প্রস্তাবক কাজী নওশাদ-দীলওয়ার রাজুকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

বিদ্রোহী প্রার্থী সাঈদ মেহেদীর পরিবারের কোন সদস্যকে (তার পিতা এবং জেষ্ঠ ভ্রাতা) কে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে স্থান না দেওয়ার কারনে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কার্যক্রমে পরিচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্ব প্রষ্ফুটিত হয়েছে।

বিদ্রোহী প্রাথী সাঈদ মেহেদীর প্রস্তাবক নরিম আলী মাষ্টার এবং সমর্থক প্রশান্ত সরকারকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে এবং বিদ্রোহী প্রার্থী সাঈদ মেহেদীর নির্বাচনের অনেক সক্রিয় কর্মীকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে স্থান দিয়ে বিদ্রোহীদেরকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রস্তাবক সমর্থক ভাই মামাগণকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করে পরোক্ষ ভাবে প্রমান করা হয়েছে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া কোন দোষের ছিলো না।

নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলীয় প্রার্থী শেখ আতাউর রহমানকে এবং তার পরিবারের কোন সদস্যকে (সহদর অনুজ ভ্রাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ অজিয়ার রহমানকে) অত্র সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নাই এবং সমর্থক উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি (সাবেক) শেখ আনোয়ারুল কবীর লিটুকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

নৌকা প্রতীক এর দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করে যে সকল আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাগণ, সীমাহীন পরিশ্রম করেছেন, সেই সকল সিনিয়র নেতৃবৃন্দ (অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধা খান আছাদুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা এসএম ছদর উদ্দীন) কে অত্র সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। যার কারণে নেতাকর্মীদের মনে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা এবং নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে সমর্থন করা ভুল হয়েছিলো। বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন করাই ভালো ছিলো।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ইতিপূর্বে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ, কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব প্রদান করে এসেছেন। অথচ বর্তমান সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে একজনও মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। যার কারণে মুক্তিযোদ্ধাগণকে ও তাদের সন্তানগণকে আওয়ামী লীগ সমর্থক নয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

সকল ক্ষেত্রে ত্রিশ শতাংশ নারী নেতৃত্ব সৃষ্টির দলীয় নির্দেশনা থাকা স্বত্ত্বেও অত্র সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে একজনও নারী নেত্রীর নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয় নাই। বিধায় নারী নেত্রীগণ নিরুৎসাহিত হয়েছে।

আওয়ামী যুবলীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগের অবসরপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ, সভাবতই আওয়ামী লীগে স্থান পেয়ে থাকেন, অথচ আওয়ামী যুবলীগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক (মুক্তিযোদ্ধার সন্তান) গণকে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নাই।

দলের বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে, উপরুল্লিখিত কারনে, অত্র বিতর্কিত সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি পুন:গঠনের জন্য সর্ব স্তরের নেতাকর্মী সমর্থকগণ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের নিকট দাবী করেন এবং গত ১৪-১০-২০১৯ তারিখ, সোমবার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির প্রথম সভায় আগত, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিকট শতশত নেতাকর্মী সমর্থক উপস্থিত হয়ে সেই দাবী করেন।