জেলা নেতৃবৃন্দের নির্দেশও কাজে আসছে না: কালিগঞ্জে আ.লীগের দু’টি গ্রুপের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে, দিশাহারা তৃণমূল নেতা-কর্মী

বিশেষ প্রতিনিধি: দীর্ঘদিন যাবত উপজেলা কমিটি নিয়ে সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ। সমস্যা থেকে উত্তরণের কোন উদ্যোগই কাজে আসছে না। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের নির্দেশনাও লংঘন করা হচ্ছে। এর ফলে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব আর শঙ্কা চেপে বসেছে দেশের সর্ববৃহৎ এই রাজনৈতিক সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের উপর।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কালিগঞ্জ উপজেলা শাখার সাবেক কয়েকজন নেতাসহ ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ওই সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু সভাপতি পদ থেকে নাম প্রত্যাহার করায় অপর প্রার্থী আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কান্ডারী বর্ষিয়ান জননেতা যুদ্ধকালীন কমান্ডার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ ওয়াহেদুজ্জামান পূণরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। আর কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সাঈদ মেহেদী। এরপর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনেকটা প্রকাশ্য দ্বদ্বের কারণে দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। বরং দলের মধ্যে শুরু হয় বিভাজনের রাজনীতি। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ কালিগঞ্জ উপজেলা শাখায় সাড়ে চার বছরের অধিক সময় পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সংগঠনটি দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। একপর্যায়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শেখ ওয়াহেদুজ্জামান মৃত্যুবরণ করেন। আর এর মধ্যে দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে একমাত্র ব্যক্তিতে পরিণত হন সাঈদ মেহেদী। তাছাড়া তিনি বিগত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা শেখ আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সে কারণে সংগঠনের মধ্যে সাঈদ মেহেদীর ভূমিকা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সাঈদ মেহেদী উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতাকর্মীর সাথে তার ব্যাপক দুরত্ব সৃষ্টি হয়। তাছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে সাঈদ মেহেদীকে কেন্দ্রীয় কমিটি কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করে।
এদিকে ছয় মাসেরও বেশি সময় এভাবে চলার পর সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ৫ অক্টোবর ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটিতে কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক তারালী ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হোসেন ছোটকে আহ্বায়ক এবং ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সজল মুখার্জীকে সদস্যসচিব মনোনীত করা হয়।
২৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রিয়াজ উদ্দীন ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডিএম সিরাজুল ইসলামকে। আর সদস্য মনোনীত হন যথাক্রমে এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু, নরিম আলী মাস্টার, শেখ নাজমুল ইসলাম (উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান), দক্ষিণ শ্রীপুর ইউপি চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার সরকার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নুরুজ্জামান জামু, কাজী নওশাদ দিলওয়ার রাজু, শামছুল হক মাস্টার, অমল মাস্টার, আবুল কাশেম, আহমদ আলী (তারালী), মোজাম্মেল হক মোজাম (চাম্পাফুল), আনিছুজ্জামান (নলতা), কাজী কাওফিল অরা সজল (কুশুলিয়া), গোবিন্দ কুমার মন্ডল (দক্ষিণ শ্রীপুর), নুরুল হক (বিষ্ণুপুর), মোস্তফা কবিরুজ্জামান মন্টু (কৃষ্ণনগর), দুলাল ঘোষ (মৌতলা), মোখলেছুর রহমান মুকুল (মথুরেশপুর), আশরাফুল হোসেন খোকন (রতনপুর), নাজমুস শাহাদাত রাজা (ধলবাড়িয়া)। উক্ত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিকে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা সম্মেলন সমাপ্ত করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির দু’একজনকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও দীর্ঘদিন পর দলকে সচল করার উদ্যোগ নেয়ায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীসহ এর সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও আশার আলো দেখতে পান। নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে প্রক্রিয়া শুরু করেন। যদিও এই কমিটি গঠনের পরও সাঈদ মেহেদী নিজেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করতে থাকেন। কিন্তু তার এই দাবি মানতে নারাজ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবসহ বড় একটি অংশ। এর মধ্য দিয়েই কালিগঞ্জের ১২ ইউনিয়ন থেকে কাউন্সিল নির্বাচনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভার পৃথক দিন ধার্য্য করে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি। গত ১৮ অক্টোবর প্রথম মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয় কুশুলিয়া ইউনিয়নের জিরণগাছায়। কিন্তু ওই দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দাবিকারী সাঈদ মেহেদীর নেতৃত্বে তার অনুগত একটি গ্রুপ মতবিনিময় সভায় হট্টগোল সৃষ্টি করে সভা ভন্ডুলের পায়তারা চালায়। যদিও সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির দু’একজন সদস্যের মধ্যে কিছুটা মতানৈক্য থাকলেও সম্মিলিত উদ্যোগে দক্ষিণ শ্রীপুর, বিষ্ণুপুর ও চাম্পাফুলে অনুরূপ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ অক্টোবর (বুধবার) বিকেলে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির উদ্যোগে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয় তারালী ইউনিয়নে। কিন্তু হঠাৎ করে সাঈদ মেহেদী গত ১ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সম্মেলন প্রস্তুতির বিষয়ে তিনিই দায়িত্বপ্রাপ্ত এমন দাবি জানিয়ে একই দিনে, একই সময়ে অর্থাৎ ২৩ অক্টোবর বিকেলে রতনপুর ইউনিয়নের কদমতলা বাজারে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে কাউন্সিলর নির্বাচনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা আহ্বান করেন। বুধবার সন্ধ্যায় রতনপুর ইউপি’র ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি পিয়ার আলী তরফদারের সভাপতিত্বে ওই সভায় সাঈদ মেহেদী ছাড়াও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু, মাস্টার নরিম আলী, শেখ নাজমুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন। অপরদিকে তারালী ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ আলী সরদারের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এহছানুল হকের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হোসেন ছোট, যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ রিয়াজ উদ্দীন, সদস্যসচিব সজল মুখার্জী, সদস্য গোবিন্দ মন্ডল, মোজাম্মেল হক গাইন, নুরুজ্জামান জামু, মোখলেছুর রহমান মুকুল প্রমুখ। তবে একই দিনে দু’টি গ্রুপ পৃথক পৃথক সভা আহ্বান করায় দলীয় নেতাকর্মীসহ উপজেলার সচেতন মহলের মাঝে নতুন করে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মৌতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন জানান, ২৪ অক্টোবর বিকেলে উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির উদ্যোগে ভাড়াশিমলা ইউনিয়নে কাউন্সিলর নির্বাচনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অপরদিকে একই সময়ে মৌতলা ইউনিয়নে মতবিনিময় সভা করেন সাঈদ মেহেদী। অথচ এই বিষয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কিংবা তিনি জানেন না। এভাবে এখতিয়ার বহির্ভূত সভা ডাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মুনসুর আহমেদ মুঠোফোনে জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি বিভিন্ন উপজেলায় সম্মেলন প্রস্তুতির বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করলে সেই অনুযায়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম গত ১ অক্টোবর জেলার প্রতিটি উপজেলার সভাপতি-সম্পাদককে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি ফরোয়ার্ড করে পাঠান। গত ২৪ সেপ্টেম্বর খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরবর্তীতে গত ৫ অক্টোবর কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দীর্ঘদিন না থাকার কারণে এনামুল হোসেন ছোটকে আহ্বায়ক ও সজল মুখার্জীকে সদস্যসচিব মনোনীত করে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। তিনি আরও জানান, সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠনকালে তিনি ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, সাতক্ষীরা-৩ আসনের এমপি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এসএম জগলুল হায়দার উপস্থিত ছিলেন। তবে কেন সম্মেলন প্রস্তুতি ও ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন নিয়ে পাল্টাপাাল্টি অবস্থান দেখা যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে মুনসুর আহমেদ বলেন, কাউন্সিলর নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন কমিটিকে সহায়তাসহ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন সম্পন্ন করার দায়িত্ব শুধুমাত্র নবগঠিত সম্মেলন প্রস্তুুতি কমিটির। এর বাইরে কারও কোন ভূমিকা বা দায়িত্ব নেই। সাঈদ মেহেদীর উদ্যোগে পৃথক সভা হয়েছে কী না তা আমার জানা নেই। যদি করে থাকে তা সঠিক হয়নি।
সাঈদ মেহেদীর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়নি। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল মাত্র। জেলা আওয়ামী লীগ খুলনা বিভাগীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পত্র দেন। তারপর অগঠনতান্ত্রিক নিয়মনীতি না মেনে জেলার এজেন্ডা দিয়ে মিটিং না করে অজ্ঞাত কারণে সম্মেলন বিতর্কিত করার জন্য বিরোধী পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে। আমাকে দেওয়া পত্রের রদরোহিত করা হয়নি। সেকারণে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির পরীক্ষিত ৯জন ১ তারিখের পত্রের আলোকে কাউন্সিল প্রস্তুতির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শুধু তাই নয়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ওয়ার্ডের ১৮জন এবং ইউনিয়নের দুজন মোট ২০ জন কাউন্সিলর রয়েছেন। গঠনতন্ত্রের আলোকেই সবকিছু হচ্ছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে তাদের দাবি অনুযায়ী এখানে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বাইরে কিছুই হবে না। জনবিচ্ছিন্ন কাউকে চায় না তৃণমূল।