অবৈধ স্থাপনা অপসারণ কার্যক্রমে সুধীমহলের সমর্থন: পক্ষপাতহীন থাকার দাবি সাধারণ মানুষের


প্রকাশিত : অক্টোবর ৩১, ২০১৯ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: সড়ক ও জনপথ (সওজ) কতৃপক্ষের পক্ষ থেকে জেলাব্যাপী আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’পাশের যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। দীর্ঘদিন পরে হলেও সওজ কতৃপক্ষের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ থেকে সুধী মহল।
সড়কের দু’পাশে থাকা অবৈধ স্থাপনাসমুহের মালিকরা সাময়িকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হলেও বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে তারাও এমন অভিযানের প্রশংসা করেছে। তবে ভুক্তোভোগী এবং সাময়িকভাবে কমবেশী ক্ষতিগ্রস্ত এসব অবৈধ দখলদারদের দাবি অভিযানের ক্ষেত্রে কতৃপক্ষ যেন ‘কোল টান পিছ টানের ঘটনা না ঘটায়’।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বছরের শুরুতে সরকারি জায়গাসমুহে গড়ে ওঠা যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারনে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। যার অংশ হিসেবে শুরুতে বিআইডব্লিউটিএ, রেল কতৃপক্ষ, কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের পক্ষ হতে অবৈধ দখলে থাকা সরকারি জায়গাসমুহ উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানকালে সরকার দলীয় অফিস কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতার স্থাপনা এমনকি কোটি কোটি টাকা মুল্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বাদ পড়েনি। সরকারি জায়গাসমুহ উদ্ধারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগ দেশব্যাপী প্রসংশিত হওয়ার পর সরকারি অপরাপর সেক্টরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এমন অভিযানের ছোয়া লাগে।
এদিকে সম্প্রতি জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল তার বর্তমান কর্মস্থল সাতক্ষীরাকে একটি বাসউপযোগী আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। যার অংশ হিসেবে তিনি সরকারি সকল দপ্তরকে ঘুষ এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়ে নাগরিক সেবা দানের পাশাপাশি ‘ক্লিন সাতক্ষীরা গ্রিন সাতক্ষীরা’ গড়ে তোলার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।
ঠিক এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে পক্ষকাল আগে থেকে সাতক্ষীরা জেলা সদরসহ পাশর্^বর্তী এলাকাসমুহে আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’পাশের যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারনে উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ এর জেলার পদাধিকারীগণ।
সুত্র মতে সওজ কতৃপক্ষের তরফ হতে প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকেই সরকারি জায়গায় গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা নিজ উদ্যোগে অপসারণ শুরু করেছে। আবার কোন কোন স্থানে অবৈধ দখলদারগণ স্থাপনা অপসারণ না করায় কতৃপক্ষ তা ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছে।
জেলাব্যাপী আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’পাশের সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ঢেউ এখন শ্যামনগরেও লেগেছে। কয়েক দিনের টানা প্রচারণায় সরকারি জায়গা থেকে যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশনার বিষয়টি সবাই নিশ্চিত হলেও ‘অপসারণ নিয়ে তারা অনেকটা দোটানার মধ্যে’ পড়েছে।
প্রতিবারের এবারও প্রচার সর্বস্ব অভিযান পরিচালিত হবে, নাকি সত্যিকার অর্থে সাতক্ষীরা থেকে সুন্দরবনের সংযোগ সড়কের দু’পাশে সওজ’র সম্পূর্ণ জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে-তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে রয়েছে স্থানীয়রা।
বাদঘাটা গ্রামের সাইফুল ইসলাম এবং হায়বাদপুরের আরিফুল ইসলামসহ অনেকেই জানায়, আগেও এমন প্রচারনা চালিয়ে সরকারি জায়গা থেকে যাবতীয় স্থাপনা সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সেবার তারা বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েও সরকারি নির্দেশনা মেনে স্থাপনা অপসারণ করলেও পরবর্তীতে দেখা গিয়েছিল যে নানা কৌশলে তাদেরই প্রতিবেশী অনেকের স্থাপনা দিব্যি ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে গিয়েছিল।
সাইফুল ও আরিফুল এরমত আরও অনেকের দাবি সড়ক প্রশস্থ করা এবং ফুটপাত এর জায়গা বের করার ব্যাপারে তাদেরও সমর্থন রয়েছে। কিন্তু তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার পর যদি অন্যদের স্থাপনা যথাস্থানে থেকে যায় তবে বিষয়টি কষ্টকর হবে।
সওজ এর মালিকানাধীন সমুদয় জায়গা উদ্ধার অভিযানের প্রশংসা করে অধ্যাপক আশুতোষ রায় বলেন, নি:সন্দেহে ভাল উদ্যোগ। সরকারি সম্পত্তি দখলে নিয়ে যেভাবে রাস্তার উপর বসতি আর স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে তাতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। মাননীয় জেলা প্রশাসকের সহায়তা নিয়ে সওজ কতৃপক্ষ সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের যে অভিযান শুরু করেছে তাতে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে নিশ্চিতভাবে।
সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সহকারী শিক্ষক আবুল খায়ের বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোপুর্বে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে সুন্দরবনকে একটি পরিপুর্ন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সড়কের দুপাশের যাবতীয় স্থাপনা অপসারিত হলে সড়কের প্রশস্থতা বাড়বে আর ফুটপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। তিনি আরও বলেন প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ও দর্শণার্থী সুন্দনবন দর্শনে আসে। কিন্তু সড়কের পাশে জায়গা না থাকার দরুন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তারা অনেকটা নাখোশ হতেন। এবার সওজ কতৃপক্ষ মাননীয় জেলা প্রশাসকের সহায়তায় যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটার সফল বাস্তবায়ন হলে নিশ্চিতভাবে আগামীতে সুন্দরবন দেখতে আসা পর্যটকের সংখ্যা বহুগুনে বৃদ্ধি পাবে।
নকিপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জীসহ অনেকেই জানান, শ্যামনগরকে ইতিমধ্যে পৌরসভা হিসেবে ঘোষনা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারনের মাধ্যমে একটি মডেল পৌরসভা গড়ে ওঠার পথ সুগম হবে নিশ্চিতভাবে। তবে তিনি দাবি করেন যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা কালে সকলের সাথে যেন অভিন্ন আচারন করা হয়।
এদিকে আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশের সমুদয় সরকারি সম্পত্তি থেকে যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারনের উদ্যোগকে সর্মথন জানিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ কতৃপক্ষের কাছে দাবি রেখেছে যেন সওজ এর সম্পূর্ণ সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর ঐ সম্পত্তিতে সামাজিক বনায়নের আওতায় গাছ লাগিয়ে বাসযোগ্য একটি আধুনিক জনপদ হিসেবে যেন গোটা সাতক্ষীরাকে গড়ে তোলা হয় এমন দাবিও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে অভিযানের বিষয়ে সওজ এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা মুটোফোনে প্রতিবেদককে জানান অন্যান্য বারের মত এবার আংশিক উদ্ধার অভিযান হবে না। বরং সওজ এর সম্পত্তি চিহ্নিত করে লাল পতাকা দিয়ে সীমানা র্নিধারণ করে তার মধ্যে থাকা যাবতীয় স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার আহবান জানানো হয়েছে। যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করবে না তাদের স্থাপনা ভেঙে দিয়ে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করা হবে। তবে পাকা ঘরসমুহ অপসারন হলেও ইতোপূর্বেকার অভিযানে কাঁচা স্থাপনাসমুহ বহাল থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, কাঁচা পাকা বলে কোন কথা নেই। সওজ এর সম্পত্তির মধ্যে থাকা যাবতীয় স্থাপনা অপসারণে কতৃপক্ষ এতটুকু ছাড় দেবে না। যেকোন মুল্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মতে আঞ্চলিক এ মহাসড়কের দু’পাশের যাবতীয় সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করা হবে বলেও তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।