শিক্ষায় শিক্ষক: শিক্ষার্থী: অভিভাবক


প্রকাশিত : অক্টোবর ২০, ২০১৯ ||

কিশোরী মোহন সরকার: শিক্ষা শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তার শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি বিধানে সহায়তা করে। শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভার সম্ভাবনাময় বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক শিশুর মধ্যে কোন না কোন প্রতিভা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। শিক্ষকের কাজ সেই সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান নিয়ে তার পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করা। শিক্ষার্থীর রুচি, প্রবণতা ও খেয়ালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তার ক্ষমতাকে আবিষ্কার করা; সুশিক্ষার মাধ্যমে তাকে আদর্শ মানুষ রূপে গড়ে তোলা, যাতে সেই মানুষটি দেশ ও জাতি গঠনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারে। কাজটি বড়ই দুরূহ। এ জন্য শিক্ষককে হতে হবে শিক্ষার্থীর ঋৎরবহফ, চযরষড়ংড়ঢ়যবৎ ধহফ মঁরফব। তাকে ব্যক্তি জীবনে হতে হবে উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞ, জ্ঞানী, গুণী এবং চরিত্রবান। অন্যদিকে তাকে তেমনি ন¤্র, ভদ্র, শান্ত, কৌতুহলী, আমোদী, ধৈর্যশীল, প্রিয়ভাষী ও এসমস্ত গুণ হৃদয় ও চিত্তে ধারণ করে তাঁকে হতে হবে সৃষ্টিশীল ¯েœহশীল হতে হবে। একটি শিশুকে একজন আদর্শ মানুষ রূপে গড়ে তুলতে হলে তাকে যে সমস্ত গুণাবলীর অধিকারী হতে হয় তা’ শিক্ষক শব্দটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে। শিক্ষাবিদ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘শিক্ষক’ শব্দটিকে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন-

শিক্ষক   = শ+ই+ক+ষ্+অ+ক্+অ

শ্          = শান্ত মনোভাব যাঁর সদা হাস্য মুখ।

ই          = ইতরতা মুক্ত যার দেহ-মন-প্রাণ।

ক্         = কর্মনিষ্ঠ সদা যিনি কুকর্মে বিমুখ।

ষ্          = ষড়রিপু যার কাছে হইয়াছে ম্লান।

অ         = অধ্যয়ন, অধ্যপনা সদা যার ব্রত।

ক্         = কথায় ও কাজে যার সমতা রক্ষিত।

অ         = অকপট ছাত্র প্রীতি ছাত্রগত মন।

এহেন শিক্ষক লভে ছাত্রের সম্মান।

কিন্তু বর্তমানে উল্লেখিত গুণসম্পন্ন শিক্ষকের বড় অভাব। আগেকার দিনের শিক্ষকেরা মনে প্রাণে বিশ^াস করতেন শিক্ষকদের জীবন মূলত উৎসর্গীকৃত জীবন। শিক্ষকতাই ছিল তাঁদের ধ্যান-জ্ঞান, শিক্ষার্থী ছিল তাঁদের মন-প্রাণ। এখন শিক্ষকতা ব্রত নয়, নেশা নয়। নিতান্তই জীবনের প্রয়োজনে অন্য আর দশটা পেশার ন্যায় শিক্ষকতাকেও পেশা হিসেবে বেছে নিতে হচ্ছে। শিক্ষক পাচ্ছেনা সামাজিক মর্যাদা। তাঁদের জন্য উন্নত দেশের ন্যায় নেই কোন ভিন্ন বেতনস্কেল। তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাদেরকে নির্ভরশীল হতে হচ্ছে অন্য কোন খন্ডকালীন কর্মে অথবা গৃহশিক্ষকতার উপর। অবশ্য গৃশিক্ষকতার বদৌলতেই শিক্ষক সমাজ আজ কোন রকমে টিকে আছে, তবে এ কাজটি করতে যেয়ে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নীতি- নৈতিকতা বিবর্জিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে শিক্ষক ম-লীকে অবশ্যই সচেতন হওয়া অত্যাবশ্যক, কারণ ওই একটি মাত্র কারণেই শিক্ষকতার মত মহান পেশা আজ কালিমা লিপ্ত।

শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান শিক্ষার্থীর, তার জন্যেই সকল কিছুর আয়োজন। শিক্ষায় সফলতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর আগ্রহ, অনুরাগ আর সদিচ্ছার উপর। তাই কেবলমাত্র আদর্শ শিক্ষকই শিক্ষাদান কার্যের মূলমন্ত্র নয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে যথার্থ গুণের অধিকারী হতে হয়। জনৈক শিক্ষাবিদ ‘ছাত্র’ শব্দের আক্ষরিক বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে-

ছাত্র =   ছ+আ+ত+র+অ

ছন্দে-ছন্দে গতি যার সদা শান্তভাব,

সত্যবাদী হাস্য মুখ সতত স্বভাব।

আ=      আলোক সন্ধানে যার অন্ধকার ত্যাগ,

জ্ঞানের জিজ্ঞাসায় যার সদা অনুরাগ।

ত=       তপধর্ম অধ্যয়ণ সেই জন করে,

সেইজন সত্যকার বিদ্যাধন হরে।

র=        রক্ষা করে নিজ ধর্ম যে বীর্যবান হয়,

সেই তো আদর্শ ছাত্র জানিবে নিশ্চয়।

অ=       অহংকার, কদাচার কভু নাহি যার,

শ্রদ্ধা, ভক্তি, শিষ্ঠাচার সদা অলংকার।

এইরূপ ছাত্র-ছাত্রী যদি কেহ হয়,

জানিবে জীবন ধন্য গুরুর কৃপায়।

বর্তমানে এমন ছাত্র পাওয়া যায় হাজারে একজন। ছাত্র যদি শিখতে না চায় তবে শিক্ষক তাকে শেখাবে কি করে! তাদের মনে যদি জিজ্ঞাসা না থাকে তাহলে জিজ্ঞাসার নিবৃত্তিরতো প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমানে ছাত্রদের উদ্দেশ্য শিক্ষালাভ নয়-ডিগ্রী লাভ। কোন রকমে মুখস্থ করে কিংবা নকল করে পাশ করাটাই যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য সেখানে শিক্ষকম-লী শিক্ষা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে কোন সাহসে। ছাত্র জানতে চাইলে শিক্ষক শেখাতে বাধ্য হয়। ছাত্র এক পা বাড়ালে শিক্ষক দশ পা বাড়ায়। এজন্য চাই শিক্ষা লাভের জন্য ছাত্রের যথেষ্ট আগ্রহ, ঐকান্তিক কামনা, একনিষ্ঠ সাধনা, চাই ত্যাগ ও তপস্যা আগেকার দিনে ছাত্ররা শিক্ষকের কাছে আসত জ্ঞান লাভের জন্য। অভিভাবকরা তাদের পাঠাত চরিত্র গঠনের জন্য। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র বিদ্যালয়ে যায় ভবিষ্যতে একটা ভালো চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশায়। সুতরাং সমীকরণটা দাঁড়াচ্ছে এরকম- শিক্ষক বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন জীবন ধারণের তাগিদে, আর ছাত্র সরস্বতীর আরাধনায় মত্ত লক্ষ্মীকে লাভ করার জন্য। ফলত ছাত্র শিক্ষক উভয়ই ব্যর্থ। শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্ক দেয়া- নেয়ার সম্পর্ক। সেখানে ফাঁক থাকলে শিক্ষা থেকে যায় অপূর্ণ। এখানে পূর্ণতা আনতে হলে শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবক (পিতা-মাতা, রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ) সবাইকে একই সরল রেখায় অবস্থান করতে হবে। শিশুর শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়ের সহযোগিতা অপরিহার্য। শিশু দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ সময় বাড়িতে থাকে। বিদ্যালয়ে কাটায় মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়। তাই স্কুল অপেক্ষা বাড়ির প্রভাব শিশুর জীবন গঠনে অধিক প্রভাব বিস্তার করে। অবশ্য ইহাও ঠিক যে স্কুলে অতি কম সময় থাকলেও ছাত্রের উপর শিক্ষকের প্রথম কাজ হলো পড়ানোর আগে শিক্ষার্থীকে জানা। আর শিক্ষার্থীকে জানতে হলে পিতা-মাতা তথা অভিভাবকের সাহায্য অপরিহার্য। শিক্ষক আর পিতা-মাতা যদি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেন, পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীকে পরিচালিত করেন, একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেন তবে শিক্ষার যথার্থ লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে অভিভাবক-অভিভাবিকাম-লী ছেলেমেয়েকে স্কুলে (যতদূর সম্ভব ভাল স্কুলে) ভর্তি করতে পারলে অতঃপর একটি তথাকথিত উন্নত মানের কোচিং সেন্টার এবং গোটাকতক গৃহ শিক্ষক রাখতে পারলেই কর্তব্য শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। ভর্তি করানোর পরে তারা আদৌ খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করেন না, অর্থাৎ স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। কিন্তু শিক্ষা কেবলমাত্র শিক্ষকের একার কাজ নয়। সেখানে পিতা-মাতার কর্তব্য অনেক বেশী। কারণ শিক্ষকের প্রভাব শিক্ষার্থীর জীবনে কোনদিনই পিতা-মাতার প্রভাবের চাইতে বেশী নয়। এজন্য শিক্ষকের সাথে সাথে পিতা-মাতাকেও তার সন্তানের জন্য সময় ও শ্রমো বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু অর্থ বিনিয়োগে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

