জাতীয় প্রোগ্রামে সাতক্ষীরা শিক্ষা প্রশাসনের এ কেমন উদাসীনতা ?


প্রকাশিত : নভেম্বর ১, ২০১৯ ||

প্রিয় পাঠক! মোর নাম এই বলে প্রচার হোক, আমি আপনাদেরই লোক। আমি লেখক নই, সাহিত্যিক নই। সময়ের প্রয়োজনে বাস্তবতার আলোকে না লিখে থাকতে পারলাম না। প্রিয় পাঠক! আপনারা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পেরেছেন, ২০২০ বর্ষকে মুজিব বর্ষ এবং ২০২১ বর্ষকে মহান স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনে এ বছর দুটি অন্যান্য বছরের তুলনায় আরও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার ইতোমধ্যে মুজিব বর্ষকে সামনে রেখে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারা দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। দেশরতœ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মানুষের কল্যাণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণু নীতি গ্রহণ করেছেন। দেশের সকল শিশুর শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে এবং মিলিনিয়াম গোল অর্জন করতে গ্রহণ করেছেন যুগোপযোগী শিক্ষানীতি। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার বিকাশ, মননশীলতার বিকাশ ও উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার বিকাশে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশ প্রেমিক, বিজ্ঞান মনস্ক, সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই সরকারের তথা শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য। সৎ, যোগ্য ও মানব সম্পদে পরিণত করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সৈনিক হিসেবে শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত, জঙ্গিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থীর মেধার সর্বোত্তম ব্যবহার ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বছর সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা বইয়ের আলোকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ শীর্ষক মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ অথবা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার নিকটজন ও মুক্তিযুদ্ধের  প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও চেতনাকে শাণিত করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সরেজমিনে জানতে পেরেছে। মা, মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে এ কর্মসূচি। দেশের শতভাগ শিক্ষার্থী শ্রদ্ধার সাথে আগ্রহভরে এ কর্মসূচি পালন করেছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিস থেকে কাক্সিক্ষত নির্দেশনা শিক্ষার্থীরা পেয়েছেন বলে মনে হয়না। এমনকি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা ও তদারকির অভাবে সুষ্ঠুভাবে এ কর্মসূচি পালন করতে পারেনি বলে শোনা যায়।

এ কর্মসূচি শেষ হতেই আরেকটি মহৎ কর্মসূচি পালন করেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সেটি হলো, বিজয় ফুল তৈরি, গল্প রচনা, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, একক অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ, দেশাত্মবোধক ও জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতা-২০১৯।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানতে পারি, সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিজয় ফুল তৈরি, গল্প রচনা, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, একক অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ, দেশাত্মবোধক ও জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতা-২০১৯ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে সদর উপজেলার ২০১টি প্রাইমারি স্কুল, ৬২টি হাইস্কুল, ৪৬টি মাদ্রাসা ও ১৮টি কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে।

একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমাদেরকে বলা হয়েছিল সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে হাজির হতে হবে। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় রওয়ানা দিয়ে ইজিবাইক, ভ্যান যোগে যথা সময়ে পৌছাই সদর উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে। পৌছে দেখি আমার মতো অনেকেই এসেছেন দূর গ্রাম থেকে। কেউ এসেছেন নদী পেরিয়ে, কেউ দূর গ্রাম থেকে। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে শিশু শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত হলো উপজেলা পরিষদ চত্ত্বর। ঘড়ির কাটা ১০টার ঘরে পৌছে গেলেও ততক্ষণে পৌছালেন না শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি আসলেন আরও প্রায় ৩০ মিনিট পরে। এদিকে শিশু শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে সময় গুনছে। কেউ কেউ বলছে হাঁটু খিল লেগে গেছে। আর কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে। কখন হবে অনুষ্ঠান। অডিটরিয়াম মঞ্চে তখনও ব্যানার কিম্বার চেয়ার আসেনি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ব্যানার ও চেয়ার আনা হলো। তারপর আসলেন সম্মানীত অতিথিবৃন্দ। শুরু হলো অনুষ্ঠান উদ্বোধন। এরআগে সাতক্ষীরা শহরের একজন আর্টের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকার জন্য বসালেন অডিটরিয়ামের মেঝেতে। ধুলা বালুর উপর বসতে বাধ্য হলো শিক্ষার্থীরা। অডিটরিয়ামের ভিতরে বসানো হলো বিজয় ফুল তৈরিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের। সেখানেও বসতে হলো খোলা মেঝের উপর। ক, খ ও গ পৃথক তিনটি গ্রুপের শিক্ষার্থীদের এভাবে মেঝেতে বসিয়ে প্রতিযোগিতা করানো হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি আঁকার কথা থাকলেও একটি গ্রুপে উন্মুক্ত করা হয়। বিচারক কে বা কারা তা তাৎক্ষণিক বোঝা যায়নি। শিক্ষা কর্মকর্তা মঞ্চের আলোচনা শেষে সেই যে ‘উধাও’ হলেন আর দেখা যায়নি। এদিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ও কবিতা রচনা, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনে জন্য শিক্ষার্থীদের পৃথক মঞ্চে ডাকা হয়। কবিতার মঞ্চ থেকে ফিরে অনেক শিক্ষার্থী বলতে থাকেন জীবনে আর কখনো এখানে আসবো না। কেন আসবে না, জানতে চাইলে তারা বলতে থাকে ‘মা গো ওরা বলে’ কবিতা আবৃত্তি করেছি বলে আমাকে অপমান করা হয়েছে। আরেক শিক্ষার্থী তখন বলে, আমার উচ্চারণে সমস্যা থাকায় আমাকেও তিরস্কার করা হয়েছে।

জানিনা শিক্ষার্থীদের কথা সত্য নাকি মিথ্যা। সত্য হোক আর মিথ্যা হোক সরকারের জাতীয় এ প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রশাসন যে উদাসীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষা অফিসের অনেক কর্মকর্তাই নাকি বিষয়টি জানতেন না। অভিভাবক ও শিক্ষকদের অভিযোগ ‘শিক্ষক না হয়েও আবার কেউ বিচারক হয়েছেন। ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় আর্ট পেপার সরবরাহ করার কথা থাকলেও তা  করা হয়নি। প্রতিযোগিতা শেষ হয় বিকাল ৩টার দিকে। কোন নিয়ম নীতি ছাড়াই সম্পূর্ণ হ-য-ব-র-ল পরিবেশে এমন একটি জাতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ায় বাধ্য হয়ে দু’কথা লিখছি।

প্রিয় পাঠক! প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কলেজ পর্যায়ের আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যত। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ায় এসব অনুষ্ঠানের লক্ষ্য। কিন্তু সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন কেন উদাসীন তা বোধগম্য নয়। শুধু উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন নয়, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তাকে এ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। প্রতিযোগিতার জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসা শিক্ষার্থীরা অনেকেই ফিরে গেছে সুষ্ঠু তদারকি ও পরিকল্পনার অভাবে। অনুষ্ঠান পালনে কর্মকর্তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়েছে ‘এটা যেনো তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো রকমে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে পারলেই তা জম্মের বাঁচা বাঁচেন। কোন প্রস্তুতি সভা করেছিলেন বলে তো মনে হয়নি। তবে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় যেভাবে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করা হয়েছে, এভাবেই যদি সরকারের নির্দেশনা থাকে সেক্ষেত্রে আমার বলার কিছু নেই। শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনেছি, ২৬ অক্টোবর তারা উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে যে চিঠি পেয়েছেন তাতে ২৮ অক্টোবর স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজয় ফুল তৈরি, গল্প রচনা, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, একক অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ, দেশাত্মবোধক ও জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতা-২০১৯ এর আয়োজন করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রুপ ভিত্তিক বিজয়ীরা ৩১ অক্টোবর উপজেলায় অংশ গ্রহণ করবে। এরমধ্যে ২৭ অক্টোবর ছিলো ছুটি। ২৮ ও ২৯ তারিখে দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা ছিলো। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষা ২ নভেম্বর থাকায় তাদেরও পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। সব মিলিয়ে অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এ প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছে শুধু পরিকল্পনার অভাবে। বছরের শুরুতে পর্যাপ্ত সময় থাকে। তখন কী এসব অনুষ্ঠানগুলো করা যায়না ? এভাবে জাতীয় প্রোগ্রাম করলে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ শুধু অপচয় হতে থাকবে, মূল লক্ষ্য অর্জনে থেকে যাবে সংশয়। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং মেধার অন্বেষণ সফল হবে বলে আমার মনে হয় না। জানি না, জেলার অন্যান্য উপজেলায় কীভাবে এসব প্রোগ্রাম পালিত হয় ? শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারাই ভালোভাবে বলতে পারবেন। তাই একজন অভিভাবক হিসেবে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমার নিবেদন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে আগামীতে যেনো পরিকল্পিতভাবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিরপেক্ষভাবে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রত্যেকটি জাতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। লেখক: একজন অভিভাবক