আলাপীর মুক্ত আলাপ


প্রকাশিত : অক্টোবর ৩০, ২০১৯ ||

এড. শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু: আমাদের এলাকায় একজন মহিলা ছিলেন। মহিলা দেখতে মোটামুটি সুশ্রী। অল্প বয়সে বিধবা। অভাব অনাটনের সংসার। স্বাভাবিকভাবেই, ভালো ভালো সমাজপতিদের সহানুভূতিতে, মুন্নি বদনাম হুয়া। ওয়ার্ড সদস্য মাঝ বয়সী মানুষ। স্বভাবে একটু নারী ভক্তিভাবের। ওই মহিলার সঙ্গে অনেক দিনের যোগাযোগ। কিন্তু, মহিলা হয়তো বা দোষমুক্ত হওয়ার কারণে, অথবা মেম্বরের প্রতি অভক্তির কারণে, মেম্বর সাহেবের দাবী রাখে না। স্বাভাবিকভাবেই মেম্বর সাহেব মহিলার প্রতি বিরূপ হয়েছিলেন।

আমাদের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বর্ষিয়ান, ধার্মিক এবং দয়ালু প্রকৃতির নির্ঝঞ্জাট প্রিয় মানুষ। গ্রীষ্মকাল জৈষ্ঠ্যের শেষ। অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের কাছেই মসজিদ। চেয়ারম্যান মহোদয় মিয়ারাজের রোজা ছিলেন। নিকটের মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামে ছিলেন।

মেম্বর সাহেবের নির্দেশে স্থানীয় গ্রাম্য পুলিশ (চৌকিদার) সেই মহিলাকে বেঁধে অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদের আঙিনায় হাজির করেছে। চেয়ারম্যান মহোদয় মসজিদ থেকে পরিষদের কাছে এসে দ্যাখে! এক মহিলা বাঁধা, পাশে চৌকিদার সাহেব দাঁড়ানো। ওই মহিলার নাম ছিলো আলাপী। চেয়ারম্যান সাহেব দেখে, চৌকিদারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি হয়েছে ?’ চৌকিদার কিছু বলার আগেই, চেয়ারম্যান সাহেব ঐ মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘কিরে আলাপী, কি হয়েছে ?’ আলাপী চেয়ারম্যানকে বললো, ‘চাচা কি বলবো বলো ? তোমার সাথে থাকলে, আমি সতী। আর তোমার সাথে না থাকলে, আমি অসতী। আমার ঘরে লোক থাকে, তাই আমাকে ধরে পাঠিয়েছে।’ চেয়ারম্যান সাহেব, চৌকিদারের উপর বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এই! এখান থেকে নে গে…বেরো’। চৌকিদার তাড়াতাড়ি আলাপীর বাঁধন খুলে চলে যেতে বললো।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে আত্মশুদ্ধির জন্য, শুদ্ধি অভিযান চলছে। দলের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী জামাত শিবির জাতীয়তাবাদী দল জঙ্গিবাদী নাশকতাকারীদেরকে হাইব্রিড হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং জুয়াখোর মাদকসেবী মাদক ব্যবসায়ীদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুত দল থেকে ঐসব হাইব্রিড ও অপরাধীদের অপসরণ করে ফেলার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু, সমস্যা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলে নেতার সয়লাব। নিয়ন্ত্রণহীন ঐসব বে-শুমার নেতারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেছে ক্ষেত্র বিশেষে নেতায়-নেতায় সংঘাত না করে, সমঝোতা সিন্ডিকেট করে চলেছে, তাদের ওপরের নেতাদের অর্জিত অর্থের হিস্যা পৌছে দিয়ে, তাদের আস্থাভাজন হয়েছে এবং আনুকূল্য পেয়েছে। এখন কে-কার সঙ্গে থাকা হাইব্রিড ও মাদক ব্যবসায়ীদেরকে অপসারণ করে? এখন এক নেতা, আরেক নেতাকে, আলাপীর পরিভাষায় বলছে, ‘আমার সাথে থাকলে হাইব্রিড, জুয়াড়ে, মাদকব্যবসায়ী, তোমার সাথে থাকলে তারা নির্দোষ এবং আওয়ামী লীগ!’ এরূপ অবস্থায় দল থেকে, মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ী, হাইব্রিড কাউকেই অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। চাপাবাজী করে, গোজাই মিল দিয়ে, চলমান শুদ্ধি অভিযান, সম্পন্ন করার পক্ষে, প্রায় সবাই। নেতারা নিজ নিজ স্বার্থে, সিন্ডিকেট নেতৃত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, জোয়াড়ী, নাশকতাকারী, জঙ্গি মামলার আসামী এবং অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড সকলকেই সামাল দেওয়ার এবং আড়াল করার পন্থা অবলম্বন করেছে।

তাছাড়া, সামনে নেতৃত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে, নিজের চেয়ার, অবস্থান এবং নেতৃত্ব ধরে রাখতে, প্রত্যেক নেতারই লোকবল প্রয়োজন। আর ঐসকল চিহ্নিত মাদক সেবী, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ী, সন্ত্রাসী, নাশকতাকারী, জঙ্গিবাদীদের, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের যেকোনো একজন নেতার ছায়া ও আশ্রয় প্রয়োজন। যে কারণে, হাইব্রিড মাদক সেবীরা যেমন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গ ছাড়তে পারছে না, ঠিক তেমনি ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও নেতৃত্ব দখলের প্রতিযোগিতায়, লোকবলের প্রয়োজনে, ঐসকল হাইব্রিড মাদক সেবীদের অপসারণ করতেও পারছে না। ফলে, অবস্থা যা ছিলো, তাই থাকার উপক্রম হয়েছে।

নেতৃত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কথিত নেতাদের, সফর সঙ্গী কারা ? হোন্ডা, ডান্ডা নিয়ে কারা, কোন নেতার পিছন পিছন ছুটছে সেটা দেখলেই প্রশাসন, তথা গোয়েন্দারা প্রমান পাবেন। আসন্ন শুদ্ধি অভিযান কতখানি সফল হবে। লেখক: রাজনীতিক ও আইনজীবী