শিশু প্রতিদিন সামাজিক পরিবেশে মিথ্যার মুখোমুখি হচ্ছে, বাড়িতে হচ্ছে স্বার্থপরতা আর হিংসা বিদ্বেষের সম্মুখীন। আর ঝগড়া-ঝাটিতো মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রীর নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এ দু’মুখো নীতির ফলে স্কুলের শিক্ষা শিশুর জীবনে কার্যকরী হচ্ছে না। এখনকার বাবা-মার দায়িত্ব অনেকটা একপেশে হয়ে পড়েছে এবং সে কারণে সন্তানদের প্রতি যে কমিটমেন্ট তা আদৌ কর্মে আচরণে প্রকাশ করেন না। এখনকার মা-বাবা একদার ‘প্লেন লিভিং-হাইথিংকিং’ এর যে অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত তা থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে ‘হাই লিভিং-প্লেন থিংকিং’ এ অবস্থান নিয়েছে। বিলাসিতা, জাঁকজমক আর বিনোদনে জীবনকে ভরিয়ে তোলার আয়োজনে তারা ব্যস্ত। আরাম আয়েসে থাকার জন্য যে ব্যবস্থা এবং তার প্রতি আকর্ষণ তা পরিবারের সদস্যদের থেকে অভিভাবক-অভিভাবিকাদের কেবলই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তাই সঙ্গত কারণেই তারুণ্য আজ দোদুল্যমান, অস্থির। জাতির এ চরম ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষার আর শিক্ষার্থীর উন্নয়নে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকম-লীরও ভাববার প্রয়োজন আছে বৈকি!

মূলত শিক্ষার্থীর শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়েরই গুরুত্ব সমান। শিক্ষার্থী চারাগাছের মত। একটি চারাগাছের যথার্থ বৃদ্ধির জন্য তার পরিচর্যার প্রয়োজন। আগাছা পরিস্কার করা; তেল, সার, পানি দেয়া যে কাজটি মালি করে থাকে। কিন্তু ঐ গাছকে রক্ষার জন্য তার চারিধারে বেড় দিতে হয়। তার বেড়ে ওঠার জন্য অবলম্বন প্রয়োজন (কাঠি)। তবেই গাছটি একদিন ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়। আর সে বৃক্ষের ফল খেয়ে দেশ ও জাতি হয় ধন্য। শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা হচ্ছে মালির ভূমিকা এবং ঘেরা বা অবলম্বন হচ্ছে অভিভাবক। লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার